বাংলাদেশে পা পড়েছিল মেসি আর আর্জেন্টিনার, কেমন ছিল সেই দিনগুলো

এক মহাতারকার আগমন। সব মিলিয়ে সেদিন ঢাকার চেহারাটাই বদলে গিয়েছিল। বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা তারকা লিওনেল মেসি পা রেখেছিলেন বাংলাদেশে। সঙ্গে ছিল তার আর্জেন্টিনা দল। প্রতিপক্ষ নাইজেরিয়া। ২০১১ সালের সেই দিনগুলো এখন শুধুই স্মৃতি। কিন্তু যারা সেদিন মেসিকে চোখের সামনে দেখেছেন, তাদের কাছে মুহূর্তগুলো এখনও অমলিন।

আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক লিওনেল মেসি এখন আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানিয়েছেন। ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে ৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আর্জেন্টিনার হাতে তুলে দিয়েছিলেন বিশ্বকাপ ট্রফি। উত্তর আমেরিকার বিশ্বকাপেও দলকে নিয়ে উঠেছিলেন ফাইনালে। টানা দুই বিশ্বকাপের ফাইনালের আগে মেসির মতো এমন মহাতারকা বাংলাদেশে এসেছিলেন একবারই। আর সেই সফরটি ছিল ২০১১ সালে।

বাংলাদেশে এর আগে কখনও এমন বড় ফুটবল ম্যাচ হয়নি। মেসির আর্জেন্টিনা ও নাইজেরিয়ার মধ্যে ফিফা প্রীতি ম্যাচ আয়োজন করে তখনকার বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) রীতিমতো তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকায় এসেছিল দুই দল। পরদিন, ৬ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা ও নাইজেরিয়া। সেই ম্যাচে ৩-১ গোলে জিতেছিল আর্জেন্টিনা। আর ম্যাচটি বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিল চিরদিনের জন্য।

কাজী সালাউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন বাফুফে কমিটি বেক্সিমকোর সৌজন্যে আর্জেন্টিনা-নাইজেরিয়া ম্যাচ আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এরপর শুরু হয় বিশাল এক কর্মযজ্ঞ।

বিশ্বের অন্যতম সেরা দল আর্জেন্টিনা। তার ওপর দলে আছেন মেসি। কীভাবে এত বড় একটি ম্যাচের আয়োজন করা হবে, তা নিয়ে কর্মকর্তাদের ব্যস্ততার শেষ ছিল না। নিরাপত্তা, মাঠ, হোটেল, যাতায়াতসহ সবকিছুতেই ছিল বাড়তি নজর।

বাফুফের তখনকার কর্মকর্তাদের সঙ্গে মেসি।অবশেষে ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকার বিমানবন্দরে পা রাখলেন মেসি ও তার সতীর্থরা। বিমানবন্দরে তাদের স্বাগত জানিয়েছিলেন বাংলাদেশের জাতীয় দলের ফুটবলাররা। ছিলেন গোলকিপার বিপ্লব ভট্টাচার্যসহ অন্যরাও। সেদিন ঢাকা শহরজুড়ে উৎসবের আমেজ।

বিমানবন্দর থেকে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের পথে মেসিদের বাস ঘিরে রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন হাজারো সমর্থক। কেউ পতাকা হাতে, কেউ মেসির ছবি নিয়ে, কেউ শুধু এক ঝলক দেখার অপেক্ষায়।

বাসের জানালার কাচের ভেতর থেকে মেসিকেও মাঝে মাঝে হাসিমুখে হাত নাড়তে দেখা গেছে। সমর্থকদের উচ্ছ্বাসের জবাব দিয়েছেন নিজের মতো করে। তার মুখে ক্লান্তি কিংবা বিরক্তির ছাপ ছিল না।

আর্জেন্টিনা তখন কলকাতায় ম্যাচ খেলে বাংলাদেশে এসেছিল। তার আগে তাদের অগ্রবর্তী দল ঢাকায় এসে স্টেডিয়ামের মাঠ, হোটেল ও নিরাপত্তাব্যবস্থা দেখে গিয়েছিল। সবুজ সংকেত পাওয়ার পরই নিশ্চিত হয় মেসিদের ঢাকায় আসা।

ম্যাচের দৃশ্য।মেসিদের ম্যাচ ঘিরে যেমন উন্মাদনা ছিল, অনুশীলন ঘিরেও কম ছিল না উত্তাপ। মেসিদের অনুশীলন দেখতে দর্শকদের গুনতে হয়েছিল ১ হাজার টাকা করে। আর ম্যাচের দিনের টিকিটের সর্বোচ্চ দাম ছিল সাড়ে ৭ হাজার টাকা। এত চড়া দামেও স্টেডিয়ামে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। দর্শকে ঠাসা গ্যালারিতে তখন একটাই অপেক্ষা- কখন মাঠে দেখা যাবে মেসিকে।

পরে ৬ সেপ্টেম্বর ম্যাচ যখন মাঠে গড়ালো, তখন অবশ্য মেসি গোল করতে পারেননি। কিন্তু গোল না করেও ম্যাচের সবচেয়ে উজ্জ্বল চরিত্র ছিলেন তিনি। দুটি গোলে সরাসরি অবদান রেখেছিলেন। অ্যাঙ্গেল দি মারিয়া ও গঞ্জালো হিগুয়েইনকে দিয়ে গোল করিয়েছিলেন তিনি। অন্য গোলটি ছিল আত্মঘাতী।

মেসির সেই মোহনীয় ফুটবল জাদু আজও অনেকের চোখে ভাসে। আর্জেন্টিনার প্রায় প্রতিটি আক্রমণেই ছিল বার্সেলোনার সেই মহাতারকার ছোঁয়া।

প্রায় মাঝমাঠ থেকে প্রতিপক্ষের এক খেলোয়াড়ের পা থেকে বল কেড়ে নিয়ে দুরন্ত গতিতে ছুটে যাচ্ছেন মেসি। একে একে পেছনে ফেলছেন প্রতিপক্ষের মার্কারদের। তারপর নিখুঁত ফাইনাল পাস। মুহূর্তের মধ্যেই গোল।

গ্যালারি তখন গর্জে উঠছে- ‘আর্জেন্টিনা... মেসি... আর্জেন্টিনা... মেসি...।’ মনে হচ্ছিল, মেসি-হিগুয়েইনরা যেন খেলছেন নিজেদের ঘরের মাঠেই!

সেই সফরে আর্জেন্টিনা দলের টিম লিয়াজোঁ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন আব্দুল গাফফার। মেসির সঙ্গে কাটানো সেই ৪৮ ঘণ্টার স্মৃতি এখনও তার কাছে বিশেষ কিছু। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে সেই সময়ের স্মৃতিচারণা করে বলেছেন, ‘সেই দিনগুলো ভোলার নয়। আমার জন্য বড় প্রাপ্তি। বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়ের সঙ্গে ৪৮ ঘণ্টা ছিলাম। তাকে কাছে থেকে দেখেছি। অসম্ভব ভদ্র একজন মানুষ।’

মেসির ব্যক্তিত্ব তাকে মুগ্ধ করেছিল সবচেয়ে বেশি। আব্দুল গাফফারের ভাষায়, ‘মেসিকে দেখে কখনোই মনে হয়নি, সে বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়। কোনও অহমিকা নেই। কী অমায়িক ব্যবহার, খাওয়ার টেবিল থেকে শুরু করে মাঠেও সে সবার আগে থাকতো।’

ঢাকায় মেসিদের সেই ম্যাচ এখনও ইতিহাস। সময় পেরিয়ে গেছে। মেসি বিশ্বকাপ জিতেছেন, অসংখ্য রেকর্ড গড়েছেন, আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজের নামকে আরও বড় করেছেন। কিন্তু বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের কাছে ২০১১ সালের ৬ সেপ্টেম্বরের সেই সন্ধ্যার আলাদা মাহাত্ম্য আছে।

যারা সেদিন স্টেডিয়ামে ছিলেন, তাদের কাছে সেটি ছিল জীবনের অন্যতম সৌভাগ্যের দিন। কারণ বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলারকে শুধু টেলিভিশনের পর্দায় নয়, চোখের সামনে বল নিয়ে ছুটতে দেখার সুযোগ পেয়েছিল বাংলাদেশ। মেসির সেই সফর তাই শুধু একটি ফুটবল ম্যাচের গল্প নয়। বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এক সোনালি সময়ের গল্পও।