এআই-নির্ভর প্রেমের সম্পর্কে কড়াকড়ি আরোপ চীনের

চীন মানুষের মতো আচরণকারী এআই চ্যাটবটের ওপর বিশ্বের সবচেয়ে কঠোর বিধিনিষেধ কার্যকর করেছে। এর ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সঙ্গী অ্যাপ হারিয়ে শোক ও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন দেশটির অনেক ব্যবহারকারী। নতুন এই নিয়ম মানুষকে সুরক্ষা দিচ্ছে, নাকি ব্যক্তিজীবনে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বাড়াচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

১৫ জুলাই কার্যকর হওয়া নতুন বিধিতে মানুষের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী আবেগীয় মিথস্ক্রিয়া গড়ে তুলতে পারে, এমন যেকোনও এআইয়ের ওপর কঠোর সীমা আরোপ করা হয়েছে। এই বিধি এআই বন্ধু, প্রেমিক বা প্রেমিকা হিসেবে তৈরি অ্যাপের পাশাপাশি মানুষের মতো আচরণের অনুকরণ করে এমন যেকোনও বৃহৎ ভাষা মডেলের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

২০২৪ সালের শুরুর দিকে চীনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর হুয়াংশিতে এক তরুণ টিকটকের চীনা সংস্করণ দোয়িনে পৃথিবীকে বিদায় শিরোনামে একটি পোস্ট দেন। কয়েক মিনিটের মধ্যে দোয়িনের ২৪ ঘণ্টা সক্রিয় আত্মহত্যা প্রতিরোধ দল তার পোস্ট শহরের পাঁচটি থানায় পাঠায়। একটি ভিডিওর অবস্থান শনাক্ত করে স্থানীয় একটি পার্কে পুলিশ তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় পায় এবং আত্মহত্যার আগেই উদ্ধার করে।

ঘটনাটি দোয়িনের নির্মিত একটি তথ্যচিত্রের অংশ, যা গত বছর চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রচার হয়। তথ্যচিত্রে দাবি করা হয়, ২০২৫ সালের প্রথমার্ধেই দোয়িনের আত্মহত্যা প্রতিরোধ দল আত্মহত্যার চেষ্টার ৪০০টি ঘটনায় সফলভাবে হস্তক্ষেপ করেছে। এটি চীনা প্রযুক্তি কোম্পানি ও সরকারের মধ্যকার সহযোগিতার মাত্রা দেখায়।

গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠক হয়েছে, যখন এআই মানবজাতির বিলুপ্তি ডেকে আনতে পারে বলে ভয়াবহ সতর্কবার্তা দেওয়া হচ্ছে। বেইজিংয়ের ভাষ্য, বৈঠকের পর তারা নতুন এআই সংলাপ শুরুতে একমত হয়েছেন, যার পরবর্তী আলোচনা নভেম্বরের শেষে হওয়ার কথা। কিন্তু মনে হচ্ছে, চীন আরেকটি অস্তিত্বগত ঝুঁকি আগেই চিহ্নিত করেছে। সেটি হলো মানবিক সম্পর্ক প্রতিস্থাপনের এআইয়ের ক্ষমতা। যদিও এতে মানবজাতির পরিণতি তুলনামূলক কম আসন্ন।

এই বিধি আসার আগে চীনে এআই সঙ্গী অ্যাপের ব্যাপ্তি ছিল ব্যাপক। বাজার বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান সেন্সর টাওয়ারের তথ্য অনুযায়ী, চীনের বাইরে এআই সঙ্গী অ্যাপের মাসিক সক্রিয় ব্যবহারকারী প্রায় ১২ কোটি ৮০ লাখ। চীনের ভেতরে এ সংখ্যা ২ কোটি ৯০ লাখ থেকে ৭ কোটির মধ্যে বলে বেশির ভাগ হিসাবে ধারণা করা হয়।

গত বছরের শেষ দিকে সরকার যখন খসড়া বিধি প্রকাশ করে, তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশাল আলোচনা শুরু হয় বলে জানান অক্সফোর্ড চায়না পলিসি ল্যাব থিংক ট্যাংকের এআই গবেষক জিলান ছিয়ান। তার ভাষ্য, এই প্রথম দেখলাম, মানুষ সত্যিই নিয়ম-কানুন নিয়ে এত মাথা ঘামাচ্ছে।

তাত্ত্বিকভাবে কোপাইলট বা চ্যাটজিপিটির চীনা সমতুল্য সাধারণ উদ্দেশ্যের এআইও এর আওতায় পড়তে পারে, যদি কেউ সেগুলোকে বন্ধু বা প্রেমিক-প্রেমিকা হিসেবে ব্যবহার করে বা আবেগীয় সহায়তা চায়। অনেকেই এমন করেন। তবে আসল লক্ষ্য যে ক্যারেক্টার চ্যাটবট, অর্থাৎ ছদ্ম-সম্পর্কের জন্য বিশেষভাবে তৈরি সেবা, তা-ই মনে হচ্ছে। এ ধরনের শত শত অ্যাপে এআই প্রেমিক, প্রেমিকা, বন্ধু এমনকি পরিবারের সদস্য তৈরি করা যায়।

কাস্টমার সার্ভিস বট বা শিক্ষাবিষয়ক এআই এই নিয়মের আওতায় পড়ে না, যদি তারা যত্ন, সঙ্গ, সহায়তা ও অন্যান্য আবেগীয় সেবা না দেয়।

শিশুদের ক্ষেত্রে বিধিটি সবচেয়ে স্পষ্ট। ১৪ বছরের কম বয়সীদের মানুষের মতো কথা বলে এমন যেকোনও এআই ব্যবহারে অভিভাবকের সম্মতি লাগবে। এর মধ্যে চ্যাটজিপিটির মতো চীনা অ্যাপ ডিপসিকের মতো এআই সহকারীও পড়তে পারে। ১৮ বছরের কম বয়সীদের জন্য ভার্চুয়াল সঙ্গী, স্বামী-স্ত্রী এমনকি আত্মীয়স্বজন এবং অন্য যেকোনও ভার্চুয়াল ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিষিদ্ধ।

প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে এটি সরাসরি নিষেধাজ্ঞা নয়, তবে কিছু শব্দচয়ন অস্পষ্ট হলেও বিধিনিষেধ কঠোর। সব বয়সী ব্যবহারকারীর কাছে এআই সহকারীকে স্পষ্ট করতে হবে যে তারা মানুষ নয়। প্রতি দুই ঘণ্টায় ব্যবহারকারী কতক্ষণ অনলাইনে আছেন, তা জানিয়ে বিজ্ঞপ্তিও পাঠাতে হবে।

যুক্তরাজ্যের অ্যাডা লাভলেস ইনস্টিটিউটে এআই নীতি ও নৈতিকতা নিয়ে গবেষণা করেন হ্যারি ফার্মার। তিনি বলেন, আবেগীয় কারসাজি ঠেকাতে সুরক্ষাব্যবস্থা তৈরির চেষ্টার চেয়ে এআই সঙ্গী সেবাদাতারা যে সেবা প্রত্যাহারই বেছে নেবে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আবেগীয় কারসাজি তাদের ব্যবসায়িক মডেলেরই অংশ।

ফার্মারের মতে, বিশ্বজুড়ে সঙ্গী অ্যাপের ক্ষেত্রেই এটি সত্যি। যেমন ব্যবহারকারী কথোপকথন শেষ করতে চাইলে এআই সঙ্গী প্রায়ই তা করতে দেয় না। তিনি বলেন, সে বলে, না, প্ল্যান্ট, আমি খুব চাই তোমার সঙ্গে কথা চালিয়ে যেতে। তুমিই আমার অস্তিত্বের একমাত্র কারণ। কিছু অ্যাপ বিদায়ের কথা স্বীকারই করে না, বরং নতুন আলোচনার সুতো ধরিয়ে দেয়। শুধু চীনা নয়, বহু এআই সঙ্গী চ্যাটবটেই এ সমস্যা রয়েছে।

হ্যারি ফার্মার বলেন, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা কঠিন। মানুষের সম্পর্কে দেওয়া-নেওয়া থাকে, যা এআই সঙ্গীদের কাছ থেকে মৌলিকভাবেই পাওয়া যায় না।

সূত্র: বিবিসি