ব্যাংক খাতে আবগারি শুল্ক আগেও ছিল, এখনও আছে। তবে আগে আবগারি শুল্ক কাটা হতো আমানতের সুদ আয় থেকে। কিন্ত এখন আমানতে সুদ হার কমে যাওয়ায় সরকার আমানতের আসল টাকায় হাত দিতে চাইছে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংকগ্রাহকদের আমানতের ওপর আবগারি শুল্ক হার আগের ৫০০ টাকার পরিবর্তে ৮০০ টাকা করার প্রস্তাব করেছেন। যে কারণে আবগারি শুল্ক ইস্যুতে সারা দেশে সমালোচনার ঝড় বাইছে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই ইস্যুতে সারা দেশে সমালোচনা হবে এটাই স্বাভাবিক। কারণ, আগে আমানতে সুদের হার ছিল বেশি। তখন সুদের অংশ থেকে কিছু টাকা কাটা গেলেও বা বছর শেষে গ্রাহককে লাভের সামান্য কিছু কম দিলেও কেউ উচ্চবাচ্য করতো না। কিন্তু এখন সুদের হার কম, এই অবস্থায় টাকা কাটা হলে আসল টাকাই কমে যাবে।’ তিনি বলেন, ‘কর পরিশোধ করার পর আবার সেই টাকার ওপর আবগারি শুল্কের নামে জোর করে টাকা কেটে নেওয়া সংবিধান পরিপন্থী।’ এটা অবশ্যই বেআইনি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জানা গেছে, আগে ব্যাংকে আমানত রাখলে ১২ থেকে ১৪ শতাংশ হারে সুদ আয় পেতো গ্রাহক। সেই সুদ আয় থেকে আবগারি শুল্ক কেটে নেওয়া হতো। এখন আমানতে সুদ হার নেমে এসেছে ৫ শতাংশেরও নিচে। এমন অবস্থায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত ব্যাংক খাতের আমানতের ওপর শুল্ক হার বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছেন। যে কারণে তীব্র সমালোচনা হচ্ছে দেশজুড়ে। শুধু যে সমালোচনা হচ্ছে এমনটিই নয়, আমানতের সুদের হার কমে যাওয়ায় সীমিত আয়ের মানুষ শঙ্কার মধ্যে পড়েছেন। আমানতকারীদের একটি অংশ আতঙ্কে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নেওয়ার কথা ভাবছেন।
এ প্রসঙ্গে ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও বেসরকারি মেঘনা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুরুল আমিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমানতে সুদ হার যখন বেশি ছিল, তখন গ্রাহকরা আবগারি শুল্ক নিয়ে কখনও চিন্তিত ছিল না। কিন্তু বর্তমানে ব্যাংকের আমানতে যে সুদ হার রয়েছে, তা মূল্যস্ফীতিজনিত ক্ষয়ের সঙ্গে সমন্বয় করলে দেখা যাবে, প্রকৃতপক্ষে টাকার পরিমাণ বাড়ছে না, বরং কমছে। এর সঙ্গে আবগারি শুল্কের পরিমাণ বাড়ানোতে ব্যাংকের প্রতি জনগণ নিরুৎসাহিত হবে।’
ব্যাংক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগে ১২ থেকে ১৪ শতাংশ সুদ হারে ব্যাংকে এক লাখ টাকা রাখলে, গ্রাহক বছর শেষে তার সুদ বাবদ আয় পেতো ১২ থেকে ১৪ হাজার টাকা। এর মধ্যে থেকে ৫০০ টাকা কাটলেও বছর শেষে ১০ হাজার টাকারও বেশি সুদ আয় হতো। কিন্তু এখন এক জন আমানতকারী ৪ দশমিক ৯৭ সুদহারে ব্যাংকে এক লাখ টাকা রাখলে, বছর শেষে তার সুদ বাবদ আয় হবে ৪ হাজার ৯০০ টাকা। তিনি যদি টিআইএনধারী না হন তাহলে তার মুনাফার ওপর ১৫ শতাংশ কর কেটে রাখা হবে। এতে বছর শেষে তার টাকার পরিমাণ দাঁড়াবে ১ লাখ ৪ হাজার ১৫০ টাকা। এর মধ্যে বাজেটের প্রস্তাব অনুযায়ী ৮০০ টাকা কেটে রাখা হলে আমানতকারীর টাকার পরিমাণ দাঁড়াবে ১ লাখ ৩ হাজার ৩৫০ টাকা। এর সঙ্গে প্রতিবছর সার্ভিস চার্জ বাবদ ব্যাংক অন্তত ৩৫০ টাকা কেটে রাখে।
অর্থমন্ত্রীর নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, ১ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ৫০০ টাকার বদলে ৮০০ টাকা আবগারি শুল্ক দিতে হবে। ১০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত দেড় হাজারের পরিবর্তে আড়াই হাজার টাকা দিতে হবে। ১ কোটি টাকা থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত আবগারি শুল্ক সাড়ে ৭ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২ হাজার টাকা করা হয়েছে। আর ৫ কোটি টাকার বেশি থাকলেই ২৫ হাজার টাকা দিতে হবে।
এদিকে ব্যাংক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ব্যাংক খাতে আবগারি শুল্কের বিষয়টি নতুন নয়, আগে ছিল। চলতি অর্থবছরেও ১ লাখ টাকার বেশি আমানত রাখা গ্রাহকের হিসাব থেকে ৫০০ টাকা কেটে নেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, ব্যাংকে ২০ হাজার টাকার বেশি আমানত রাখা গ্রাহকের হিসাব থেকে ১৫০ টাকা কেটে নেওয়া হয়েছে। ১০ লাখ ১ টাকা থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেনের ওপর চলতি অর্থবছরে ১ হাজার ৫০০ টাকা নিচ্ছে সরকার। ১৯৯১-৯২ অর্থবছরের বাজেটে সাইফুর রহমান আমানতের ওপর আবগারি শুল্ক আরোপ করেন। এরপর থেকে বেশ কয়েকবার এই শুল্কের পরিমাণ বাড়ানো হয়। কিন্তু কখনও বাজেট বক্তৃতায় সেটা উল্লেখ করা হয়নি।
জানা গেছে, আগামী অর্থবছরে আমানতের ওপর এই আবগারি শুল্ক খাতে রাজস্ব আয় হওয়ার কথা রয়েছে মাত্র ৯২৫ কোটি ৭০ লাখ ৮২ হাজার ৭০০ টাকা। এর মধ্যে ৫৮৪ কোটি টাকাই আসবে ১ লাখ টাকা থেকে ১০ লাখ টাকার আমানতকারীদের কাছ থেকে। এই স্বল্প আমানত রাখা গ্রাহকদেরকে সম্পদশালী বলে উল্লেখ করেছেন অর্থমন্ত্রী। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ১ লাখ টাকা যাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা আছে, তাদের সম্পদশালী মনে করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তিনি এই ব্যাংকগ্রাহকদের আমানতের ওপর আবগারি শুল্ক হার ৮০০ টাকা করার প্রস্তাব করেছেন।
/এপিএইচ/
আরও পড়ুন:
১৩ হাজার ৩৭২ কোটি কালো টাকা সাদা: সংসদে অর্থমন্ত্রী
রেমিটেন্স কমেছে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা








