আবারও বেড়েছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স।দেশে ডলারে দাম বাড়ায় এই রেমিটেন্স বেড়েছে। প্রবাসীরা নভেম্বর মাসে রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন ১২১ কোটি ৪৭ লাখ ডলার। এর আগে অক্টোবরে পাঠিয়েছেন ১১৫ কোটি ৯০ লাখ ডলার। এই হিসাবে নভেম্বরে বেড়েছে পাঁচ কোটি ৫৭ লাখ ডলার। জুন থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত ডলারের দাম ছিল ৮০ টাকা। আর নভেম্বরে এসে সেই ডলারের মূল্য দাঁড়িয়েছে ৮২ টাকায়। রবিবার (৩ ডিসেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
অবশ্য তিন মাস আগেও রেমিটেন্স নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। কারণ, গত সেপ্টেম্বর মাসে মাত্র ৮৫ কোটি ৬৮ লাখ ডলার রেমিটেন্স পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা। মাস হিসেবে বিগত সাড়ে পাঁচ বছরের মধ্যে এটিই ছিল সর্বনিম্ন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত বছরের নভেম্বর মাসে একক মাস হিসেবে আগের পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন রেমিটেন্স আসে।
এদিকে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বরে) রেমিটেন্স আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে ১০ দশমিক ৭৬ শতাংশ। এই পাঁচ মাসে দেশে ৫৭৬ কোটি ৮৫ লাখ ডলার রেমিটেন্স এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্নমুখী উদ্যোগের কারণে গত অক্টোবর মাসে ১১৫ কোটি ৯০ লাখ ডলার রেমিটেন্স পাঠান প্রবাসীরা, যা গত সেপ্টেম্বর মাসের চেয়ে ৩০ কোটি ৩০ লাখ ডলার বেশি। আর ২০১৬ সালের অক্টোবরের চেয়ে ১৪ কোটি ৮১ লাখ ডলার বেশি।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রবাসী আয় বাড়ানোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক ও সরকার বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। এর সঙ্গে জনগণও বৈধপথে রেমিটেন্স পাঠাতে উৎসাহিত হচ্ছেন। এরই প্রভাব পড়েছে সার্বিক রেমিট্যান্সে।’ তিনি বলেন, ‘গত জুলাই মাস থেকেই প্রবাসীরা ব্যাংকি চ্যানেলের প্রতি ঝুঁকছেন। আশা করা যায়, আগামীতেও প্রবাসী আয় আরও বাড়বে।’
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, নভেম্বর মাসে রাষ্ট্রীয় খাতের ছয় বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে ২৬ কোটি ৯৬ লাখ মার্কিন ডলারের রেমিটেন্স এসেছে। এ মাসে বিশেষায়িত খাতের ব্যাংক দু’টির মাধ্যমে এসেছে ৯৮ লাখ ডলার। বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে নভেম্বর ৯২ কোটি এক লাখ ডলারের রেমিটেন্স দেশে এসেছে। আর বিদেশি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে দেড় কোটি ডলার।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. জায়েদ বখত বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সম্প্রতি প্রবাসী আয় বাড়ার পেছনে ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণ অন্যতম প্রভাবক হিসাবে কাজ করছে। তবে সরকারের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগও প্রবাসী আয় বাড়াতে ভূমিকা রাখছে।’ তিনি বলেন, ‘এই ধারা অব্যাহত রাখতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারি অব্যাহত রাখতে হবে। পাশাপাশি অবৈধ মোবাইল ব্যাংকিংয়ের নামে হুন্ডি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।’
এর আগে রেমিটেন্স বাড়াতে মাশুল না নেওয়াসহ নানা ঘোষণাও দিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। একইসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকও প্রবাসীদের জন্য বেশ কিছু সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি অবৈধ মোবাইল ব্যাংকিং বন্ধে কঠোর অবস্থান নেয় বাংলাদেশ। সর্বশেষ হুন্ডি রোধে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। গত ১৪ সেপ্টেম্বর হুন্ডির মাধ্যমে রেমিটেন্স বিতরণের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে মোবাইল ব্যাংকিং বিকাশের দুই হাজার ৮৮৭ জন এজেন্টের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রবাসীরা ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথম ৫ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) ব্যাংকিং চ্যানেলে ৫৭৬ কোটি ৮৫ লাখ ডলার রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন। এর মধ্যে প্রথম মাস জুলাইয়ে এসেছে ১১৫ কোটি ৫৫ লাখ ডলার। দ্বিতীয় মাস আগস্টে ১৪১ কোটি ৮৬ লাখ ডলার পাঠান প্রবাসীরা। সেপ্টেম্বরে পাঠিয়েছেন ৮৫ কোটি ৬৮ লাখ ডলার, অক্টোবরে পাঠিয়েছেন ১১৫ কোটি ৯০ লাখ ডলার ও নভেম্বর মাসে রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন ১২১ কোটি ৪৭ লাখ ডলার।
উল্লেখ্য, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দেশে রেকর্ড পরিমাণ এক হাজার ৫৩১ কোটি ৬৯ লাখ (১৫ দশমিক ৩১ বিলিয়ন) ডলারের রেমিটেন্স আসে। এরপর প্রতিবছরই রেমিটেন্স কমে যেতে থাকে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে আড়াই শতাংশ কমে গিয়ে রেমিটেন্স আসে এক হাজার ৪৯৩ কোটি ডলার। গত অর্থবছরে (২০১৬-১৭) তা সাড়ে ১৪ শতাংশ কমে আসে এক হাজার ২৭৭ কোটি ডলার, যা ছিল আগের ছয় অর্থবছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের জিডিপিতে ১২ শতাংশ অবদান রাখে প্রবাসীদের পাঠানো এই বৈদেশিক মুদ্রা।








