টানা দ্বিতীয় বছরের মতো বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার ৭০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংশোধিত এডিপির মাত্র ৬৭ দশমিক ৫২ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে, যা গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সঙ্গে আগের অর্থবছরের তুলনায় উন্নয়ন ব্যয় কমেছে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) তাদের ওয়েবসাইটে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এডিপি বাস্তবায়নের চূড়ান্ত চিত্র প্রকাশ করে। আইএমইডির ২০০৪-০৫ অর্থবছর থেকে প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ২২ বছরে এত কম হারে এডিপি বাস্তবায়নের নজির নেই।
তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছরে সংশোধিত এডিপির আকার ছিল ২ লাখ ৮ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকা। এর বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৭১ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ৬৭ দশমিক ৫২ শতাংশ। আগের অর্থবছর ২০২৪-২৫-এ এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ৬৮ শতাংশ। অর্থাৎ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নানা অনিশ্চয়তা থাকা সত্ত্বেও ওই বছর বাস্তবায়নের হার ছিল বিদায়ী অর্থবছরের চেয়ে বেশি।
এডিপি ব্যয়ের ধারাবাহিকতাও উদ্বেগজনক। আইএমইডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় হয়েছিল ২ লাখ ৫ হাজার ১১৮ কোটি টাকা। পরের অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ১ লাখ ৫৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকায়। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যয় আরও প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা কমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৭১ কোটি টাকায়। ফলে টানা তিন অর্থবছর ধরে এডিপি ব্যয়ের পরিমাণ কমছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বিদায়ী অর্থবছরে নির্বাচনকে ঘিরে বিভিন্ন ধরনের অনিশ্চয়তা, প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি এবং প্রকল্প যাচাই-বাছাইয়ের ওপর জোর দেওয়ার কারণে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে গতি কমে যায়। পাশাপাশি দীর্ঘদিনের প্রকল্প বাস্তবায়ন সক্ষমতার দুর্বলতাও এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ।
আইএমইডির তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪-০৫ অর্থবছর থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত অধিকাংশ বছরেই সংশোধিত এডিপির ৮০ থেকে ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়েছে। তবে গত দুই অর্থবছরে এ হার ৭০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে, যা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
অন্যদিকে, মন্ত্রণালয় ও বিভাগভিত্তিক বাস্তবায়ন চিত্রেও বড় ধরনের বৈষম্য দেখা গেছে। সবচেয়ে কম বাস্তবায়ন করেছে সংসদ সচিবালয়। একটি প্রকল্পে ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও পুরো অর্থবছরে ব্যয় হয়েছে মাত্র ১৫ হাজার টাকা। ফলে তাদের বাস্তবায়নের হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ।
সবচেয়ে কম বাস্তবায়নকারী পাঁচ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (১৩ দশমিক ৯৭ শতাংশ), অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (১৭ দশমিক ৪২ শতাংশ), নির্বাচন কমিশন সচিবালয় (২৯ দশমিক ৯০ শতাংশ) এবং স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ (৩১ দশমিক ১৫ শতাংশ)।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এডিপি বাস্তবায়নের ধারাবাহিক নিম্নগতি শুধু উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতিই ব্যাহত করছে না, বরং কর্মসংস্থান, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই প্রকল্প অনুমোদন, অর্থ ছাড় এবং বাস্তবায়ন ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করছেন তারা।









