কারখানা বন্ধের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন উদ্যোক্তারা

গোলাম মওলা 
২৫ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৫৮আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৫৮

দেশের শিল্প খাতের সংকট এখন আর কেবল উৎপাদন ব্যাহত হওয়া বা কয়েক দিনের জন্য কারখানা বন্ধ রাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, ঋণের চাপ, ক্রয়াদেশের অনিশ্চয়তা এবং নতুন বিনিয়োগে স্থবিরতার মধ্যে উদ্যোক্তাদের একটি অংশ এখন স্থায়ীভাবে কারখানা বন্ধের মতো কঠিন সিদ্ধান্তের দিকে এগোচ্ছেন। কেউ উৎপাদন কমাচ্ছেন, কেউ শ্রমিক ছাঁটাই করছেন, আবার কেউ একাধিক কারখানা একীভূত করে সীমিত পরিসরে ব্যবসা টিকিয়ে রাখার পরিকল্পনা করছেন। 

শিল্প উদ্যোক্তাদের শঙ্কা, দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা না গেলে বর্তমানে চলমান সাময়িক বন্ধের একটি অংশ স্থায়ী বন্ধে রূপ নিতে পারে। এতে একদিকে শিল্প উৎপাদনের সক্ষমতা কমবে, অন্যদিকে কর্মসংস্থান সংকট আরও গভীর হবে। সর্বশেষ সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) তথ্যেও দেশের শিল্প খাতের এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এতে সরাসরি কর্মসংস্থান হারিয়েছেন ৬১ হাজার ৮৮১ জন। 

জ্বালানি সংকট থেকে কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল  শিল্প খাতের বর্তমান সংকটের একটি কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরেছেন। তিনি জানিয়েছেন, আগামী দুই বছর গ্যাস ও বিদ্যুতের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই— এমন ধারণা থেকেই তিনি তার মালিকানাধীন একটি পার্টিকেল বোর্ড মিল বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। 

এর আগে জ্বালানি সংকটের কারণে তার মালিকানাধীন পাঁচটি স্পিনিং মিলও বন্ধ হয়ে গেছে। দীর্ঘ সময় ধরে কারখানা উৎপাদন বন্ধ রেখে স্থায়ী ব্যয় বহন, শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন দেওয়া এবং ব্যাংক ঋণের সুদ পরিশোধ করা উদ্যোক্তাদের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। 

শওকত আজিজ রাসেলের বক্তব্যে শিল্প খাতের বর্তমান সংকটের আরেকটি দিকও উঠে এসেছে। তিনি জানিয়েছেন, টিকে থাকার জন্য এখন অবশিষ্ট কারখানাগুলো একীভূত করে সীমিত পরিসরে ব্যবসা পরিচালনার কথা ভাবছেন। অর্থাৎ উদ্যোক্তারা নতুন কারখানা বা উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনার বদলে এখন বিদ্যমান ব্যবসা কীভাবে টিকিয়ে রাখা যায়, সেই হিসাব করছেন। 

এ পরিস্থিতি শিল্প খাতের জন্য বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। কারণ কোনও উদ্যোক্তা যখন উৎপাদন সম্প্রসারণের বদলে কারখানা গুটিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তার প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ থাকে না। কাঁচামাল সরবরাহকারী, পরিবহন, ব্যাংক, বীমা, শ্রমবাজারসহ পুরো শিল্প শৃঙ্খলে এর প্রভাব পড়ে। 

৯৫ কারখানা বন্ধ, কাজ হারিয়েছেন প্রায় ৬২ হাজার মানুষ

সোমবার (২৪ আগস্ট) সিপিডির ‘নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাস: একটি অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক মিডিয়া সংলাপে দেশের শিল্প খাতের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির তথ্য তুলে ধরা হয়। 

সিপিডির হিসাবে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশের তিনটি প্রধান শিল্পাঞ্চল—গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদীতে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এসব কারখানার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ৬১ হাজার ৮৮১ জন মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। 

তবে বাস্তব পরিস্থিতিতে কর্মহীন মানুষের সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ স্থায়ীভাবে বন্ধ কারখানার পাশাপাশি বহু কারখানা সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। আবার অনেক কারখানা চালু থাকলেও উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেক বা তারও কম ব্যবহার করছে। কোথাও কর্মী ছাঁটাই করা হচ্ছে, কোথাও নতুন নিয়োগ বন্ধ রাখা হয়েছে। 

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের ভাষায়, বন্ধ কারখানার সংখ্যার চেয়ে কাজ হারানো মানুষের সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি হতে পারে। স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়া কারখানার শ্রমিকদের বকেয়া মজুরি, সার্ভিস বেনিফিট ও ক্ষতিপূরণ নিয়ে যেমন সংকট তৈরি হয়, তেমনি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকা কারখানার শ্রমিকদের ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। 

তার মতে, গ্যাস, বিদ্যুৎ, কাঁচামাল বা ক্রয়াদেশের সংকটে কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ ধরে বন্ধ থাকা কারখানার সংখ্যাও কম নয়। এসব প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের চাকরি কাগজে-কলমে বহাল থাকলেও আয় এবং কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। 

দুই বছরে বন্ধ প্রায় এক হাজার পোশাক ও বস্ত্র কারখানা

শিল্প সংগঠনগুলোর তথ্য আরও বড় একটি সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন সূত্রে জানা গেছে, আগস্ট ২০২৪ থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত ৪৯৯টি বিজিএমইএ সদস্য কারখানা, ২৩৫টি বিকেএমইএ সদস্য কারখানা, ১৬৬টি বিটিএমএ সদস্য কারখানা এবং ৫৯টি বেপজা-সংশ্লিষ্ট কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। 

অর্থাৎ শুধু এসব সংগঠনের সদস্য কারখানার মধ্যেই দুই বছরে বন্ধের সংখ্যা ৯৫৯টি। এর বাইরে অন্যান্য শিল্প খাতের আরও এক হাজারের বেশি কারখানা ২০২৪ ও ২০২৫ সালে বন্ধ হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো জানিয়েছে। 

সব কারখানা একই কারণে বন্ধ হয়নি। কোনও প্রতিষ্ঠান আর্থিক দুরবস্থায় পড়েছে, কোনোটি ঋণের চাপ সামলাতে পারেনি, কোনোটি কাঁচামাল ও জ্বালানির ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারেনি। আবার কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ, মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা জটিলতা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণেও উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হয়েছে। 

তবে সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি সংকট শিল্প বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। 

গ্যাস নেই, উৎপাদন নেই 

মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি সমস্যা, এলএনজি সংগ্রহে জটিলতা এবং কার্গো গ্রহণসংক্রান্ত সমস্যার কারণে দেশে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছে বলে সিপিডি জানিয়েছে। 

এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে গ্যাসনির্ভর শিল্পে। টেক্সটাইল, স্পিনিং, ডাইং, ইস্পাত, কাগজ, পার্টিকেল বোর্ড ও সিরামিকসহ বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছে না। 

সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, শিল্পে গ্যাসের ব্যবহার ১ হাজার ১৮৬ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে কমে ১ হাজার ১৪৮ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন সূচকের প্রবৃদ্ধিও ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ১ শতাংশে নেমেছে। 

আগস্টের শুরুতে গাজীপুরে তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে শত শত শিল্পকারখানা উৎপাদন কমিয়ে দেয় বা কয়েক দিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে। সাভার-আশুলিয়া ও ভালুকাসহ অন্যান্য শিল্পাঞ্চলেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়। উৎপাদন বন্ধ থাকলেও কারখানার ভাড়া, ব্যাংক ঋণের সুদ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন এবং অন্যান্য স্থায়ী ব্যয় বহন করতে হয় উদ্যোক্তাদের। 

ফলে কয়েক দিনের জ্বালানি সংকটও অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। 

কারখানা চালালেও বাড়ছে লোকসান

শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য বর্তমান সংকটের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, কারখানা বন্ধ রাখা যেমন ব্যয়বহুল, তেমনি সীমিত উৎপাদনে কারখানা চালু রাখাও লোকসানের কারণ হয়ে উঠছে। 

একটি স্পিনিং বা টেক্সটাইল কারখানা নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদনের জন্য নকশা করা হয়। গ্যাসের চাপ কম থাকলে যন্ত্রপাতি পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যায় না। বারবার উৎপাদন বন্ধ ও চালু করতে হয়। এতে উৎপাদন কমে যায়, কিন্তু বিদ্যুৎ, শ্রমিক, ব্যাংক ঋণ, কারখানার রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রশাসনিক ব্যয়ের বড় অংশ অপরিবর্তিত থাকে। 

ফলে প্রতি ইউনিট পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। আন্তর্জাতিক বাজারে যেখানে বাংলাদেশি পণ্যকে অন্য দেশের প্রতিযোগীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হয়, সেখানে বাড়তি ব্যয় সবসময় ক্রেতার ওপর চাপানোও সম্ভব হয় না। 

অনেক উদ্যোক্তা তাই এখন একটি কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি— লোকসান দিয়ে কারখানা চালাবেন, নাকি উৎপাদন বন্ধ রেখে ক্ষতি কমানোর চেষ্টা করবেন। 

ব্যাংক ঋণ এখন নতুন উদ্বেগ

কারখানা বন্ধ করার সিদ্ধান্তের সঙ্গে ব্যাংক ঋণের বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেলে প্রতিষ্ঠানের নগদ অর্থপ্রবাহ কমে যায় বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু ব্যাংকের কিস্তি ও সুদের দায় থেকে যায়। 

শওকত আজিজ রাসেল জানিয়েছেন, ব্যাংক লাইবিলিটি বা ঋণের বোঝা বহন করা এখন কঠিন হয়ে পড়ছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কারখানা বন্ধ হলেও ব্যাংকের দায় পরিশোধের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে, এমনকি প্রয়োজন হলে অবশিষ্ট সম্পদ বিক্রি করেও পাওনা পরিশোধের উদ্যোগ নিতে হবে। 

এটি শিল্প খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। কারণ উদ্যোক্তা যখন ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য সম্পদ ব্যবহার করার বদলে ঋণ পরিশোধে সম্পদ বিক্রির কথা ভাবেন, তখন তা নতুন বিনিয়োগের সক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়। 

ব্যাংকের দিক থেকেও এটি ঝুঁকিপূর্ণ। বন্ধ কারখানা বাড়লে খেলাপি ঋণের চাপ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। আর নতুন ঋণ বিতরণ কমে গেলে শিল্পে বিনিয়োগের প্রবাহ আরও দুর্বল হতে পারে।

বিনিয়োগ খরায় নতুন কারখানাও হচ্ছে না

কারখানা বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগ কমে যাওয়া শিল্প খাতের জন্য আরও বড় উদ্বেগের বিষয়।

সিপিডির পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে। নিট বিদেশি বিনিয়োগ ৬৬২ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৫৯৪ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি খোলার প্রবৃদ্ধি ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ঋণাত্মক ১৩ দশমিক ৬ শতাংশে নেমেছে। 

মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি সাধারণত নতুন শিল্প স্থাপন বা বিদ্যমান শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। এই খাতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি নতুন বিনিয়োগের দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। 

ফলে এখন দেশের সামনে দ্বিমুখী সংকট তৈরি হয়েছে। একদিকে পুরোনো কারখানা বন্ধ হচ্ছে বা উৎপাদন কমাচ্ছে, অন্যদিকে নতুন কারখানা গড়ে ওঠার গতি কমে গেছে। এতে বন্ধ কারখানার শ্রমিকরা নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছেন না। 

কর্মসংস্থান সংকট আরও গভীর হওয়ার শঙ্কা

একটি কারখানা বন্ধ হওয়ার প্রভাব শুধু কারখানার ভেতরে কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারীদের ওপর পড়ে না। কারখানাটির সঙ্গে যুক্ত পরিবহন শ্রমিক, কাঁচামাল সরবরাহকারী, ছোট ব্যবসায়ী, খাবারের দোকান, বাসা ভাড়ার বাজারসহ স্থানীয় অর্থনীতির বিভিন্ন অংশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বিশেষ করে গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর মতো শিল্পাঞ্চলে কারখানা বন্ধ হলে স্থানীয় অর্থনীতিতে দ্রুত এর প্রভাব দেখা যায়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক দশমিক ২৮ শতাংশে। অর্থাৎ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় শিল্প উৎপাদন কমেছে।

সিপিডির সর্বশেষ পর্যালোচনায়ও শিল্প উৎপাদন প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে শূন্যে নেমে আসার কথা বলা হয়েছে। উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধিও ৩ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে শূন্যে নেমেছে।

শিল্প উৎপাদন স্থবির হয়ে পড়লে কর্মসংস্থান বাড়ার সুযোগও সংকুচিত হয়। অথচ কর্মসংস্থান এখন অর্থনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

উৎপাদন কমলে বাড়বে আমদানিনির্ভরতা

উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, দেশের ভেতরে উৎপাদন সক্ষমতা এভাবে কমতে থাকলে অনেক পণ্যের ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভরতা বাড়বে। বিশেষ করে স্থানীয় শিল্প যেসব পণ্যের চাহিদা পূরণ করে, সেসব কারখানা বন্ধ হলে বাজারে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হতে পারে। 

তখন চাহিদা মেটাতে আমদানি বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে। এতে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়বে, অন্যদিকে স্থানীয় মূল্য সংযোজন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাবে। 

একটি উৎপাদনমুখী অর্থনীতির মূল শক্তি হলো কারখানা, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান। শিল্প খাত দুর্বল হলে প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি রাজস্ব আদায়, রপ্তানি, ব্যাংকিং এবং স্থানীয় বাজারের ওপরও চাপ পড়ে। 

এ কারণেই শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, কারখানা বন্ধের বর্তমান প্রবণতাকে বিচ্ছিন্ন কিছু প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক ব্যর্থতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি অর্থনীতির সামগ্রিক সক্ষমতার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। 

অতীতের সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন জ্বালানি সমস্যা

গত দুই বছরে রাজনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কাঁচামালের ব্যয় বৃদ্ধি, ঋণের উচ্চ সুদ, ডলার সংকট, আমদানি জটিলতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তা শিল্প খাতকে চাপের মধ্যে রেখেছে।

এর মধ্যে কিছু শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠীর কারখানা বন্ধ হওয়া এবং শ্রমিক অসন্তোষও শিল্পাঞ্চলগুলোতে প্রভাব ফেলেছে।

বর্তমান সময়ে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকট। ফলে আগে থেকেই আর্থিকভাবে দুর্বল অনেক কারখানা এখন নতুন করে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।

নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের মতে, বিভিন্ন খাতের কয়েক হাজার কারখানা স্থায়ী ও সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘ জ্বালানি সংকটের কারণে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার পাশাপাশি বহু উদ্যোক্তা আর্থিক সংকটে পড়েছেন। ঋণ ও কর পরিশোধও অনেকের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খানও বলেছেন, শিল্প খাতে অস্থিরতা ও ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে অনেক কারখানা স্থায়ী ও সাময়িকভাবে বন্ধ হয়েছে এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ কর্মহীন হয়েছেন। 

কারখানা বন্ধ আর শুধু ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নয় 

সাধারণত কোনও কারখানা বন্ধ হওয়ার সিদ্ধান্ত একটি ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু বর্তমানে শিল্প খাতে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে বিষয়টি বৃহত্তর অর্থনৈতিক সংকেত হিসেবে দেখা জরুরি। 

একজন উদ্যোক্তা যখন একের পর এক কারখানা বন্ধ করেন, অন্য উদ্যোক্তা উৎপাদন কমান, কেউ নতুন বিনিয়োগ স্থগিত করেন এবং কেউ কারখানা একীভূত করে ছোট আকারে টিকে থাকার চেষ্টা করেন— তখন এটি শিল্প খাতের আস্থার সংকটের ইঙ্গিত দেয়।

বিশেষ করে জ্বালানি পরিস্থিতি আগামী এক বা দুই বছর স্বাভাবিক হবে না— এমন ধারণা যদি উদ্যোক্তাদের মধ্যে শক্তিশালী হয়, তাহলে তারা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ থেকে আরও দূরে সরে যেতে পারেন। 

ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ করেন ভবিষ্যতের বাজার, নীতি এবং জ্বালানি সরবরাহ সম্পর্কে একটি নির্দিষ্ট ধারণার ভিত্তিতে। এই তিন ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা বাড়লে নতুন কারখানা স্থাপন বা পুরোনো কারখানার সম্প্রসারণের সিদ্ধান্তও পিছিয়ে যায়। 

প্রয়োজন জরুরি ও সমন্বিত উদ্যোগ

সিপিডি জ্বালানি, ব্যাংকিং, রাজস্ব, ব্যয়, বিনিয়োগ, লজিস্টিকস ও ডিজিটালাইজেশনসহ বিভিন্ন খাতে একটি সমন্বিত সংস্কার প্যাকেজ নেওয়ার সুপারিশ করেছে। জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, কৌশলগত মজুত গড়ে তোলা এবং জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণের পরামর্শও দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। 

শিল্প উদ্যোক্তাদের দৃষ্টিতে এখন সবচেয়ে জরুরি হলো গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ সম্পর্কে একটি বাস্তবসম্মত এবং নির্ভরযোগ্য রোডম্যাপ দেওয়া। কোথায় কতদিন সংকট থাকবে, কোন শিল্পাঞ্চলে কতটুকু সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সরকারের পরিকল্পনা কী— এসব বিষয়ে স্পষ্টতা চান তারা। 

একই সঙ্গে আর্থিক সংকটে থাকা কিন্তু সম্ভাবনাময় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকিয়ে রাখতে ব্যাংক ঋণ পুনর্বিন্যাস, কার্যকর মূলধন সহায়তা এবং ব্যবসাবান্ধব নীতি প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। 

কারণ একটি কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সেটি পুনরায় চালু করা অনেক সময় নতুন কারখানা স্থাপনের চেয়েও কঠিন হয়ে পড়ে। যন্ত্রপাতি অচল হয়, দক্ষ শ্রমিক অন্যত্র চলে যান, সরবরাহ ও ক্রেতা নেটওয়ার্ক ভেঙে যায় এবং ব্যাংক ঋণের জটিলতা আরও বাড়ে। 

ফলে বর্তমান সংকট মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া না গেলে সাময়িক জ্বালানি সংকট ধীরে ধীরে স্থায়ী শিল্প সক্ষমতা হারানোর সংকটে পরিণত হতে পারে। 

সব মিলিয়ে দেশের শিল্প খাত এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে উদ্যোক্তাদের সিদ্ধান্ত শুধু একটি কারখানা চালু বা বন্ধ রাখার প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান, ব্যাংকের ঋণ, নতুন বিনিয়োগ এবং দেশের ভবিষ্যৎ উৎপাদন সক্ষমতা। কারখানা বন্ধের এই প্রবণতা থামাতে না পারলে অর্থনীতির জন্য এর মূল্য হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি।

/এসটি/ 
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
গঙ্গা চুক্তিতে ৫৫ শতাংশ ক্ষেত্রেই ন্যূনতম পানি পায়নি বাংলাদেশ
গঙ্গা চুক্তিতে ৫৫ শতাংশ ক্ষেত্রেই ন্যূনতম পানি পায়নি বাংলাদেশ
এক বস্তা সারে ৫০ টাকা বেশি নিয়ে ৩০ হাজার জরিমানা গুনলেন ব্যবসায়ী
এক বস্তা সারে ৫০ টাকা বেশি নিয়ে ৩০ হাজার জরিমানা গুনলেন ব্যবসায়ী
আছিয়া ধর্ষণ-হত্যা মামলা: হাইকোর্টের রায় আজ
আছিয়া ধর্ষণ-হত্যা মামলা: হাইকোর্টের রায় আজ
সরকারি গোডাউনের ৩২৭ টন সার অবৈধভাবে বিক্রি করে দিলেন স্টোরকিপার
সরকারি গোডাউনের ৩২৭ টন সার অবৈধভাবে বিক্রি করে দিলেন স্টোরকিপার
সর্বাধিক পঠিত
ঘুম থেকে তুলে ছেলেকে পুলিশের হাতে দিই, গায়ে ছিল গেঞ্জি: সিদ্ধার্থের বাবা
ঘুম থেকে তুলে ছেলেকে পুলিশের হাতে দিই, গায়ে ছিল গেঞ্জি: সিদ্ধার্থের বাবা
বরিশাল থেকে সব রুটে বাস চলাচল বন্ধ
বরিশাল থেকে সব রুটে বাস চলাচল বন্ধ
‘চিন্তা করো না আগামী, আমি তোমার সঙ্গে ছিলাম, আছি, থাকবো’
‘চিন্তা করো না আগামী, আমি তোমার সঙ্গে ছিলাম, আছি, থাকবো’
‘পরের বছর থেকে হবে না শর্তে ২৮ আগস্ট হচ্ছে নৌকাবাইচ’
‘পরের বছর থেকে হবে না শর্তে ২৮ আগস্ট হচ্ছে নৌকাবাইচ’
৪০ লাখের বেশি ইভি ফেরত নেওয়ার নির্দেশ
৪০ লাখের বেশি ইভি ফেরত নেওয়ার নির্দেশ