বহুমুখী সংকটে চাপ বাড়ছে জনজীবনে

আসাদ আবেদীন জয়
০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:০০ আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২:৩২

সকাল থেকে গ্যাস নেই। রান্না করতে না পেরে বাড়তি খরচে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। সন্ধ্যায় কর্মস্থল থেকে ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরেই দেখা যাচ্ছে বিদ্যুৎ নেই। আবার বাজারে গেলে আগের তুলনায় বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের জন্য। আয় না বাড়লেও খরচ কমছে না; বরং একের পর এক নতুন ব্যয় যোগ হচ্ছে সংসারে।

গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে কর্মসংস্থানে অনিশ্চয়তা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তুলনামূলক উচ্চমূল্য; নানামুখী এই চাপ একসঙ্গে এসে পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবনে। মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও বাজারে তার প্রভাব খুব বেশি অনুভূত হচ্ছে না। ফলে আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো।

গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে বাড়ছে ভোগান্তি

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের সংকট আরও তীব্র হয়েছে। আগে গ্যাসের সংকট অনেকটা নির্দিষ্ট সময় বা এলাকায় সীমিত থাকলেও এখন অনেক বাসাবাড়িতে নিয়মিত গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঘন ঘন লোডশেডিং।

মূলত গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়া, এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন এবং একই সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট হলেও সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ১ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটে।

গ্যাসের ঘাটতির প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পাওয়ায় অনেক কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। বিদ্যুৎ উৎপাদনে দৈনিক যেখানে ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন, সাম্প্রতিক সময়ে সরবরাহ ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুটের নিচেও নেমেছে।

এর মধ্যে গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে। ফলে কোনো কোনো সময়ে সরবরাহ ঘাটতি ৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটেরও বেশি হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি না থাকায় সেই সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

মিরপুরের বাসিন্দা মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘সারাদিন অফিস করে বাসায় ফিরে একটু বিশ্রাম নেবো, সেটাও সম্ভব হচ্ছে না। প্রায় সময়ই বাসায় আসি আর বিদ্যুৎ চলে যায়। সন্ধ্যার পর থেকে কয়েকবার বিদ্যুৎ চলে যায়।’

একই এলাকার বাসিন্দা আফসারি খানম বলেন, ‘আগে শীতের সময় আমাদের এখানে গ্যাসের সমস্যা হতো। অন্য সময় ঠিক থাকতো। এখন তো কোনো সময়ই গ্যাস থাকে না। বিদ্যুৎও দিনে তিন-চারবারের বেশি চলে যায়।’

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের কারণে শুধু ভোগান্তিই বাড়ছে না, বাড়ছে সংসারের খরচও। বিদ্যুৎ না থাকলে অনেককে জেনারেটর বা বিকল্প ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হচ্ছে। গ্যাস না থাকায় কেউ কেউ সিলিন্ডার কিনছেন, আবার অনেকে রান্নার জন্য ইলেকট্রিক চুলা ব্যবহার করছেন। ফলে মাসিক ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বাড়তি খরচ।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বি. ডি. রহমত উল্লাহ বলেন, আপাতত জ্বালানি সরবরাহ কিছুটা বাড়ানো গেলে লোডশেডিং কমানো সম্ভব। তবে তাৎক্ষণিকভাবে সংকট পুরোপুরি দূর করার সুযোগ সীমিত। কারণ দ্রুত অতিরিক্ত জ্বালানি এনে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো সহজ নয়। একই সঙ্গে গরমের কারণে বিদ্যুতের চাহিদাও বেড়েছে। তবে জ্বালানি সরবরাহ বাড়িয়ে লোডশেডিং কমানোর সুযোগ সরকারের রয়েছে।

সংকটে শিল্প, অনিশ্চয়তায় শ্রমিক

গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটের প্রভাব শুধু বাসাবাড়িতে সীমাবদ্ধ নেই। শিল্পকারখানাতেও এর চাপ পড়ছে। উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া, ব্যাংকঋণ ও নগদ অর্থের সংকটসহ নানা কারণে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শ্রমিকদের কর্মসংস্থানে।

শিল্প পুলিশ, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিজিএমইএর সদস্য অন্তত ৮০টি কারখানায় প্রায় ১৯ হাজার ১৮৮ শ্রমিক চাকরিচ্যুত বা ছাঁটাই হয়েছেন। এর মধ্যে ২৭টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।

তবে কারখানা বন্ধের এই প্রবণতা নতুন নয়। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সাত মাসে গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী; এই তিন শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছিল। এসব কারখানায় কর্মরত ৬১ হাজার ৮৮১ শ্রমিক-কর্মচারী কর্মসংস্থান হারান।

শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ে গাজীপুরে ৫৪টি, নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী অঞ্চলে ২৩টি এবং সাভার-আশুলিয়া-ধামরাই এলাকায় ১৮টি তৈরি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়। গাজীপুরের বন্ধ হওয়া কারখানাগুলোর প্রায় সবই তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতসংশ্লিষ্ট। শুধু এই জেলাতেই প্রায় ৪৫ হাজার ৭৩২ শ্রমিক-কর্মচারী চাকরি হারান।

কারখানা বন্ধের বিষয়ে গত বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে সংসদ সদস্য মো. রুহুল আমিনের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানান, ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত তিন বছরে চার শতাধিক পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে বিজিএমইএর সদস্য ২৮২টি এবং বিকেএমইএর সদস্য ১২৩টি কারখানা রয়েছে।

কারখানা বন্ধ হওয়া মানে শুধু একজন শ্রমিকের চাকরি হারানো নয়। একটি পরিবারের আয় কমে যাওয়া, সন্তানের পড়াশোনা নিয়ে অনিশ্চয়তা, বাড়িভাড়া ও বাজার খরচ কমিয়ে আনা; সবকিছুর ওপর এর প্রভাব পড়ে। একই সঙ্গে স্থানীয় দোকান, পরিবহন ও ছোট ব্যবসাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

মূল্যস্ফীতি কমেছে, বাজারের চাপ কমেনি

সরকারি হিসাবে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি জুনের ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ হয়েছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ থেকে কমে ৭ দশমিক ১৬ শতাংশে নেমেছে। খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ। জুলাইয়ের সার্বিক মূল্যস্ফীতি গত আট মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন।

তবে মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়। এর অর্থ হলো, আগের তুলনায় দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে। ফলে যে পণ্যের দাম ইতিমধ্যে অনেক বেড়ে গেছে, সেটি আগের দামে ফিরে আসছে না।

এ কারণেই বাজারে স্বস্তি ফিরছে না বলে মনে করছেন সাধারণ ক্রেতারা। সবজি, ডিম, মাছ, মাংস, তেল, চিনি ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এখনও অনেক পরিবারের বাজেটের ওপর চাপ তৈরি করছে।

বাজার করতে আসা কাওসার আহমেদ বলেন, ‘শুনছি গ্যাস, কারেন্ট এসবের ঘাটতির জন্য নাকি চিনির দাম বেড়ে গেছে, আটার দামও বেড়েছে। যদি আসলেই গ্যাস-কারেন্টের জন্য এসবের দাম বেড়ে থাকে, তাহলে আমাদের বিপদ আছে।’

আয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে খরচ

সাধারণ মানুষের সমস্যাটা শুধু পণ্যের দাম বাড়ায় নয়; একই সঙ্গে বাড়ছে সংসার চালানোর অন্যান্য খরচও। বিদ্যুৎ না থাকলে বিকল্প ব্যবস্থা, গ্যাস না থাকলে সিলিন্ডার, যাতায়াত, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসাভাড়ার মতো নিয়মিত খরচের সঙ্গে এসব বাড়তি ব্যয় যুক্ত হচ্ছে।

অন্যদিকে আয় একই থাকলে সংসারের হিসাব মেলানো আরও কঠিন হয়ে পড়ে। কেউ বাজারের তালিকা ছোট করছেন, কেউ আগের তুলনায় কম মাছ-মাংস কিনছেন, কেউ সন্তানদের অতিরিক্ত খরচ কমাচ্ছেন। আবার চাকরি হারানো পরিবারগুলোকে সঞ্চয় ভেঙে বা ধার করে সংসার চালাতে হচ্ছে।

অর্থনীতির পরিসংখ্যানে মূল্যস্ফীতি কমার খবর স্বস্তির হতে পারে। কিন্তু একজন পরিবারের কাছে আসল হিসাব হলো, মাস শেষে আয় থেকে কত টাকা হাতে থাকছে। সেই জায়গায় যদি বাজার, জ্বালানি ও দৈনন্দিন ব্যয় কমে না আসে, তাহলে মূল্যস্ফীতির হার কমলেও মানুষের স্বস্তি ফিরতে সময় লাগবে।

সব মিলিয়ে গ্যাস-বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট, শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য; তিন দিকের চাপেই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠছে। সংকটগুলোর কোনোটি সাময়িক, কোনোটি দীর্ঘদিনের; কিন্তু এর প্রভাব পড়ছে একই জায়গায়; মানুষের আয়-ব্যয়ের হিসাব এবং জীবনযাত্রার মানে।

এখন মানুষের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা; আয় না বাড়লেও অন্তত যেন নিত্যদিনের খরচ আর না বাড়ে, ঘরে যেন নিয়মিত গ্যাস-বিদ্যুৎ থাকে এবং কাজের সুযোগ যেন কমে না যায়।

/এম/জিএম/ইউএস/
সম্পর্কিত
পূজার ছুটি শেষে ফিরে দেখেন বাসায় রাখা অর্ধকোটি টাকা আর ৮ ভরি স্বর্ণালঙ্কার নেই
জনবল নেবে আকিজ বশির গ্রুপ, অভিজ্ঞতা ছাড়াও আবেদনের সুযোগ
১০ হাজারের বেশি পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ, আবেদনের বাকি ৬ দিন
সর্বশেষ খবর
বাজারে শীতের সবজি, দামে অস্বস্তি
বাজারে শীতের সবজি, দামে অস্বস্তি
রোনালদোর ৯৮২তম গোল নিয়ে বিতর্ক
রোনালদোর ৯৮২তম গোল নিয়ে বিতর্ক
সংস্কৃতির কথা বলা লোকেরাই আমার পরিবারকে গালিগালাজ করেছেন: কৃতি
সংস্কৃতির কথা বলা লোকেরাই আমার পরিবারকে গালিগালাজ করেছেন: কৃতি
বঙ্গোপসাগরে সুস্পষ্ট লঘুচাপ: কেমন থাকবে আজকের আবহাওয়া?
বঙ্গোপসাগরে সুস্পষ্ট লঘুচাপ: কেমন থাকবে আজকের আবহাওয়া?
সর্বাধিক পঠিত
পূজার ছুটি শেষে ফিরে দেখেন বাসায় রাখা অর্ধকোটি টাকা আর ৮ ভরি স্বর্ণালঙ্কার নেই
পূজার ছুটি শেষে ফিরে দেখেন বাসায় রাখা অর্ধকোটি টাকা আর ৮ ভরি স্বর্ণালঙ্কার নেই
‘আমার মৃত্যুর জন্য দায়ী ইউএনও’ ফেসবুকে সহকারী কমিশনারের পোস্ট
‘আমার মৃত্যুর জন্য দায়ী ইউএনও’ ফেসবুকে সহকারী কমিশনারের পোস্ট
সাগরকন্যার সৌন্দর্যে মুগ্ধ দুই মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, ঘুরলেন ভ্যানে চড়ে
সাগরকন্যার সৌন্দর্যে মুগ্ধ দুই মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, ঘুরলেন ভ্যানে চড়ে
‘কার্যক্রম নিষিদ্ধ আ.লীগের সঙ্গে জামায়াতের আঁতাত, তথ্যপ্রমাণ সামনে এনেছে বিএনপি’
‘কার্যক্রম নিষিদ্ধ আ.লীগের সঙ্গে জামায়াতের আঁতাত, তথ্যপ্রমাণ সামনে এনেছে বিএনপি’
যাত্রীহীন নৌপথ, পেশা ছেড়ে বিকল্প আয়ের পথ খুঁজছেন ট্রলার মালিক-চালকরা
যাত্রীহীন নৌপথ, পেশা ছেড়ে বিকল্প আয়ের পথ খুঁজছেন ট্রলার মালিক-চালকরা