চার এনবিএফআইয়ের আমানত ফেরতের উদ্যোগ, পিপলস লিজিংয়ের কী হবে

গোলাম মওলা
২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯:২৩ আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯:২৩

ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে (এনবিএফআই) আমানত রেখে অর্থ ফেরত না পাওয়ার দীর্ঘ সংকটের মধ্যে চারটি প্রতিষ্ঠান বন্ধের প্রক্রিয়ায় থাকা ব্যক্তিগত আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের জন্য একটি কাঠামো তৈরি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে আমানতের পরিমাণ অনুযায়ী সর্বোচ্চ ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের বৃহস্পতিবারের (২৪ সেপ্টেম্বর) সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগে দীর্ঘদিন ধরে আমানত ফেরতের অপেক্ষায় থাকা পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের (পিএলএফএসএল) গ্রাহকদের মধ্যেও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। তাদের দাবি, চারটি প্রতিষ্ঠানের জন্য যদি আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের বিশেষ কাঠামো তৈরি করা যায়, তাহলে পিপলস লিজিংয়ের ব্যক্তিগত আমানতকারীদেরও একই বা সমমানের কাঠামোর আওতায় আনার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।

পিপলস লিজিংয়ের আমানতকারীদের সংগঠন ‘অ্যালায়েন্স অব ৬ এনবিএফআইস ডিপোজিটর রিকভারি কমিটি’র আহ্বায়ক জাফর উল্লাহ খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, পিপলস লিজিংয়ের আমানতকারীরা প্রায় আট বছর ধরে তাদের কষ্টার্জিত অর্থ ফেরতের অপেক্ষায় রয়েছেন। দীর্ঘ সময় ধরে অর্থ আটকে থাকায় তাদের অনেকেই আর্থিকভাবে চাপে রয়েছেন।

তিনি বলেন, চারটি এনবিএফআইয়ের আমানতকারীদের জন্য যখন একটি ফেরত কাঠামো তৈরি হয়েছে, তখন পিপলস লিজিংয়ের ব্যক্তিগত আমানতকারীদেরও সমান বা সমমানের সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন।

আমানত যত বেশি, ফেরতের হার তত কম

বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদিত কাঠামো অনুযায়ী, চারটি প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিগত আমানতকারীরা ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত মূল আমানত পুরোপুরি ফেরত পাবেন।

তবে ৫০ লাখ টাকার বেশি আমানত থাকলে পুরো অর্থ ফেরত দেওয়া হবে না। আমানতের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফেরতের হার কমবে।

৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত আমানত থাকলে সর্বোচ্চ ৬০ লাখ টাকা ফেরত দেওয়ার কাঠামো রাখা হয়েছে। ১ কোটি থেকে দেড় কোটি টাকা পর্যন্ত আমানতের ক্ষেত্রে ফেরতের সর্বোচ্চ সীমা ৮০ লাখ টাকা। দেড় কোটি থেকে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত আমানত থাকলে সর্বোচ্চ ১ কোটি ৫ লাখ টাকা ফেরত দেওয়া হবে।

আর ২ কোটি টাকা বা তার বেশি আমানত থাকলে সর্বোচ্চ ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা ফেরত পাবেন আমানতকারী।

অর্থাৎ, কারও আমানতের পরিমাণ ২ কোটি টাকা হোক বা ৫ কোটি টাকা—এই প্রাথমিক কাঠামো অনুযায়ী তিনি সর্বোচ্চ ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা ফেরত পাবেন। অবশিষ্ট অর্থ ফেরত পাওয়ার বিষয়টি নির্ভর করবে পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ উদ্ধার, ঋণ আদায় ও অবসায়ন প্রক্রিয়ার ওপর।

কেন বন্ধ হচ্ছে চার প্রতিষ্ঠান

বন্ধের প্রক্রিয়ায় থাকা চার প্রতিষ্ঠান হলো; আভিভা ফাইন্যান্স, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, এফএএস ফাইন্যান্স এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপি ঋণের হার ৯৩ শতাংশ থেকে প্রায় ১০০ শতাংশে পৌঁছেছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রমের মাধ্যমে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা কার্যত সংকুচিত হয়ে পড়েছে।

চার প্রতিষ্ঠানে মোট আমানতের পরিমাণ প্রায় ১২ হাজার ৪৮৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে আভিভা ফাইন্যান্সে ৫ হাজার ৩৬৮ কোটি, ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ে ৩ হাজার ১২ কোটি, এফএএস ফাইন্যান্সে ১ হাজার ২৪৬ কোটি এবং ফারইস্ট ফাইন্যান্সে ৪৪৯ কোটি টাকা আমানত রয়েছে।

গত ৯ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক চার প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত করে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ শূন্য ঘোষণা করা হয়। পরে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়।

বর্তমানে প্রশাসকেরা প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ, দায়, ঋণ ও আমানতের হিসাব তৈরি করছেন। সরকারের পক্ষ থেকে প্রাথমিকভাবে আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পরে প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ বিক্রি এবং ঋণ আদায়ের মাধ্যমে অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা করা হবে।

পিপলস লিজিংয়ের ক্ষেত্রে কী হচ্ছে

পিপলস লিজিংয়ের সংকট অবশ্য চার প্রতিষ্ঠানের তুলনায় আলাদা প্রক্রিয়ায় এগিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির অবসায়ন ও আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে আদালত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে।

এই দীর্ঘসূত্রতাই এখন আমানতকারীদের প্রধান উদ্বেগ। তাদের বক্তব্য, প্রায় ৮ বছর ধরে অর্থ আটকে থাকায় অনেক ব্যক্তি আমানতকারী তাদের সঞ্চয় ব্যবহার করতে পারছেন না। কেউ কেউ চিকিৎসা, শিক্ষা, পারিবারিক প্রয়োজন কিংবা অবসরকালীন জীবনের জন্য রাখা অর্থের ওপর নির্ভর করতে পারছেন না।

জাফর উল্লাহ খান বলেন, ‘চারটি এনবিএফআইয়ের আমানতকারীদের জন্য যদি সমাধানের একটি কাঠামো তৈরি হয়, তাহলে পিপলস লিজিংয়ের ব্যক্তিগত আমানতকারীদের বিষয়টিও একইভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।’

তাঁর মতে, উপযুক্ত আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার মাধ্যমে পিপলস লিজিংয়ের আমানতকারীদেরও একই বা সমমানের অর্থ ফেরত কাঠামোর আওতায় আনার সুযোগ আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার।

শুধু টাকা ফেরত নয়, সম্পদ উদ্ধারের প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ

চার এনবিএফআইয়ের জন্য নতুন কাঠামো তৈরি হলেও এতে পুরো আমানত ফেরতের নিশ্চয়তা নেই। কারণ প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট আমানতের তুলনায় তাদের সম্পদ ও আদায়যোগ্য ঋণের বাস্তব অবস্থা বড় বিষয়।

বিশেষ করে খেলাপি ঋণের হার ৯৩ শতাংশ থেকে প্রায় ১০০ শতাংশ হওয়ায় সম্পদ উদ্ধার ও ঋণ আদায় কতটা সম্ভব হবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ।

এখানেই আমানতকারীদের সুরক্ষার প্রশ্নটি সামনে আসে। প্রাথমিকভাবে একটি নির্দিষ্ট অঙ্ক ফেরত দেওয়ার পর অবশিষ্ট অর্থ উদ্ধারের জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, কত সময়ের মধ্যে তা করা হবে এবং প্রতিষ্ঠানের দায়ী ব্যক্তিদের কাছ থেকে অর্থ উদ্ধারে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ শুধু প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিলে আমানতকারীদের সংকটের সমাধান হয় না। বন্ধের পর সম্পদ শনাক্ত, মূল্যায়ন, বিক্রি এবং ঋণ আদায়ের কার্যকর ব্যবস্থা না হলে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হতে পারে।

২০ এনবিএফআই নিয়ে আগের উদ্যোগ

এনবিএফআই খাতের সংকট অবশ্য নতুন নয়। গ্রাহকের আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থ ২০টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গত বছর লাইসেন্স বাতিলের উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।

এর মধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে প্রথম ধাপে বন্ধের জন্য বাছাই করা হয়। পিপলস লিজিংয়ের ক্ষেত্রে মামলা-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে প্রক্রিয়াটি অন্যদের তুলনায় আলাদাভাবে এগিয়েছে। অন্যদিকে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

এতে স্পষ্ট, এনবিএফআই খাতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থতার সমস্যার সমাধান এখন কেবল একটি বা দুটি প্রতিষ্ঠানের বিষয় নয়। পুরো খাতের ওপর আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনাও বড় চ্যালেঞ্জ।

সমাধানের কেন্দ্রে থাকতে হবে আমানতকারী

চার প্রতিষ্ঠানের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন কাঠামো আমানত ফেরতের একটি প্রাথমিক পথ তৈরি করেছে। এখন এর বাস্তবায়ন কত দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে হয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

একই সঙ্গে পিপলস লিজিংয়ের মতো দীর্ঘদিন ধরে সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানের আমানতকারীদের বিষয়েও একটি কার্যকর সমাধান প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা মেনেই কোন পথে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া যায়, সেটি নির্ধারণ করতে হবে। তবে যেকোনো সমাধানের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে সাধারণ আমানতকারী; যিনি একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা রেখে নিজের সঞ্চয় জমা রেখেছিলেন।

চার এনবিএফআইয়ের ক্ষেত্রে নতুন কাঠামো সেই আলোচনাকে আবার সামনে এনেছে। এখন প্রশ্ন হলো, দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা অন্য প্রতিষ্ঠানের আমানতকারীদের জন্যও একই ধরনের সুরক্ষা ও অর্থ ফেরতের কার্যকর পথ তৈরি হবে কি না।

/ইউএস/
সম্পর্কিত
তেলের ধাক্কায় ট্রাক ভাড়া বেড়েছে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত, চাল-পেঁয়াজে কত
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল ব্যাংকিং বন্ধ হলে কর্মীদের কী হবে
ভোরের বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে রাস্তা-ঘাট, জলাবদ্ধতায় দুর্ভোগ
সর্বশেষ খবর
বর্ষায় জলের রাজ্য, শীতে সবুজের সমারোহ যে বিল
বর্ষায় জলের রাজ্য, শীতে সবুজের সমারোহ যে বিল
ফিলিস্তিন ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ব্যর্থ: আইরিশ প্রধানমন্ত্রী
ফিলিস্তিন ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ব্যর্থ: আইরিশ প্রধানমন্ত্রী
মালয়েশিয়ার কাছে তিন গোল, ‘অসহায়’ ডুলি
মালয়েশিয়ার কাছে তিন গোল, ‘অসহায়’ ডুলি
স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত না হলে উন্নত সমাজ গড়া সম্ভব নয়: রিজভী
স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত না হলে উন্নত সমাজ গড়া সম্ভব নয়: রিজভী
সর্বাধিক পঠিত
জাতিসংঘের ওয়েবসাইটে জাইমা রহমানের বায়োতে যা লেখা হয়েছে
জাতিসংঘের ওয়েবসাইটে জাইমা রহমানের বায়োতে যা লেখা হয়েছে
জাতিসংঘে খলিলুর রহমানের কার্যালয়ে লিগ্যাল অফিসার হলেন জাইমা রহমান
জাতিসংঘে খলিলুর রহমানের কার্যালয়ে লিগ্যাল অফিসার হলেন জাইমা রহমান
বাংলাদেশকে ধন্যবাদ জানালেন ট্রাম্প
বাংলাদেশকে ধন্যবাদ জানালেন ট্রাম্প
হাসপাতালে ভর্তি ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’-এর সেই রইছ
হাসপাতালে ভর্তি ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’-এর সেই রইছ
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে টানা ৭ দিনের ছুটি 
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে টানা ৭ দিনের ছুটি