জীবনবিমায় বড় পরিবর্তন: এই রোগ থাকলে মিলবে না অতিরিক্ত সুবিধা

গোলাম মওলা
০৩ আগস্ট ২০২৬, ০৯:১৫আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০২৬, ০৯:২৮

জীবনবিমা করার সময় অনেকেই মূল পলিসির সঙ্গে অতিরিক্ত কিছু সুবিধা বা ‘রাইডার’ যুক্ত করেন। এতে গুরুতর রোগে আক্রান্ত হওয়া, দুর্ঘটনায় মৃত্যু, স্থায়ী অক্ষমতা কিংবা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে প্রিমিয়াম মওকুফের মতো সুবিধা পাওয়া যায়। কিন্তু এখন থেকে এসব অতিরিক্ত সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত জীবন বীমা করপোরেশন (জেবিসি)।

নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, আগে থেকেই গুরুতর রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি, স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত তথ্য গোপনকারী, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তি এবং নির্ধারিত স্বাস্থ্যগত যোগ্যতা পূরণে ব্যর্থ আবেদনকারীরা আর সহজে রাইডার সুবিধা পাবেন না। শুধু তাই নয়, আবেদনপত্রে ভুল বা গোপন তথ্য দিয়ে রাইডার নিলেও পরে দাবি করার সময় তা প্রমাণিত হলে পুরো দাবি বাতিল হতে পারে।

জেবিসি গত ২৬ জুলাই এ-সংক্রান্ত ১৪ দফা নির্দেশনা জারি করেছে। দেশের সব আঞ্চলিক, করপোরেট, বিক্রয় ও শাখা অফিসকে নতুন নীতিমালা কঠোরভাবে অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে রাইডার অনুমোদনে ভিন্ন ভিন্ন চর্চা, স্বাস্থ্য-তথ্য গোপন এবং ঝুঁকি মূল্যায়নের দুর্বলতার কারণে যে জটিলতা তৈরি হচ্ছিল, নতুন নির্দেশনার মাধ্যমে সেটি দূর করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

কেন এই পরিবর্তন

বিমা খাতে সবচেয়ে বড় ভিত্তি হলো বিশ্বাস এবং সঠিক তথ্য। একজন ব্যক্তি যখন জীবনবিমা করেন, তখন তিনি নিজের স্বাস্থ্য, পেশা ও চিকিৎসার ইতিহাস সম্পর্কে যে তথ্য দেন, তার ওপর নির্ভর করেই ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়।

কিন্তু জেবিসির কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাস্তবে অনেক আবেদনকারী গুরুতর রোগে আক্রান্ত থাকার বিষয়টি গোপন করে নিজেদের সুস্থ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। কেউ কেউ হাসপাতালের চিকিৎসার ইতিহাস বা দীর্ঘমেয়াদি রোগের তথ্যও উল্লেখ করেন না। আবার কিছু শাখায় প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা ছাড়াই রাইডার অনুমোদনের অভিযোগও রয়েছে।

ফলে কয়েক বছর পর দাবি নিষ্পত্তির সময় প্রকৃত তথ্য সামনে এলে অনেক আবেদন বাতিল হয়েছে। এতে একদিকে গ্রাহক ক্ষুব্ধ হয়েছেন, অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানকে বিরোধ, অভিযোগ ও আইনি জটিলতার মুখে পড়তে হয়েছে।

এই বাস্তবতা থেকেই এবার রাইডার সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে একক নীতিমালা চালু করেছে জেবিসি।

রাইডার কী, কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ

জীবনবিমার সঙ্গে যুক্ত অতিরিক্ত সুবিধাকেই বলা হয় রাইডার। এটি আলাদা কোনো বিমা নয়; বরং মূল পলিসির সঙ্গে অতিরিক্ত প্রিমিয়াম দিয়ে যুক্ত করা একটি অতিরিক্ত সুরক্ষা।

উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক, একজন ব্যক্তি ২০ লাখ টাকার জীবনবিমা করেছেন। তিনি অতিরিক্ত প্রিমিয়াম দিয়ে যদি ১০ লাখ টাকার দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু রাইডার যুক্ত করেন, তাহলে পলিসির শর্ত অনুযায়ী দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলে তার পরিবার মোট ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত সুবিধা পেতে পারে।

একইভাবে গুরুতর রোগ বিমা, স্বাস্থ্যবিমা, স্থায়ী অক্ষমতা কিংবা প্রিমিয়াম মওকুফের মতো সুবিধাও রাইডারের মাধ্যমে যুক্ত করা যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অল্প অতিরিক্ত প্রিমিয়ামে বড় ধরনের আর্থিক সুরক্ষা পাওয়া যায় বলেই রাইডার সুবিধা অনেকের কাছে জনপ্রিয়।

কারা এই সুবিধা পাবেন

জেবিসির নতুন নীতিমালায় বলা হয়েছে, রাইডার সুবিধা শুধু সুস্থ, স্বাভাবিক ও কর্মক্ষম ব্যক্তিদের দেওয়া হবে।

আবেদনকারীর বয়স, স্বাস্থ্যগত অবস্থা, পেশাগত ঝুঁকি এবং চিকিৎসার ইতিহাস যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী লিপিড প্রোফাইল, সিরাম ক্রিয়েটিনিনসহ বিভিন্ন চিকিৎসা পরীক্ষার প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মতামত বা অতিরিক্ত ডায়াগনস্টিক পরীক্ষাও চাইতে পারবে জেবিসি।

অর্থাৎ, এখন থেকে শুধু আবেদনপত্রের ঘোষণার ওপর নির্ভর না করে স্বাস্থ্যগত তথ্য যাচাই করেই রাইডার অনুমোদন দেওয়া হবে।

কোন কোন রোগ থাকলে মিলবে না রাইডার

নতুন নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, আগে থেকেই ক্যানসার, হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনি বিকল, লিভার সিরোসিস, পক্ষাঘাতসহ বিভিন্ন গুরুতর রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের রাইডার সুবিধা দেওয়া হবে না।

এ ছাড়া এইচআইভি বা এইডসে আক্রান্ত ব্যক্তি, জন্মগত গুরুতর রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি, দীর্ঘমেয়াদি জটিল রোগে ভোগা ব্যক্তি এবং স্থায়ী বা আংশিক শারীরিক কিংবা মানসিক অক্ষমতায় আক্রান্ত ব্যক্তিরাও এই সুবিধার আওতায় থাকবেন না।

গত দুই বছরের মধ্যে গুরুতর রোগে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া বা বড় ধরনের চিকিৎসা নেওয়ার ইতিহাস থাকলেও প্রয়োজনীয় মেডিক্যাল মূল্যায়ন ছাড়া রাইডার অনুমোদন দেওয়া হবে না।

ঝুঁকিপূর্ণ পেশাজীবীদের জন্যও কড়াকড়ি

শুধু রোগ নয়, আবেদনকারীর পেশাও এখন গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। জেবিসি বলেছে, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তি, বিপজ্জনক ক্রীড়ায় অংশগ্রহণকারী বা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত ব্যক্তিদের রাইডার সুবিধা দেওয়া হবে না অথবা বিশেষ ঝুঁকি মূল্যায়নের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

এর উদ্দেশ্য হলো এমন ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা, যা থেকে ভবিষ্যতে বড় অঙ্কের দাবি আসার সম্ভাবনা বেশি।

স্বাস্থ্য-তথ্য গোপন করলে কী হবে

নতুন নির্দেশনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো তথ্য গোপনের বিষয়ে কঠোর অবস্থান। এখন থেকে আবেদনকারীকে আগের সব রোগ, চিকিৎসা, অপারেশন, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ইতিহাস এবং চিকিৎসকের পরামর্শ সঠিকভাবে জানাতে হবে।

যদি পরে প্রমাণিত হয় যে আবেদনকারী ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো তথ্য গোপন করেছেন বা ভুল তথ্য দিয়েছেন, তাহলে সংশ্লিষ্ট রাইডারের দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা হবে। প্রয়োজন হলে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।

অর্থাৎ, পলিসি নেওয়ার সময় তথ্য গোপন করে ভবিষ্যতে বড় অঙ্কের বিমার অর্থ পাওয়ার সুযোগ আর থাকবে না।

মূল পলিসি বাতিল হলে রাইডারও থাকবে না

জেবিসি আরও জানিয়েছে, রাইডার মূল জীবনবিমা পলিসির অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই কোনো কারণে মূল পলিসি ল্যাপস, সমর্পণ (সারেন্ডার) বা বাতিল হলে রাইডার সুবিধাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে।

সাধারণ গ্রাহকদের কী করা উচিত

বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন নীতিমালা দেখে ভয় পাওয়ার কারণ নেই। বরং এটি প্রকৃত গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষার একটি উদ্যোগ।

জীবনবিমা করার আগে প্রত্যেক গ্রাহকের উচিত নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সঠিক তথ্য দেওয়া, পুরোনো রোগ বা চিকিৎসার ইতিহাস গোপন না করা, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্পন্ন করা এবং পলিসির শর্ত ভালোভাবে বুঝে তবেই আবেদন করা।

কারণ, আবেদন করার সময় একটি ভুল তথ্য হয়তো তখন ধরা পড়বে না; কিন্তু দাবি করার সময় সেটিই পুরো বিমা সুবিধা হারানোর কারণ হতে পারে।

স্বচ্ছতা বাড়বে, কমবে বিরোধ

বিমা সংশ্লিষ্টদের মতে, রাইডার সুবিধা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে অস্পষ্টতা ছিল, নতুন নির্দেশনা তা অনেকটাই দূর করবে। একই সঙ্গে সব শাখায় অভিন্ন নিয়ম অনুসরণ করা হলে অনুমোদন ও দাবি নিষ্পত্তিতে স্বচ্ছতা বাড়বে, প্রতারণার সুযোগ কমবে এবং প্রকৃত গ্রাহকের স্বার্থ আরও ভালোভাবে সুরক্ষিত হবে।

তবে একই সঙ্গে তারা মনে করেন, কঠোর নীতিমালার পাশাপাশি গ্রাহকদের সচেতন করাও জরুরি। কারণ, অনেক মানুষ এখনও রাইডার কী, কী সুবিধা দেয়, কোন তথ্য না দিলে ভবিষ্যতে সমস্যা হতে পারে; এসব বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা রাখেন না।

/ইউএস/
সম্পর্কিত
উদ্ভাবনী বিমাসেবা চালুর উদ্যোগের স্বীকৃতি পেলো দুই প্রতিষ্ঠান
অর্থনীতির গতি বাড়াতে বিমা খাতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ: তথ্যমন্ত্রী
আইডিআরএ’র প্রথম নারী চেয়ারম্যান হলেন মীর নাদিয়া নিভিন
সর্বশেষ খবর
কেন বাড়িঘর ফেলে চলে যাচ্ছেন টেকনাফের মানুষ, জনপ্রতিনিধিরাও আতঙ্কে
কেন বাড়িঘর ফেলে চলে যাচ্ছেন টেকনাফের মানুষ, জনপ্রতিনিধিরাও আতঙ্কে
তিন দশক পর আবারও রোজিনা-ওমর সানী
তিন দশক পর আবারও রোজিনা-ওমর সানী
পরবর্তী ফিফা সভাপতি কানাডার এক ব্যবসায়ী?
পরবর্তী ফিফা সভাপতি কানাডার এক ব্যবসায়ী?
গ্রিসে দাবানল নেভাতে গিয়ে দুই হেলিকপ্টারের সংঘর্ষ, নিহত ২
গ্রিসে দাবানল নেভাতে গিয়ে দুই হেলিকপ্টারের সংঘর্ষ, নিহত ২
সর্বাধিক পঠিত
নিজ এলাকাতেই সংশোধন করা যাবে এনআইডি
নিজ এলাকাতেই সংশোধন করা যাবে এনআইডি
কখন বুঝবেন ‘চাকরিটা এবার ছাড়ার সময় হয়েছে’
কখন বুঝবেন ‘চাকরিটা এবার ছাড়ার সময় হয়েছে’
যে ফলের দাম আইফোনের চেয়েও বেশি
যে ফলের দাম আইফোনের চেয়েও বেশি
জুলাই কুস্তিগিরদের আগাম অভিনন্দন, মাইর একটাও মাটিতে পড়বে না: মাহফুজ আলম
জুলাই কুস্তিগিরদের আগাম অভিনন্দন, মাইর একটাও মাটিতে পড়বে না: মাহফুজ আলম
আসিয়ানে যোগ দেওয়া হচ্ছে না বাংলাদেশের, কারণ জানালেন মহাসচিব
আসিয়ানে যোগ দেওয়া হচ্ছে না বাংলাদেশের, কারণ জানালেন মহাসচিব