জাপানের ২৪ বিলিয়ন ডলারের পোশাকের বাজারে বড় হতে চায় বাংলাদেশ

গোলাম মওলা 
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪:২৯আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪:২৯

প্রচলিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারের ওপর নির্ভরতা কমাতে অপ্রচলিত বাজারে পোশাক রফতানি বাড়ানোর চেষ্টা করছে বাংলাদেশ। এরই মধ্যে এসব বাজারে রফতানিতে গতি ফিরেছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের আগস্টে অপ্রচলিত বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি হয়েছে রেকর্ড ৬৪২ দশমিক ৯৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর এসব বাজারের মধ্যে সবচেয়ে বড় গন্তব্য এখন জাপান। 

জাপানের বার্ষিক টেক্সটাইল ও পোশাক আমদানির বাজার প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলারের। অথচ এই বিশাল বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি মাত্র ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। অর্থাৎ বাজার বড় হলেও সেখানে বাংলাদেশের অংশ এখনও সীমিত। এই অংশ বাড়াতে জাপানি ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, বাজার গবেষণা, ক্রয়াদেশ সংগ্রহ এবং ব্যবসায়িক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ‘জাপান ডেস্ক’ চালু করেছে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। 

বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) ঢাকার উত্তরায় বিজিএমইএ কমপ্লেক্সে জাপান ডেস্কের উদ্বোধন করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি। অনুষ্ঠানে বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খানসহ জাপানি দূতাবাস, জেট্রো, জাপানি প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। 

অপ্রচলিত বাজারে রফতানি বাড়ছে 

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বলছে, অপ্রচলিত বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি গত দুই বছরে খুব বেশি বাড়েনি। তবে চলতি অর্থবছরের শুরুতেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। 

আগস্টে এসব বাজারে ৬৪২ দশমিক ৯৩ মিলিয়ন ডলারের পোশাক রফতানি হয়েছে, যা এক মাসে সর্বোচ্চ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অপ্রচলিত বাজারে পোশাক রফতানির মাসিক গড় ছিল ৫৭৪ দশমিক ৩৮ মিলিয়ন ডলার। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে সেই গড় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬১১ দশমিক ৬০ মিলিয়ন ডলারে। 

মোট পোশাক রফতানিতেও অপ্রচলিত বাজারের অংশ বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট তৈরি পোশাক রফতানির ১৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ এসেছিল এসব বাজার থেকে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে তা বেড়ে হয়েছে ১৬ দশমিক ৩২ শতাংশ। 

বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “অপ্রচলিত বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি সম্প্রসারণের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। এতদিন এসব বাজারে সেভাবে নজর দেওয়া হয়নি। এখন কৌশলগত গুরুত্ব দিয়ে এসব বাজারের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হবে।” 

তার মতে, অপ্রচলিত বাজার মানেই শুধু দামি পোশাকের বাজার নয়। এসব দেশেও বিভিন্ন ধরনের তৈরি পোশাকের বড় চাহিদা রয়েছে। প্রচলিত বাজারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে রফতানি বাড়াতে এসব বাজারে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল প্রয়োজন। 

জাপানেই সবচেয়ে বড় গন্তব্য

ইপিবির হিসাবে, আগস্টে অপ্রচলিত বাজারগুলোর মধ্যে জাপানেই সবচেয়ে বেশি তৈরি পোশাক রফতানি করেছে বাংলাদেশ— ১১৮ দশমিক ৬৭ মিলিয়ন ডলার। 

এর পর রয়েছে অস্ট্রেলিয়া ৭৫ দশমিক ১৪ মিলিয়ন, ভারত ৭২ দশমিক ৭৮ মিলিয়ন, তুরস্ক ৫৯ দশমিক ৫৭ মিলিয়ন এবং কোরিয়া প্রজাতন্ত্র ৪৫ দশমিক ১৫ মিলিয়ন ডলার। 

এছাড়া মেক্সিকোতে ৩২ দশমিক ৯৭ মিলিয়ন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২৮ দশমিক ৬২ মিলিয়ন, ব্রাজিলে ২৪ দশমিক ২৪ মিলিয়ন, চীনে ২০ দশমিক ৭০ মিলিয়ন এবং সৌদি আরবে ১৯ দশমিক ২৫ মিলিয়ন ডলারের পোশাক রফতানি হয়েছে। 

আগস্টে বাংলাদেশ থেকে মোট তৈরি পোশাক রফতানি হয়েছে ৩ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে অপ্রচলিত বাজারে গেছে প্রায় ৬৪৩ মিলিয়ন ডলার। 

২৪ বিলিয়ন ডলারের বাজার, বাংলাদেশের রফতানি ১.৪ বিলিয়ন

জাপানে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি দীর্ঘদিনের। তবে দেশটির বিশাল বাজারের তুলনায় বাংলাদেশের অংশ এখনো ছোট।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাপানে বাংলাদেশ থেকে ১১৩ কোটি ৪৭ লাখ ডলারের পোশাক রফতানি হয়েছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় এই রফতানি কমেছে ৪ দশমিক ২৮ শতাংশ।

তবে চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। জুলাই-আগস্টে জাপানে পোশাক রফতানি হয়েছে ২২ কোটি ৭২ লাখ ডলার। আগের বছরের একই সময়ে রফতানি হয়েছিল ২২ কোটি ৪২ লাখ ডলার। অর্থাৎ রফতানি বেড়েছে ১ দশমিক ৩৩ শতাংশ। 

বিজিএমইএর হিসাবে, জাপানের বার্ষিক টেক্সটাইল ও পোশাক আমদানির বাজার প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার। সেখানে বাংলাদেশের রফতানি প্রায় ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। ফলে জাপানের বাজারে বাংলাদেশের অংশ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন রফতানিকারকেরা। 

জাপানি ক্রেতার জন্য প্রস্তুত ১৭২ কারখানা

জাপানের বাজার ধরতে শুধু ক্রেতা খোঁজা নয়, জাপানি ব্র্যান্ডগুলোর চাহিদা অনুযায়ী কারখানাকেও প্রস্তুত করছে বিজিএমইএ। এর অংশ হিসেবে ১৭২টি কারখানাকে জাপানি ব্র্যান্ড ও ক্রেতাদের জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। 

ইউনিক্লো, মুজি, জিইউ ও শিমামুরার মতো জাপানি ব্র্যান্ডের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য তৈরি, মান নিশ্চিত করা, সময়মতো সরবরাহ এবং ব্যবসায়িক যোগাযোগ বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে। 

বিজিএমইএর জাপান ডেস্ক এ ক্ষেত্রে ওয়ান-স্টপ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে। জাপানি ক্রেতা শনাক্তকরণ, বাজার গবেষণা, ক্রয়াদেশ সংগ্রহ এবং বাংলাদেশি ও জাপানি ব্যবসায়ীদের মধ্যে যোগাযোগে সহায়তা করবে ডেস্কটি। জেট্রো, জাইকা, জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (জেবিসিসিআই)সহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও সমন্বয় করবে। 

ইপিএতে নতুন সুযোগ

জাপানের বাজারে বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি বা ইপিএকে ঘিরে। চলতি বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি টোকিওতে বাংলাদেশ ও জাপান এই চুক্তিতে সই করে। এটি বাংলাদেশের প্রথম ইপিএ। 

বিজিএমইএর মতে, ইপিএর ফলে তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন বাংলাদেশি পণ্যের জাপানের বাজারে শুল্ক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা নতুন সুবিধা পেতে পারেন। 

তবে শুধু শুল্ক সুবিধা পেলেই জাপানের বাজারে বড় হওয়া যাবে না। জাপানি ক্রেতাদের কাছে সময়মতো পণ্য সরবরাহ, মান, স্থায়িত্ব এবং নির্ভরযোগ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

লিড টাইমই বড় চ্যালেঞ্জ

বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, চীন, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার তুলনায় বাংলাদেশের ভৌগোলিক দূরত্ব বেশি। ফলে জাপানি ক্রেতাদের কাছে পণ্য পৌঁছাতে সময় বেশি লাগে। লিড টাইম বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। 

তার মতে, পরিবহন ব্যয় কমানো এবং দ্রুত পণ্য পৌঁছানোর ক্ষেত্রে জাপান সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন। পাশাপাশি কয়েকটি প্রচলিত বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে বাজার ও পণ্যের বহুমুখীকরণ জরুরি। 

জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি বলেন, বিজিএমইএতে জাপান ডেস্ক চালুর ফলে দুই দেশের ব্যবসায়িক যোগাযোগ আরও গতিশীল হবে। টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য রপ্তানি বহুমুখীকরণের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। 

সব মিলিয়ে অপ্রচলিত বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি এখন নতুন সম্ভাবনার সামনে। আগস্টের রেকর্ড রফতানি সেই সম্ভাবনার একটি ইঙ্গিত। আর জাপান হতে পারে সেই সম্প্রসারণের সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র। ২৪ বিলিয়ন ডলারের বাজারে বাংলাদেশের ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের রফতানি দেখাচ্ছে— এখনও বড় একটি অংশ দখলের সুযোগ রয়েছে। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে দ্রুত সরবরাহ, পণ্যের বৈচিত্র্য, মান এবং জাপানি ক্রেতাদের দীর্ঘমেয়াদি আস্থা অর্জনই হবে মূল পরীক্ষা। 

/এসটি/ 
সম্পর্কিত
জাপানে আছড়ে পড়লো টাইফুন দুজুয়ান, প্রাণ হারালেন ২ জন
ভারতকে বাংলাদেশ থেকে আরও পণ্য আমদানির আহ্বান গভর্নরের
আশুলিয়ার পোশাক কারখানায় বিস্ফোরণে দগ্ধ ব্যক্তির মৃত্যু
সর্বশেষ খবর
ক্রুইফ বললেন, ‘ইতিবাচক প্রশ্ন নিয়ে আসুন’
ক্রুইফ বললেন, ‘ইতিবাচক প্রশ্ন নিয়ে আসুন’
কেটের রাজকীয় সাজে ডায়ানার কানের দুল, কুইন মাদারের নেকলেস
কেটের রাজকীয় সাজে ডায়ানার কানের দুল, কুইন মাদারের নেকলেস
চার্ট আসার আগেই বাড়ানো হয়েছে বাস ভাড়া, যাত্রী-স্টাফ বাগবিতণ্ডা
চার্ট আসার আগেই বাড়ানো হয়েছে বাস ভাড়া, যাত্রী-স্টাফ বাগবিতণ্ডা
‘রসুনের নগরী’ হিসেবে পরিচিত যে শহরটি
‘রসুনের নগরী’ হিসেবে পরিচিত যে শহরটি
সর্বাধিক পঠিত
জাতিসংঘে নাম পরিবর্তনের ঘোষণা, নতুন পরিচয়ে আত্মপ্রকাশ করলো যে ক্ষুদ্র দেশ
জাতিসংঘে নাম পরিবর্তনের ঘোষণা, নতুন পরিচয়ে আত্মপ্রকাশ করলো যে ক্ষুদ্র দেশ
ফুডপান্ডার এমডিসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা
ফুডপান্ডার এমডিসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা
আজারবাইজানের সঙ্গে ভিসা অব্যাহতি চুক্তি সই
আজারবাইজানের সঙ্গে ভিসা অব্যাহতি চুক্তি সই
অনুষ্ঠানে জাতীয় সংগীতের সময় শেখ হাসিনার ছবি, চেয়ারম্যানকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি
অনুষ্ঠানে জাতীয় সংগীতের সময় শেখ হাসিনার ছবি, চেয়ারম্যানকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি
বহু নারীতে আসক্ত গোবিন্দ, সঙ্গী হিসেবে শাহরুখকে চান অভিনেতার স্ত্রী
বহু নারীতে আসক্ত গোবিন্দ, সঙ্গী হিসেবে শাহরুখকে চান অভিনেতার স্ত্রী