দুই যুগের মধ্যে বেসরকারি ঋণের সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি

Send
গোলাম মওলা
প্রকাশিত : ১৪:২০, মার্চ ১০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:৫৬, মার্চ ১১, ২০২০

ঋণএকক মাস হিসেবে গত জানুয়ারিতে বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৯ দশমিক ২০ শতাংশ। আর অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ১৮ শতাংশ। শুধু তাই নয়, গত বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরের তুলনায় জানুয়ারিতে ঋণ বিতরণ কমেছে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা। ধারণা করা হচ্ছে, গত দুই যুগের মধ্যে এটিই সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি। অবশ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ১৯৯৬ সালের পর বেসরকারি খাতে কখনই এতো কম ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়নি। এমনকি বিএনপি-জামায়াতের জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলনের সময়ও (২০১৩-১৪ সাল) বেসরকারি খাতে এতো কম ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল না। এ দুই বছরে তা ছিল যথাক্রমে ১০ দশমিক ৮০ শতাংশ এবং ১২ দশমিক ০৩ শতাংশ।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, সুদের হার বেশি হওয়ার কারণে এতদিন এমনিতেই ব্যবসায়ী উদ্যোক্তারা ঋণ নিচ্ছিলেন না। এমন অবস্থায় সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী এপ্রিল থেকে সিঙ্গেল  ডিজিট সুদে ঋণ পাওয়া যাবে। এই আশায় কেউই হয়তো ঋণ নিচ্ছেন না। ফলে ঋণের প্রবৃদ্ধি তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। ঋণের এই নিম্নগামী পরিস্থিতি আরও কিছুদিন থাকবে বলেও মনে করেন তিনি। কারণ, করোনার প্রভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যে কিছুদিন মন্দাভাব থাকবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছর ধরে অব্যাহতভাবে বেসরকারি খাতে ঋণের হার কমছে। গত ডিসেম্বরের তুলনায় জানুয়ারিতে বেসরকারি খাতে ঋণের হার কমেছে প্রায় দশমিক ৬৩ শতাংশ। গত ডিসেম্বর মাসে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ৮৩ শতাংশ। তার আগের মাস নভেম্বরে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ।  এর আগে অক্টোবরে ১০ দশমিক ৪ শতাংশ ও সেপ্টেম্বরে ১০ দশমিক ৬৬ শতাংশ। এমনকি আগস্টেও ছিল ১০ দশমিক ৬৮ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, গত জানুয়ারি মাস শেষে বেসরকারি খাতে ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৫২ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা, যা গত ডিসেম্বর শেষে ছিল ১০ লাখ ৫৩ হাজার ১৫১ কোটি টাকা। গত জুন মাস শেষে এই খাতে ঋণের স্থিতি ছিল ১০ লাখ ১০ হাজার ২৫৫ কোটি টাকা।

আগামী কয়েক মাস বেসরকারি খাতে ঋণের পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে মনে করেন গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, দেশে এখন করোনা প্রভাব চলছে। এটি যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে ঋণ নেওয়ার জন্য কেউ আগ্রহ দেখাবে না। এছাড়া ব্যাংক হয়তো এসএমই খাতের উদ্যোক্তাদের ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দেবে না। ফলে ঋণের প্রবৃদ্ধি আরও কমে আসবে।

এদিকে ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, করোনা ভাইরাসের কারণে বর্তমানে স্বাভাবিক আমদানি বন্ধ, রফতানিও অনেকটা বন্ধ রয়েছে। বাংলাদেশেও করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া গেছে। ফলে কী হবে তা কেউ বলতে পারছে না। তবে দেশের উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা যাতে ব্যাংক সেবা পেতে পারেন, সে ব্যাপারে ব্যাংকগুলোর এমডিরা যথাযথ ভূমিকা পালন করবেন বলেন জানান বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন এবিবি’র চেয়ারম্যান ও ইস্টার্ন  ব্যাংকের (ইবিএল) এমডি আলী রেজা ইফতেখার। তিনি বলেন, এখন যে সিচ্যুয়েশন চলছে, তাতে মনে হচ্ছে, করোনার কারণে ব্যবসায়ীরা হয়তো আর্থিক টানাপড়েনের মধ্যে পড়তে পারে। প্রকৃত ব্যবসায়ীদের মধ্যে যারা ক্ষতির মুখে পড়বে ব্যাংকগুলো তাদের পাশে দাঁড়াবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০০৩ সালে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ১২ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০০৪-০৫ অর্থবছরে ছিল ১৭ শতাংশ। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০০৬-০৭ অর্থবছরে ছিল ১৫ দশমিক ১২ শতাংশ। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে ছিল ২৪ দশমিক ৯ শতাংশ।

২০১০-১১ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ২৫ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০১১-১২ অর্থবছরে ছিল ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর শেষে বার্ষিক ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ২৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ। ২০১০ সালের সেপ্টেম্বর শেষে বার্ষিক ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ২৬ দশমিক ৬৫ শতাংশ। ২০১১ সালের মার্চে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ২৯ দশমিক ১৩ শতাংশে ওঠে।

প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালের শুরুতে ঋণপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণে আনতে ঋণ-আমানত অনুপাত (এডিআর) কিছুটা কমিয়ে আনে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর থেকে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমতে থাকে। কয়েক দফা এডিআর সমন্বয়ের সীমা বাড়ানো হলেও ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়ছে না। নিম্নমুখী ধারা অব্যাহত আছে।

 

/টিএন/এমএমজে/

লাইভ

টপ