প্যাকেজ নিয়ে যা বললেন অর্থনীতিবিদরা

Send
গোলাম মওলা
প্রকাশিত : ২৩:০০, এপ্রিল ০৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:৪৯, এপ্রিল ০৫, ২০২০

গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে দেশের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ক্ষতি মোকাবিলায় ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার পাঁচটি প্যাকেজে আর্থিক সহায়তা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্যাকেজগুলো মূলত ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তাদের অল্প সুদে প্রয়োজনীয় ঋণ প্রাপ্তির একটি নিশ্চয়তা। তবে প্রান্তিক মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়েও এই প্যাকেজের যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে। এই প্যাকেজকে স্বাগত জানিয়েছেন অর্থনীতির বিশ্লেষক, গবেষক ও এই খাতের সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, অনিয়ম আর দুর্নীতি রোধ করে কঠোর তদারকির মাধ্যমে এ প্যাকেজ বাস্তবায়ন করতে পারলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যে ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে, তা কিছু দিনের মধ্যেই পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।

এ প্রসঙ্গে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর মনে করেন, এই প্যাকেজ কর্মসূচির অন্যতম অংশ খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি উল্লেখ করেন—বর্তমান পরিস্থিতিতে দেড় কোটি মানুষ কর্মচ্যুত হতে যাচ্ছে। এসব মানুষ ও তাদের পরিবারকে খাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। অর্থাৎ প্রতি পরিবারে ৪ জন করে হিসাব করা হলেও প্রায় ৫ কোটি মানুষকে খাবার সরবরাহ করতে হবে। তিনি বলেন, ‘খাদ্য বাংলাদেশে আছে, এটা নিয়ে কোনও চিন্তার কারণ নেই। তবে খাবারটা প্লেট পর্যন্ত যেতে হবে। এজন্য বিপণন কার্যক্রম বা সাপ্লাই চেইন ঠিক রাখতে হবে।’ আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘এখনই সরকারের ব্যাপকভাবে কৃষকের কাছ থেকে চাল বা ধান বা পণ্য কিনতে হবে। এখানে কোনও দুর্নীতির সুযোগ দেওয়া ঠিক হবে না। আগে যেটা হতো কৃষক দাম পেতো না। কিন্তু সরকার ঠিকই উচ্চমূল্যে খাদ্য কিনতো।’ দুর্নীতি চেক দেওয়া সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘খাদ্য নিরাপত্তার জন্য যে ব্যাপক উদ্যোগ নেওয়া হবে, তাতে হয় সরকারের মুখ উজ্জ্ব করবে, না হয় সরকারকে ডোবাবে। কাজেই খাদ্য নিরাপত্তার ব্যাপারে অনিয়ম রোধে আগে থেকেই সতর্ক থাকতে হবে। এছাড়া, এসএমই খাতকে পুনর্বাসন করার ক্ষেত্রে কোনও অনিয়ম হতে দেওয়া উচিত না। কারণ, ইতোমধ্যে প্রায় ৮০ থেকে ৯০ লাখ মানুষ বেকার হয়ে গেছে। সরকারের সাপোর্ট যদি ঠিকমতো না পৌঁছায়, সেক্ষেত্রে এসএমই খাত ধ্বংস হয়ে যাবে।’

আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে এ ধরনের প্যাকেজ ঘোষণা খুব দরকার ছিল। প্রায় ৭৩ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ এটা। এটাকে সম্মানজনক প্যাকেজ বলতে হবে। খাতগুলো যেভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে, এটাও মোটামুটি ঠিক আছে। সামাজিক সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে, খাদ্য নিরাপত্তার কথা বলা হয়েছে, দুটোই জরুরি ছিল।’

তিনি বলেন, ‘তবে বড় বড় প্রতিষ্ঠানের জন্য যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, সেখানে একটু নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। যারা স্বভাবগত খেলাপি বা ইচ্ছেকৃত খেলাপি, তাদের যেন কোনোভাবে ঋণ না দেওয়া হয়। এসএমই খাতের জন্য যে ঘোষণা এসেছে, সেটাও ভালো। তবে কার্যকর করতে পারাটাই আসল।’

প্রসঙ্গত, পাঁচটি প্যাকেজের আওতায় মোট ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা দেওয়া হয়েছে—যা জিডিপির ২.৫২ শতাংশ। রবিবার (৫ এপ্রিল) গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এই আর্থিক সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী।

বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া সংকট উত্তরণে সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের আওতা বাড়ানোসহ চারটি কার্যক্রম নিয়ে কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রণোদনা প্যাকেজের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল হিসেবে ৯ শতাংশ সুদে ৩০ হাজার কোটি টাকার ঋণ সুবিধা দেওয়ার কথা বলা আছে। এরমধ্যে শিল্পপ্রতিষ্ঠান মালিক ৪.৫ শতাংশ ভর্তুকি এবং সরকার ৪.৫ শতাংশ ভতুর্কি দেবে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের নিজস্ব তহবিল থেকে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল বাবদ ঋণ দেবে। এই ঋণ সুবিধার অর্ধেক অর্থাৎ ৪.৫ শতাংশ ভর্তুকি হিসাবে সরকার ব্যাংককে প্রদান করবে। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পসহ মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানে ২০ হাজার কোটি টাকার ঋণ সুবিধা প্রণয়ন করা হবে। এখানেও ঋণের হার ৯ শতাংশ। প্রদত্ত ঋণের ৫ শতাংশ সুদ সরকার ব্যাংককে দেবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ডের (ইডিএফ) বর্তমান আকার ৩.৫ বিলিয়ন ডলার থেকে ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা হবে। ফলে ১.৫ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ অতিরিক্ত ১২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা ইডিএফ তহবিলে যুক্ত হবে। এর সুদের হার কমিয়ে ২ শতাংশে নির্ধারণ করা হবে। প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট রিফাইন্যান্স স্কিম নামে বাংলাদেশ ব্যাংক পাঁচ হাজার কোটি টাকার একটি নতুন ঋণ সুবিধা চালু করবে। এই ঋণের সুদের হার হবে ৭ শতাংশ।’

এ প্রসঙ্গে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে এমন পূর্ণাঙ্গ প্যাকেজের দরকার ছিল। চারটি খাতের উদ্যোক্তারা সুবিধা পাবেন।’ তিনি উল্লেখ করেন—প্যাকেজ যেহেতু ঘোষণা হয়েছে, সেহেতু দ্রুত সময়ের মধ্যে যেটা বেশি দরকার হবে, সেটা হলো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কাজগুলো শেষ করা। এক্ষেত্রে যে তালিকা আছে, সেই তালিকায় নতুন করে অনেক মানুষকে যুক্ত করতে হবে। তিনি এই তালিকায় একটি উপখাত তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘শুধু নিম্ন আয়ের মানুষরা বিপদে আছেন এমন নয়, সীমিত আয়ের মানুষদের আয়ও বন্ধ হয়ে গেছে, যেমন—ট্রাক ড্রাইভার, হোটেলের বেয়ারা, উবারচালক, সিএনজিচালক। এরা বিপদে থাকলেও হাত পাততে পারে না। ওএমএসের লাইনে দাঁড়াতে পারে না। যাদের জমি কৃষি আবাদ নেই, আবার ২০ টাকার কম আয় করেন, তাদের জন্য কিছু একটা করা দরকার।’ গোলাম মোয়াজ্জেম জানান, সুবিধাভোগীদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা করে তারপর সুবিধা দেওয়া দরকার। তা না হলে হয়তো একজন একাধিকবার নেবেন, আবার অনেকে হয়তো পাবেনই না। বড় দেশীয় শিল্প উদ্যোগের ব্যাপারে বলা হয়েছে, দেশীয় বাজারে যাদের উৎপাদন এবং ৮০ শতাংশের নিচে যারা রফতানি করে, তাদের জন্য কিছু একটা করতে হবে। কারণ, এর আগে ৮০ শতাংশের ওপরে যারা রফতানি করে, তাদের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ দেওয়া আছে।

তিনি বলেন, ‘ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের উদ্যোক্তারা শ্রমিকদের মজুরির জন্য ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল নিতে পারবেন। তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— রফতানি খাতের উদ্যোক্তারা ২ শতাংশ সুদে বা ২ শতাংশ সার্ভিস চার্জের বিনিময়ে ঋণ পাচ্ছেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের উদ্যোক্তারাও যেন একইভাবে ২ শতাংশ সুদে ঋণ পায়, সেই ব্যবস্থা করতে হবে।’

মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘ব্যাংকের কাছে পর্যাপ্ত টাকা না থাকলে পুরো প্রক্রিয়া ভেস্তে যেতে পারে। এ কারণে সরকারকে ও বাংলাদেশ ব্যাংককে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।’ তবে টাকা না ছাপিয়ে সম্ভব হলে বাড়তি অর্থ সরবরাহ না করেই ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব রাখেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী যেসব প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন এটি বাস্তবসম্মত হয়েছে। তবে আশঙ্কা রয়েছে এটির বাস্তবায়ন নিয়ে। কারণ, এসব তহবিলের অর্থ কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে ঋণ হিসাবে দেবে বিতরণ করার জন্য। বলা হয়েছে, ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতেই ঋণ বিতরণ করবে ব্যাংকগুলো। এখন ব্যাংক কাদেরকে ঋণ দেবে, এটা দেখার বিষয়। তিনি উল্লেখ করেন, করোনা পরিস্থিতিতে ব্যাংকের আমানত কমে যাবে। ফলে ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে যাবে। এ অবস্থায় ঋণ বিতরণ কীভাবে করবে, প্রশ্ন রাখেন তিনি।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘প্যাকেজে বড় শিল্পের জন্য বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে এসএমই’র (ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প) জন্য যে ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল রয়েছে, এটাও ভালো।’ কিন্তু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অংশের টাকা যাতে বড় উদ্যোক্তাদের না দেওয়া হয়, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকার জন্য ব্যাংকগুলোকে পরামর্শ দেন তিনি।

তবে সবচেয়ে বেশি অসুবিধায় থাকা ছিন্নমূল অপ্রাতিষ্ঠানিক মানুষের জন্য আর্থিক সহায়তা বাড়ানো দরকার বলে মনে করেন তিনি।
এদিকে গত ২৫ মার্চ জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে রফতানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী। শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দেওয়ার জন্য এ তহবিল থেকে রফতানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলো বিনা সুদে সর্বোচ্চ ২ শতাংশ সার্ভিস চার্জে ঋণ নিতে পারবে।

/এপিএইচ/এমওএফ/

লাইভ

টপ