ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল: চলছে কমিটি গঠন আর প্রতিবেদনের খেলা

Send
সঞ্চিতা সীতু
প্রকাশিত : ১৮:৩০, আগস্ট ১২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:৩২, আগস্ট ১৩, ২০২০

ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিলভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিলের জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করতে কমিটির পর কমিটি হচ্ছে, প্রতিবেদনের পর প্রতিবেদনও দেওয়া হচ্ছে । কিন্তু কয়েকজনকে সাময়িক বরখাস্ত আর নিচের দিকের কয়েকজন মিটার রিডারের চুক্তি বাতিল ছাড়া এখনও বড় কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব ধামাচাপা দেওয়ার প্রক্রিয়া ছাড়া আর কিছু নয়।

সংশ্লিষ্টরা বলেন, আধুনিক কোম্পানি ব্যবস্থাপনায় ‘কমিটি’ গঠনকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই কমিটি গঠনের যেমন কিছু ভালো দিক আছে, আবার কিছু মন্দ দিকও রয়েছে। বলা হয়, যখন কোনও ইস্যুকে ধামাচাপা বা স্তিমিত করে দেওয়ার প্রয়োজন দেখা দেয় তখনও কমিটি গঠন করা হয়। ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল নিয়েও তা-ই হচ্ছে। যদিও বিদ্যুৎ বিভাগ দাবি করছে, তারা এখনও বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে। তারা কাউকে ছাড় দেবে না।

গত এপ্রিল থেকেই ভুতুড়ে বিলের অভিযোগ আসে। এপ্রিলে এ নিয়ে সারা দেশে তীব্র সমালোচনা শুরু হলে টনক নড়ে বিদ্যুৎ বিভাগের। কোম্পানিগুলোকে পৃথকভাবে তদন্তর জন্য কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়ে আবার বিদ্যুৎ বিভাগ টাস্কফোর্স গঠন করে। কোম্পানি এবং বিদ্যুৎ বিভাগের তরফ থেকে বলা হয়, তারা দায়ীদের চিহ্নিত করছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। কিন্তু এরপর আবার বিদ্যুৎ বিভাগ যেমন কমিটি গঠন করেছে, তেমনি বিভিন্ন সংশ্লিষ্ট কোম্পানিও কমিটি গঠন করছে। এসব কমিটি আবার কাজও করছে। আর প্রতিবেদনের পর প্রতিবেদন দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কোম্পানির কিছু নিচের কর্মকর্তা ছাড়া কারও শাস্তি হয়নি এখন পর্যন্ত।

এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমরা প্রথম থেকেই বলছিলাম, নিচের কর্মকর্তাদের দায়ী করা হলেও ওপরের যারা নির্দেশ দিয়েছে তাদের অভিযুক্ত করা হয়নি। ডিপিডিসি শুরু থেকেই বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। এখনও ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে। সাধারণ মানুষের ভোগান্তির এই বিচার হওয়া উচিত। নইলে এই খাতের দুর্নীতি আরও বাড়বে।

ডিপিডিসির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অতিরিক্ত বিলের অভিযোগ আসে। সে সময় ডিপিডিসি তাদের পরিচালক আইসিটিকে প্রধান করে একটি কমিটি করে। সেই কমিটির সুপারিশে একজন নির্বাহী প্রকৌশলীসহ চার জনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। ৩৬টি এনওসির নির্বাহী প্রকৌশলীদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। যেসব প্রকৌশলীকে শোকজ করা হয়েছিল তারা জবাবে জানান, প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক আইসিটি নিজেই অতিরিক্ত বিল করার নির্দেশনা পাঠিয়েছেন। তারা জানান, নির্দেশনায় বলা ছিল কোন কোন এলাকায় কতভাগ বেশি বিল করতে হবে। এ নিয়ে গত ২৬ জুলাই ‘ভুতুড়ে বিল নিয়ে পাল্টা কাঠগড়ায় ডিপিডিসি!’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে বাংলা ট্রিবিউন। প্রতিবেদনটিতে ডিপিডিসির পরিচালকদের নির্দেশে বেশি বিল করা হয়েছে বলে উল্লেখ ছিল। এরপরই আবার নড়েচড়ে বসে মন্ত্রণালয়। এরপর ডিপিডিসি আবার পরিচালক (অর্থ) গোলাম মোস্তফাকে প্রধান করে কমিটি গঠন করে।

জানতে চাইলে ডিপিডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিকাশ দেওয়ান বলেন, সর্বশেষ গঠিত তদন্ত কমিটি কাজ করছে। তারা অভিযোগের ভিত্তিতে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। কবে নাগাদ তদন্ত প্রতিবেদন দেবে সে বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এইটা ঠিক নেই। দেবে সময় হলেই। এটা আসলে বিচারিক বিষয়, অফিসিয়াল বিষয়। তারা কাজ করছে।’

এরমধ্যে আবার বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব রহমত উল্লাহ মো. দস্তগীর এনডিসিকে প্রধান করে তিন সদস্যের আরও একটি কমিটি করা হয়।

কমিটির সদস্য পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসেইন বলেন, ‘আমরা ছয়টি বিতরণ কোম্পানির সঙ্গেই কথা বলছি। যেহেতু ডিপিডিসির বিরুদ্ধে অভিযোগ বেশি এসেছে তাই তাদের বিষয়টি বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি আমরা। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে তদন্তের জন্য তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করছি। আগামী ১৭ আগস্ট পর্যন্ত এই জিজ্ঞাসাবাদ চলবে। এরপর সব বিষয় খতিয়ে দেখে, আগের কমিটিগুলোর প্রতিবেদন দেখে, সব যাচাই বাছাই করে আমরা প্রতিবেদন দেবো।’

তবে একের পর এক কমিটি হলেও আদৌ কিছু হবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, মন্ত্রণালয়ের আগের টাস্কফোর্স তাহলে কী তদন্ত করেছিল। তারা কেন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে অতিরিক্ত বিল করা হয়েছে তা খতিয়ে দেখলো না—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অন্যদিকে এসব বিষয়ে সরব হয়েছে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। এজন্য ডিপিডিসিতে তারা একটি প্রতিনিধি দলও পাঠিয়েছিল। কিন্তু সেই প্রতিনিধি দল কী করলো সে বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটি কোনও কিছুই জানায়নি। বিইআরসির সদস্য (বিদ্যুৎ) মোহাম্মদ বজলুর রহমান বলেন, ‘আমাদের একটি টিম ঈদের আগে ডিপিডিসি কার্যালয়ে গিয়েছিল। তারা ডিপিডিসি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছে। এখন তারা প্রতিবেদন তৈরির কাজ করছে। আমরাও মনিটরিং করছি। তবে এখন নতুন ইস্যু চলে আসায় আমরা সেই ইস্যু নিয়ে কিছুটা ব্যস্ত আছি।’

/এমআর/এমওএফ/

লাইভ

টপ