অর্থনীতি সচল হলেও বাড়ছে না সরকারের আয়

Send
গোলাম মওলা
প্রকাশিত : ১২:০০, সেপ্টেম্বর ১২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:৪১, সেপ্টেম্বর ১২, ২০২০

এনবিআরদেশের অর্থনীতিকে সচল করতে সরকার নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে। অফিস-আদালত, ব্যবসাকেন্দ্রসহ সবকিছু খুলে দেওয়া হয়েছে। করোনার প্রভাবে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ক্ষতি মোকাবিলায় বিভিন্ন খাতে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে সরকার। এরই মধ্যে উদ্যোক্তারা এই প্যাকেজের টাকা নেওয়া শুরু করেছেন। ইতোমধ্যে  ঘুরে দাঁড়িয়েছে তৈরি পোশাক খাত। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সও আসছে বানের পানির মতো। গলির দোকান থেকে শুরু করে বড় শিল্পকারখানা সবই চলছে স্বাভাবিক সময়ের মতো। আমদানি-রফতানি, উৎপাদন, সরবরাহ, বিপণন, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও পরিবহন চলাচল অনেকটাই স্বাভাবিক হচ্ছে। ফলে স্থবির হয়ে পড়া অর্থনীতির চাকা ঘুরতে শুরু করেছে। তবে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর সেই প্রভাব দেখা যাচ্ছে না রাজস্ব খাতে। শুধু তাই নয়, গত জুন মাসের চেয়েও জুলাই মাসে রাজস্ব আহরণে প্রবৃদ্ধির অবনতি হয়েছে।

এনবিআরের তথ্য বলছে, গত জুন মাসে আগের বছরের জুনের তুলনায় রাজস্ব আহরণের প্রবৃদ্ধি কমেছিল এক  দশমিক ২৮ শতাংশ। আর জুলাই মাসে আগের বছরের জুলাই মাসের তুলনায় সরকারের আয় কমেছে ৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ।

অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, করোনার মাঝেও সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) গতি পেয়েছে। আইএমইডির তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসে এডিপি কার্যক্রমে তিন হাজার ২৫০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো। করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে প্রায় তিন মাস সাধারণ ছুটি থাকায় অফিস-আদালত, বিপণি বিতান, হোটেল-রেস্তোরাঁ, পর্যটন ও পরিবহন বন্ধ ছিল।  সাধারণ ছুটি তুলে নেওয়ার পর পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। শিল্প কল-কারখানা খুলেছে। বাজারে মাস্ক, পিপিই, হ্যান্ডগ্লাভসের মতো স্বাস্থ্য সুরক্ষার সরঞ্জাম, ওষুধ, অক্সিজেন, অক্সিজেন মাপার যন্ত্র, মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, বাইসাইকেল, মোটরসাইকেলের বেচাকেনা বেড়েছে। মানুষ এখন স্বাভাবিক সময়ের মতো ঘর থেকে বের হচ্ছেন। অফিস করছেন। রাজধানী ঢাকাসহ অন্য শহরগুলো আগের চেহারায় ফিরেছে। সড়কে রীতিমতো যানজট দেখা যাচ্ছে। আগের মতো দোকান বসছে ফুটপাতেও। চায়ের স্টল, কফি শপ, হোটেল-রেস্তোরাঁ চালু হয়েছে। ভিড় বাড়ছে পর্যটন কেন্দ্রগুলোতেও। আমদানি করা নতুন পণ্য নিয়ে জাহাজ ভিড়ছে বন্দরে। আবার অনেক জাহাজ রফতানি পণ্য নিয়ে বন্দর ছেড়েও যাচ্ছে বিদেশে।  এছাড়া কৃষি খাতে করোনার কোনও প্রভাব পড়েনি। করোনাকালেও স্বাভাবিকভাবে চলেছে কৃষি খাতের কর্মকাণ্ড। প্রধান প্রধান ফসল, গবাদি পশু, মাছের উৎপাদন ও বিপণনে সমস্যা হয়নি। ফলে অর্থনীতি জেগে উঠছে। অর্থনীতি যে সচল হয়েছে, তার উদাহরণ গত জুলাই মাসে বেসরকারি খাতের ঋণে আগের বছরের জুলাইয়ের তুলনায় ৯ দশমিক ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। অর্থনীতি সচল হওয়ার আরেকটি সূচক রফতানিতে জুলাই মাসে আগের বছরের জুলাইয়ের তুলনায় প্রায় এক  শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। আর আগস্ট মাসে আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ২ দশমিক ১৭ শতাংশ বেশি রফতানি আয় এসেছে।

অর্থনীতি তথা গ্রামীণ অর্থনীতি সচল হওয়ার আরেকটি উদাহরণ হলো রেমিট্যান্স প্রবাহ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত আগস্ট মাসে আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ ৩৬ শতাংশ বেড়েছে। করোনা মহামারির মাঝেই গত মাসে ১৯৬ কোটি ৩৯ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। আগের বছরের আগস্টে যা ছিল ১৪৪ কোটি ৪৭ লাখ ডলার। আর অতীতের সব রেকর্ড ছাপিয়ে জুলাইয়ে ২৬০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠান প্রবাসীরা, যা আগের বছরের জুলাইয়ের তুলনায় ৬৩ শতাংশ বেশি। শুধু তাই নয়, করোনা মহামারির মধ্যেও ব্যালেন্স অব পেমেন্টে বড় উদ্বৃত্ত নিয়ে অর্থবছর শুরু হয়েছে। এছাড়া বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৯ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। অর্থনীতি শক্তিশালী হওয়ার আরেকটি উপদান হলো জিডিপি প্রবৃদ্ধি।  বিসিএসের হিসাবে করোনাভাইরাসের মধ্যেও গেলো ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের  (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ২৪ শতাংশ অর্জন হয়েছে। সেই সঙ্গে দেশের মাথাপিছু আয়ও দুই হাজার ডলার ছাড়িয়ে ২০৬৪ ডলারে উঠেছে। এই সূচকগুলো মূলত অর্থনীতি সচল হওয়ার নির্দেশক।

তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সব কিছু খুলে দেওয়া হলেও এখনও ব্যবসা-বাণিজ্যের মন্দাভাব চলছে। যে কারণে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আহরণ করতে পারছে না জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআর।

এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘মানুষ জীবিকার প্রয়োজনে ঝুঁকি নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসছে।  ধীরে ধীরে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। কিন্তু সেটা এমন নয় যে, সবকিছু আগের মতো হয়ে গেছে। আগের মতো হতে আরও একবছর সময় লেগে যাবে।’ তিনি উল্লেখ করেন, সবকিছু যে ঠিক হয়নি তার প্রমাণ রাজস্ব আয়ের নিম্নমুখী চিত্র।

এনবিআরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাইয়ে আমদানি-রফতানি পর্যায়ে ও স্থানীয় পর্যায়ে ভ্যাট এবং আয়কর ও ভ্রমণ কর থেকে রাজস্ব আহরণ হয়েছে ১৪ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকা। ৪ হাজার ৬২২ কোটি টাকা ঘাটতি হয়েছে। যদিও জুলাই মাসে লক্ষ্য ছিল ১৯ হাজার ৩৭৮ কোটি টাকা। ফলে জুলাই মাসে ঘাটতি হয়েছে ৪ হাজার ৬২২ কোটি টাকা।

এনবিআরের হিসাবে ২০১৯ সালে জুলাই মাসে যত টাকা  আদায় করেছিল, তাও এবার আদায় করা সম্ভব হয়নি। গতবারের জুলাই মাসের চেয়ে ১ হাজার ৭২ কোটি টাকা কম আদায় হয়েছে। ২০১৯ সালে জুলাই মাসে রাজস্ব আহরণ হয়েছিল ১৫ হাজার ৮২৭ কোটি টাকা।

চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে এনবিআরকে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য দিয়েছে সরকার। এর মধ্যে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় সবচেয়ে কম আদায় হয়েছে ভ্যাট। জুলাই মাসে ভ্যাট থেকে আদায় কমেছে ৯ শতাংশ। এই মাসে ভ্যাট থেকে আদায় হয়েছে ৫ হাজার ৬২০ কোটি টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবছরের জুলাই মাসে ভ্যাট আদায় হয়েছিল ৬ হাজার ১৮১ কোটি টাকা।

এনবিআরের হিসাবে গত জুলাই মাসে আমদানি-রফতানি থেকে রাজস্ব আহরণ কমেছে ৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ। জুলাই মাসে আমদানি-রফতানি পর্যায়ে রাজস্ব আহরণ হয়েছে  ৫ হাজার ১৫ কোটি টাকা। গতবার একই সময়ে এই খাতে আদায় ছিল ৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।

সবচেয়ে কম আদায় হয়েছে আয়কর ও ভ্রমণ থেকে। জুলাই মাসে এই খাত থেকে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৪ হাজার ১২০ কোটি টাকা।  গতবার একই সময়ে আদায় হয়েছিল ৪ হাজার ৩৪৫ হাজার কোটি টাকা।

নাম প্রকাশ না করে এনবিআরের এক কর্মকর্তা বলেন, এখনও ব্যবসা-বাণিজ্যে শ্লথ গতি কাটেনি। ফলে কাঙ্ক্ষিত হারে রাজস্ব আদায়ও হচ্ছে না।

মূলত, করোনার কারণে গত এপ্রিল মাস থেকেই রাজস্ব আদায়ে ধস নেমেছে। এপ্রিল ও মে মাসে রাজস্ব আদায় তলানিতে নামে। জুন মাসে রাজস্ব আদায় বাড়তে থাকে। জুলাই মাসেও পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হলেও আগের মতো রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হচ্ছে না।

/এপিএইচ/এমএমজে/

লাইভ

টপ