বিদ্যুৎ গ্রিডে কেন আগুন?

Send
সঞ্চিতা সীতু
প্রকাশিত : ১৫:০০, অক্টোবর ০৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৫৫, অক্টোবর ০৬, ২০২০

ঢাকার উলন গ্রিডে আগুন

যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে একের পর এক বিদ্যুৎ গ্রিডে অগ্নিকাণ্ড ঘটছে। শুধু সঞ্চালনের দায়িত্বে থাকা পাওয়ার গ্রিড কোম্পানিতেই (পিজিসিবি) নয়, বিতরণ কোম্পানির আঞ্চলিক গ্রিডেও অগ্নিকাণ্ড ঘটছে প্রায়ই। উন্নত দেশে এ ধরনের অগ্নিকাণ্ড বিরল হলেও বাংলাদেশে অহরহ এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে।

গত তিন বছরের পরিসংখ্যান বলছে, স্বাভাবিক সময়ে অন্তত চারটি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। এর বাইরে ঝড় ঝঞ্ঝায় অনেক সময় আগুন লেগে গ্রিড বিকল হয়েছে। টাওয়ার পড়ে যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে।

সম্প্রতি গ্রিড বিপর্যয়ের কারণে ময়মনসিংহ টানা কয়েক দিন বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন ছিল। পরপর দুটি অগ্নিকাণ্ড জনমনে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তবে সঠিক কারণ অনুসন্ধান এবং দায়ীদের শাস্তির কোনও নজির না থাকায় এসব থামছে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুৎ বিভাগের আওতাধীন সব কোম্পানিই দুর্ঘটনা এবং অনিয়মের ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে থাকে। সঙ্গত কারণে গ্রিডে এভাবে অগ্নিকাণ্ডের প্রসঙ্গ আলোচনার টেবিলেই ওঠে না কখনও।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্রিড সাবস্টেশন নির্মাণের পর সেগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বরাদ্দ থাকে। কিন্তু এই বরাদ্দ সঠিকভাবে ব্যয় করা হলে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার কথা না। পৃথিবীর কোথাও বিশেষ পরিস্থিতি ছাড়াই এভাবে আপনা থেকেই ট্রান্সফরমারে আগুন ধরে যাওয়ার ঘটনা বিরল।

চলতি বছর পিজিসিবিতে তিন অগ্নিকাণ্ড

গত ৮ সেপ্টেম্বর দুপুর ১টার দিকে ময়মনসিংহ মহানগরীর কেওয়াটখালীতে আগুনে পাওয়ার গ্রিডের ট্রান্সফরমার পুড়ে যায়। এতে ময়মনসিংহ বিভাগের চার জেলা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার আগেই আবার ১০ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টার দিকে আরেক দফা আগুন লেগে যায়। এতে প্রায় তিন দিন ময়মনসিংহবাসী চরম ভোগান্তিতে পড়েন।

এর আগে গত ২০ মে ভেড়ামারা পিজিসিবির সাবস্টেশনে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। যদিও ঘূর্ণিঝড় ‘আম্পানের’ আঘাতে বিপর্যয় ঘটে বলে জানায় পিজিসিবি। সে সময় প্রায় দুই থেকে তিনদিন বহু এলাকায় বিদ্যুৎ ছিল না।

গত ১১ এপ্রিল বিকালে হঠাৎ করেই রাজধানীর রামপুরার উলন গ্রিডে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এতে রাজধানীর একাংশ কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ছিল। এই সাবস্টেশনটি পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির (পিজিসিবি) হলেও এটি ডিপিডিসির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে সাবস্টেশনটি এখনও পরিচালনা করে পিজিসিবি। ডিপিডিসির কর্মকর্তাদের এখন প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

২০১৯-এ একটি অগ্নিকাণ্ড

গত বছর ২৮ ফেব্রুয়ারি কেরানীগঞ্জে বিদ্যুতের নির্মাণাধীন গ্রিড সাবস্টেশনে আগুন লাগে। রাজধানীর কাছেই কেরানীগঞ্জ এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য এই গ্রিড সাবস্টেশনটি নির্মাণ করা হচ্ছে।

২০১৮ সালও ছিল না অগ্নিকাণ্ডের বাইরে

২০১৮-এর ৩০ মে রাজধানীর পরিবাগে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির লোকাল গ্রিড সাবস্টেশনে আগুন লেগে যায়। ঘণ্টাখানেকের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও একটি ট্রান্সফরমার পুড়ে যায়।

কেন এই অগ্নিকাণ্ড

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নিয়মিত যে সংস্কার প্রয়োজন সেগুলো কিছুই করে না সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো। সংস্কারের জন্য যে বরাদ্দ থাকে তা কোথায় যায় এমন প্রশ্নও করেছেন কেউ কেউ।

জানতে চাইলে বুয়েটের অধ্যাপক ইজাজ হোসেন বলেন, ‘বিদ্যুৎ বিতরণ ও সঞ্চালনের সব কিছুতেই নিয়মিত মেইনটেন্যান্স জরুরি। সঞ্চালন লাইনের ক্ষেত্রে এই যে প্রায়ই দুর্ঘটনার কথা শোনা যাচ্ছে সেটি দুর্ভাগ্যজনক। সামনে আমাদের উৎপাদনক্ষমতা আরও বাড়বে। সারাদেশেই বিদ্যুতায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে সঞ্চালন লাইনের ওপর চাপ বাড়বে। এ কারণে নতুন লাইন বাড়ানোর পাশাপাশি পুরনো লাইনগুলো নিয়মিত বিরতিতে মেইনটেন্যান্স করতেও হবে। সেটি নিয়মিত হচ্ছে কিনা তাও মনিটরিং করতে হবে।’

ফেঞ্চুগঞ্জে বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে আগুন

তিনি জানান, মেইনটেন্যান্সের জন্য আলাদা বাজেট থাকে। সেই টাকা কোথায় কখন খরচ হচ্ছে তার স্বচ্ছতা থাকলেই কাজ অনেক গতিশীল হবে। বছর বছর এ ধরনের দুর্ঘটনা কেন ঘটে জানতে চাইলে পিজিসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘ময়মনসিংহের ঘটনায় ৩৩/১৩২ কেভি লাইনে কারেন্ট ট্রান্সফরমার (সিটি) থাকে। সেখানে আগুন লেগে এই ঘটনা আমরা শুধু ময়মনসিংহ নয়, সারাদেশের সিটিগুলো নিয়মিত পরীক্ষা করা, সেই পরীক্ষা ঠিকমতো হচ্ছে কিনা তা মনিটরিং করা এবং পুরনো সিটি চেঞ্জ করার উদ্যোগ নিয়েছি।’

নিয়মিত মেইনটেন্যান্স করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সাধারণত প্রতি বছর শীতকালে আমরা লাইনগুলো মেইনটেন্যান্স করি। নিয়ম হচ্ছে বছরে একবার অন্তত টেস্ট করা। কিন্তু এখন আমরা একাধিকবার টেস্ট করার উদ্যোগ নিচ্ছি যাতে এই ধরনের দুর্ঘটনা আর না ঘটতে পারে।’

/এফএস/আপ-এনএস/এমএমজে/

লাইভ

টপ