সংকটে দোকান মালিক সমিতি

Send
গোলাম মওলা
প্রকাশিত : ০১:৩৩, অক্টোবর ১৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০২:৪৩, অক্টোবর ১৫, ২০২০

দোকান মালিক সমিতিসভাপতি পদ ও নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে সংকটে পড়েছে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি। এরই মধ্যে সংগঠনটির সভাপতি হেলাল উদ্দিনকে তার পদ থেকে সরে যেতে বলছেন ব্যবসায়ী নেতাদের একাংশ। হেলাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতা ও ক্ষমতা কুক্ষিগত করার অভিযোগে সংগঠনের নেতাকর্মীরা ভেতরে ভেতরে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছেন। তার বিরুদ্ধে আন্দোলনও হচ্ছে। এরই মধ্যে হেলাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে ছয়টি জোনাল জোটের সমাবেশ হয়েছে, যেটাকে সংগঠনের নেতাকর্মীরা বলছেন বিক্ষোভ সমাবেশ। এই বিক্ষোভ সমাবেশে একটিই স্লোগান ছিল—‘নিরপেক্ষ নির্বাচন চাই। হেলাল উদ্দিনের অধীনে কোনও নির্বাচন হবে না’। সেই আন্দোলন এবার প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে হেলাল উদ্দিনের বহিষ্কার দাবি করা হয়েছে। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সিনিয়র সহ-সভাপতি ও ঢাকা মহানগর দোকান মালিক সমিতির সভাপতি তৌফিক এহেসান এই দাবি করেন। বুধবার (১৪ অক্টোবর) তৌফিক এহেসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হেলাল উদ্দিনের স্বেচ্ছাচারিতা ও ক্ষমতা কুক্ষিগত করার কারণে দোকান মালিক সমিতিতে দীর্ঘদিন ধরে নতুন নেতৃত্ব আসতে পারছে না।’ এ কারণে সংগঠনের ভেতরে আন্দোলন চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘হেলাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে ছয়টি জোনাল জোটের সমাবেশ বা বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছে। আগামী কিছুদিনের মধ্যে আমরা দিনব্যাপী মহাসমাবেশের আয়োজন করবো। সেই মহাসমাবেশ থেকে নিরপেক্ষ নির্বাচনের রূপরেখা ঘোষণা করা হবে।’ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘নতুন নেতৃত্বের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন একমাত্র হেলাল উদ্দিন।’

তিনি বলেন, ‘উনি (হেলাল উদ্দিন) যদি নিজ থেকে সরে যেতে চান, তাহলে আমরা তাকে সহায়তা করবো। আর যদি ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখতে চান, তাহলে গণআন্দোলনের মাধ্যমে তাকে সংগঠন থেকে বিতাড়িত করবো।’

তৌফিক এহেসানের দাবি, সংগঠনটির অধিকাংশ নেতাকর্মী নতুন নেতৃত্ব আশা করছেন। ছোট ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের এই সংগঠনটিতে নতুন প্রজন্মের কেউ যাতে হাল ধরতে পারেন, সে জন্য নির্বাচন পদ্ধতি ঢেলে সাজানো জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘উনি (হেলাল উদ্দিন) নির্বাচনবিহীন আগের ২২ বছর, এখন ৪ বছর, এভাবে মোট ২৫/২৬ বছর ধরে নির্বাচন ছাড়াই ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখেছেন। কোনও লিডারশিপ তৈরি হচ্ছে না। নতুন ধরনের কোনও সেবাও পাচ্ছেন না সংগঠনের সদস্যরা। উনার কারণে সংগঠন চালানোর জন্য কোনও নেতা তৈরি হচ্ছে না। উনাকেও চিন্তা করতে হবে যে, এভাবে বছরের পর বছর ক্ষমতা জোর করে ধরে রাখলে একটা সময় সাদ্দাম হোসেনের মতো অবস্থা হবে।’ তিনি উল্লেখ করেন, উনি বিভাগীয় শহরগুলোতে জেলা কমিটি ও মহানগর কমিটির মধ্যে দ্বন্দ্ব লাগান। আবার তিনিই এই দ্বন্দ্ব নিরসন করে বাহবা নেন। এভাবে আজীবন ক্ষমতা ধরে রাখেন। নিজে থেকেই তার সরে যাওয়া উচিত বলেও মনে করেন তৌফিক এহেসান। তিনি আরও বলেন, ‘নতুন নেতৃত্ব আসলে নতুন নতুন সেবার দরজা খোলে। নতুন নতুন আইডিয়া পাওয়া যায়। নতুন প্রযুক্তির সুবিধা নেওয়া সম্ভব হয়। কিন্তু তার কারণে আমরা সেক্ষেত্রে বঞ্চিত হচ্ছি।’

জানা গেছে, বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সদস্য সংখ্যা ২ হাজার ২শ’র বেশি। অথচ ভোটার করা হয়েছে ৬শ’র কম। সংগঠনটির নেতাকর্মীদের অনেকের অভিযোগ—ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার কৌশল হিসেবে সবাইকে ভোটার করেন না হেলাল উদ্দিন। এমনকি সমিতির গঠনতন্ত্র না মেনে হেলাল উদ্দিন তার অনুসারী মুষ্টিমেয় কয়েকজনকে নিয়ে সংগঠন চালাচ্ছেন।

জানা গেছে, সমিতির ভোটার সংখ্যা ৫৯২ জন। আগের নির্বাচনে ভোটার তালিকা থেকে ৪৫৫ জন ভোটারকে বাদ দেওয়া হয়। সভাপতি হেলাল উদ্দিন নিজের পছন্দের লোকজনকে নিয়ে নির্বাচন ছাড়াই কমিটি ঘোষণা করেন।

শুধু তা-ই নয়, সমিতির আইন সম্পাদক ছিলেন ইমাম হোসেন। কিন্তু গত নির্বাচনে তাকে ভোটার তালিকা থেকেই বাদ দেওয়া হয়েছে। একইভাবে গত ২৫ বছর ঢাকা মহানগর দোকান মালিক সমিতির নেতৃত্বে ছিলেন মাসুদ কাদের। তাকেও ভোটার করা হয়নি।

এর আগে মঙ্গলবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে প্রথমে মানববন্ধন ও পরবর্তীতে ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে সংবাদ সম্মেলন করেন হেলাল উদ্দিনের বিরোধীরা। সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, হেলাল উদ্দিন তার ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য কয়েকজন অনুসারীকে নিয়ে অবৈধ পন্থায় আমাদের এই সুসংগঠিত সংগঠনের সদস্য ও বিভিন্ন জেলা নেতাদের মাঝে কলহ-বিবাদ অব্যাহত রেখেছেন। ফলে ঢাকা মহানগর দোকান মালিক সমিতির কার্যক্রমে বাধাবিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে।

তারা বলেন, এমন সব অনৈতিক ন্যক্কারজনক আচরণ ও সংগঠনের কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকার জন্য চূড়ান্তভাবে হুঁশিয়ারি করা হচ্ছে তাকে। যদি এরকম আচরণ বহাল থাকে, তবে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির কার্যকরী পরিষদ ও সদস্যরা কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সিনিয়র সহ-সভাপতি ও ঢাকা মহানগর দোকান মালিক সমিতির সভাপতি তৌফিক এহেসান, সহ-সভাপতি আবুল কাশেম খান ঝন্টু, নাজমুল হাসান মাহমুদ, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার সুব্রত সরকার।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির বর্তমান সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাকে নিয়ে সারা দেশব্যাপী আন্দোলন হচ্ছে না। একটি পক্ষ আমার বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘মহানগর কমিটি যিনি বানিয়েছেন, তিনিই মূলত সংকট সৃষ্টি করেছেন।’ নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে দায়িত্ব নিয়েছেন দাবি করে তিনি বলেন, ‘সংগঠনের গঠনতন্ত্র ও বাণিজ্য সংগঠনের বিধিমালা প্রতিপালন করে নির্বাচন বোর্ড ও আপিল বোর্ডের মাধ্যমে নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে।’

/এপিএইচ/এমওএফ/

লাইভ

টপ
X