X
বুধবার, ২৪ জুলাই ২০২৪
৯ শ্রাবণ ১৪৩১

স্বর্ণ ব্যবসায় নতুন দিগন্তে বাংলাদেশ 

গোলাম মওলা
৩০ জুন ২০২৩, ২২:৩০আপডেট : ১০ জুলাই ২০২৩, ১৬:৫০

বাংলাদেশের স্বর্ণের বাজার নিয়ে যে ধোঁয়াশা ছিল, তা দূর হচ্ছে এক নীতিমালার কল্যাণে। বাংলাদেশকে চোরাকারবারির যে বদনাম বয়ে বেড়াতে হতো, নীতিমালা হওয়ায় তাও ঘুচে যাচ্ছে। খাত সংশ্লিষ্টতা বলছেন, স্বর্ণের এই নীতিমালা জুয়েলারি খাতকে অচিরেই দেশের অর্থনীতির একটি বড় ও সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে। এরইমধ্যে ব্যবসায়ীরা বৈধ পথে সোনা আমদানি শুরু করেছেন, হচ্ছে রফতানিও।

নীতিমালা জারির পর এই খাতে আসছে নতুন নতুন বিনিয়োগ। দেশে স্বর্ণ পরিশোধনাগার (রিফাইনারি) হচ্ছে। অটোমেটেড ফ্যাক্টরিগুলো জেনারেট হচ্ছে। ইতোমধ্যে বড় আকারের বিনিয়োগের মাধ্যমে বসুন্ধরা গ্রুপ বাংলাদেশে প্রথম স্বর্ণ শোধনাগার প্ল্যান্ট স্থাপন করেছে। এই পরিশোধনাগারে একবার উৎপাদন শুরু হলে চীন, ভারত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপে বাংলাদেশি স্বর্ণের বিশাল বাজার তৈরি হবে। বাইরে থেকে কাঁচামাল আনা শুরু হলে দেশেই তৈরি হবে স্বর্ণের বার। এই স্বর্ণের বার রফতানি হবে বিশ্ববাজারে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)-এর সাবেক সভাপতি ড. দিলীপ কুমার রায় বলেন, ‘জুয়েলারি শিল্পটা দিন দিন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিল। প্রধানমন্ত্রী একটি যুগোপযোগী নীতিমালা দিয়েছেন। সেই স্বর্ণ নীতিমালার কারণে আমরা আশা এবং ভরসা পাচ্ছি। স্বর্ণ নীতিমালার বদৌলতে এই খাতে নতুন নতুন বিনিয়োগ আসা শুরু হয়েছে। বসুন্ধরা গ্রুপ একটি গোল্ড রিফাইনারি ফ্যাক্টরি স্থাপন করেছে। এই ফ্যাক্টরি যত তাড়াতাড়ি চালু হবে, তত দ্রুত আমরা যে কলঙ্কের টিকা নিয়ে আছি যে জুয়েলারি ব্যবসা মানে চোরাকারবারি, বৈধতা নেই—এগুলো দূর হবে।’ তিনি উল্লেখ করেন, অচিরেই বাংলাদেশের স্বর্ণ ব্যবসায় স্বর্ণযুগ ফিরবে। তিনি বলেন, ‘জুয়েলারি শিল্পে আরও সহজ নীতিমালা প্রয়োজন। তাহলে গার্মেন্টের চেয়েও বেশি ভ্যালু অ্যাডেড হতে পারে অর্থনীতিতে। পাশাপাশি আগামীর ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে জুয়েলারি শিল্প গড়ে উঠবে।’

প্রকৃতপক্ষে স্বর্ণালংকার দেশের ঐতিহ্যবাহী ব্যবসা হলেও সুষ্ঠু নীতিমালার অভাবে এই খাতে দীর্ঘদিন ধরে আইনানুগ চর্চার অভাব অনুভূত হয়েছে উল্লেখ করে দিলীপ কুমার রায় আরও বলেন, ‘অতীতে একটি ভয়ংকর অধ্যায় ছিল স্বর্ণ ব্যবসার। তখন আইন ছিল না, নিরাপত্তা ছিল না। ফলে উদ্যোক্তাদের সকালে ঘুম ভাঙতো আতঙ্ক নিয়ে। প্রায়ই চোরাই স্বর্ণ বা ভ্যাট-ট্যাক্স নিয়ে হয়রানির শিকার হতে হতো। এখন সেই অন্ধকার যুগের অবসান হয়েছে। বাজুসের নতুন নেতৃত্বে এখন আর সেই ভয় নেই।’ তিনি মনে করেন, আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে ভবিষ্যতে এই শিল্প আরও এগিয়ে যাবে। একইসঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের বড় খাত হবে এই শিল্প।’

উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের ২৯ অক্টোবর ‘স্বর্ণ নীতিমালা-২০১৮’-এর অনুমোদন দেওয়া হয়, যা ২০২১ সালের অক্টোবরের ২৮ তারিখ সংশোধন করে সরকার। সরকার স্বর্ণ রিফাইনারি কারখানা স্থাপন ও পরিচালনার অনুসরণীয় পদ্ধতিরও অনুমোদন দিয়েছে। এই নীতিমালা অনুযায়ী, অপরিশোধিত সোনা বা আংশিক অপরিশোধিত সোনা আমদানি ও পরিশোধন প্ল্যান্ট স্থাপন করা গেলে শিল্পায়নের এক নতুন দিগন্তে প্রবেশ করবে বাংলাদেশ। বিশ্বের ‘গোল্ড রিফাইনার্সের’ তালিকায় যুক্ত হবে বাংলাদেশের নাম। এ ছাড়া বিনিয়োগ আকর্ষণ ও প্রযুক্তি আহরণসহ দক্ষ জনবল সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি দেশে সোনার চাহিদা পূরণ হবে এবং আমদানি প্রতিস্থাপক হিসেবে কাজ করবে।

নীতিমালার প্রভাব

নীতিমালা জারি পর স্বর্ণকারদের স্বর্ণপ্রাপ্তিতে সহজলভ্যতা নিশ্চিত হয়েছে। বিশেষ করে এই নীতিমালায় আমদানির সুযোগ বাড়ানো হয়েছে। এতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদিত ডিলার বা কোনও ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানকে স্বর্ণকারদের চাহিদা মোতাবেক স্বর্ণ আমদানি করতে পারছে। এসব ডিলার বিনা শুল্কে স্বর্ণ আনতে পারে এবং তাদের এ জন্য বন্ডের লাইসেন্স প্রদান করার কথা বলা হয়েছে নীতিমালায়। এই নীতিমালা জারির পর ভ্যাটে নিবন্ধিত স্বর্ণকাররা নির্ধারিত ফরম পূরণ করে এবং শুল্ক-কর দিয়ে বন্ডারের কাছ থেকে স্বর্ণ কিনতে পারছেন। এই নীতিমালায় দেশীয় বাজারের পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের রফতানির সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী, রফতানিতে ইচ্ছুক ব্যবসায়ীদের বিনা শুল্কে স্বর্ণের ব্যবহার, অথবা শুল্ক প্রত্যর্পণের আওতায় সুবিধাদি পাচ্ছে। নীতিমালায় তাদের আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

এছাড়া এই নীতিমালার ফলে সরকারের জন্য শুল্ক-করাদি আদায়ও সহজতর হয়েছে। স্বর্ণ ব্যবসায় লেনদেনকৃত হাজার হাজার কোটি টাকার কর জালের আওতায় চলে এসেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা কী পরিমাণ স্বর্ণ কিনছেন, গয়না তৈরি করছেন এবং অবশিষ্ট কী পরিমাণ মজুত থাকছে—তার সুনির্দিষ্ট হিসাব সংরক্ষণ পদ্ধতি অবলম্বনের কথা বলা হয়েছে এই নীতিমালায়।

নীতিমালার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—ভোক্তার স্বার্থের দিকে খেয়াল রাখা। একজন ক্রেতা তার কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে যে গয়না কিনছেন, তার বিশুদ্ধতা সম্পর্কে নিশ্চয়তা পাওয়া তার অধিকার। নীতিমালায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পরীক্ষিত প্রতিটি স্বর্ণালংকার বিক্রি করার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। প্রতিটি স্বর্ণালংকারে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্দিষ্ট হলোগ্রামযুক্ত ও যথাযথ চালান প্রদান করে লেনদেন করতে হবে। এ সংক্রান্ত কোনও অভিযোগ উত্থাপিত হলে ভোক্তা অধিকার আইন অনুসারে তা নিষ্পত্তি করার কথা বলা হয়েছে।

স্বর্ণের বার, ছবি: সংগৃহীত

দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে প্রথম

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে বেসরকারিভাবে এই প্রথম সোনা পরিশোধনাগার স্থাপন হয়েছে। বিশ্ববাজারে আর কিছু দিন পর রফতানি হবে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ লেখা সোনার বার ও অলংকার।

একসময় দেশের চরম নিরাপত্তাহীন জুয়েলারি শিল্প এখন সম্ভাবনাময় হয়ে উঠেছে। উদ্ভাবন আর প্রযুক্তির সমন্বয়ে এটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের বড় খাত হবে বলে আশা দ্বিতীয় প্রজন্মের জুয়েলারি উদ্যোক্তাদের। এরইমধ্যে দেশে স্বর্ণ খাতে বিনিয়োগ করার মতো শত শত উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছে। এই খাতে বিনিয়োগ আগ্রহ দেখাচ্ছেন বিদেশি উদ্যোক্তারাও। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জুয়েলারি শিল্প হিসেবে গড়ে উঠলে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন প্রবৃদ্ধি বা জিডিপিতে এটা ইতিবাচক অবদান রাখতে পারে। এছাড়া ভ্যাট আহরণে আগামী দিনে সরকারের একটি বড় খাত যাচ্ছে জুয়েলারি শিল্প। আর  জুয়েলারি খাতের উদ্যোক্তারা মনে করছেন, সরকারের সহযোগিতা পেলে দুবাইয়ের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সোনার ব্যবসা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে

স্বর্ণের বাজার ও আগামীর সম্ভাবনা

বিদেশি বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান কিউওয়াই রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে বাংলাদেশে ২৮৫ কোটি ৪০ লাখ ডলার মূল্যের স্বর্ণালঙ্কার, স্বর্ণের বার ও রুপার অলংকার বিক্রি হয়েছে। কিউওয়াই রিসার্চের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত এসব পণ্যের বাজার প্রতিবছর গড়ে ১২ দশমিক ১ শতাংশ হারে বাড়বে। ২০৩০ সালে বাংলাদেশে স্বর্ণালংকার, স্বর্ণের বার ও রুপা মিলিয়ে মোট বিক্রির পরিমাণ দাঁড়াবে ২ হাজার ১০৯ কোটি ৬০ লাখ ডলার।

২০২০ সালে বাংলাদেশে শুধু স্বর্ণালংকার বিক্রি হয়েছে ২৩৭ কোটি ৯০ লাখ ডলার। প্রতিবছর সাড়ে ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির মধ্য দিয়ে ২০৩০ সালে স্বর্ণালংকার বিক্রির এই অঙ্ক ১ হাজার ৭০৬ কোটি ২০ লাখ ডলারে উন্নীত হবে।

২০২০ সালে বাংলাদেশে শুধু স্বর্ণের বার বিক্রি হয়েছে ৪২ কোটি ৮২ লাখ টাকার। ২০২২ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর স্বর্ণের বারের বাজার ১১ শতাংশ হারে বাড়বে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে কিউওয়াই রিসার্চ। এতে ২০৩০ সালে বিক্রির পরিমাণ দাঁড়াবে ৩৮৭ কোটি ২৫ লাখ ডলার।

বাংলাদেশে স্বর্ণের চাহিদা

২০১৮ সালের স্বর্ণ নীতিমালার (সংশোধিত ২০২১) প্রস্তাবনায় দেশে স্বর্ণের বার্ষিক চাহিদা ৪০ মেট্রিক টন, যার সিংহভাগ বৈধ পথে আসেনি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ দেশে মোট স্বর্ণের চাহিদার বড় অংশ অবৈধ উপায় বা চোরাচালানের মাধ্যমে জোগান দেওয়া হয় বলে সরকারের নীতিমালায়ই ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে স্বর্ণের বাজারে স্বচ্ছতা আনতে সরকার স্বর্ণ নীতিমালা প্রণয়ন করে। এই নীতিমালার আওতায় এরইমধ্যে ১৯টি প্রতিষ্ঠান স্বর্ণ আমদানির ডিলার হিসেবে লাইসেন্স গ্রহণ করেছে।

স্বর্ণে বিনিয়োগ 

বিশ্বজুড়েই স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকার মূল্যবান ও নির্ভরযোগ্য সম্পদ ও আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। সহজেই নগদ অর্থে রূপান্তরযোগ্য হওয়ায় অলংকার ব্যবহারের পাশাপাশি আপৎকালীন সঞ্চয় হিসেবেও স্বর্ণ সংগ্রহ ও সংরক্ষণের প্রবণতা দেখা যায়।

বাজার মূল্যের ইতিবাচক পরিবর্তনের কারণে নগদ অর্থের চেয়ে সঞ্চয় হিসেবে স্বর্ণ বেশি লাভজনক। সাধারণভাবে স্বর্ণের দাম ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় এই বিনিয়োগ লাভজনক। এ খাতে বিনিয়োগ অনেকটা ঝুঁকিমুক্ত। ব্যবহারিক উপযোগিতা থাকায় সব শ্রেণির মানুষের কাছেই এর আকর্ষণ বিনিয়োগের অন্যান্য ক্ষেত্রের চেয়ে বেশি। অধিকাংশ মানুষই বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণ সংরক্ষণকে নিরাপদ মনে করে।

রফতানির লক্ষ্য পূরণ করবে জুয়েলারি খাত

আগামী ২০২৬ সালের মধ্যে সরকার যে ১০০ বিলিয়ন ডলার রফতানি টার্গেট নিয়েছে, জুয়েলারি ব্যবসায়ীরা মনে করেন সরকারের এই লক্ষ্য পূরণে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে পারে জুয়েলারি শিল্প। এক্ষেত্রে সরকারের নীতি সহায়তা দরকার। তারা মনে করেন, দেশের রফতানি খাতে জুয়েলারি শিল্পের অবদান বাড়াতে বৈধভাবে সোনার বার, সোনার অলংকার, সোনার কয়েন রফতানি উৎসাহিত করতে কমপক্ষে ২০ শতাংশ ভ্যালু অ্যাড করার শর্তে, রফতানিকারকদের মোট ভ্যালু অ্যাডের ৫০ শতাংশ হারে আর্থিক প্রণোদনা দেওয়াও জরুরি। এছাড়া এইচএসভিত্তিক অস্বাভাবিক শুল্ক হারগুলো  হ্রাস করে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে শুল্ক হার সমন্বয়সহ এসআরও সুবিধা প্রদান করা জরুরি।

সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির (বাজুস) সভাপতি ও বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েম সোবহান আনভীর  বলেন, ‘দেশে বিপুল সংখ্যক আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ কারিগর রয়েছেন। বর্তমানে ২৫ হাজার স্বর্ণের দোকান এবং এই খাতে যুক্ত রয়েছেন ৪৪ লাখ মানুষ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঠিক দিকনির্দেশনা এবং ব্যাংকিং খাতের সহযোগিতা পেলে আগামী পাঁচ বছরে কমপক্ষে দুই কোটি মানুষের এ খাতে কর্মসংস্থান হবে।’ তিনি উল্লেখ করেন, জুয়েলারি খাতের পণ্যে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্য সংযোজন করা সম্ভব। সেটি জেনে ইতোমধ্যে ৩০০ থেকে ৪০০ উদ্যোক্তা এ খাতে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এখন নীতি সহায়তা হিসেবে দরকার এই শিল্পের জন্য একটি নিরাপদ জায়গা। এর পাশাপাশি ১০ বছরের কর অবকাশ সুবিধা পাওয়া গেলে জুয়েলারি খাত হবে দেশে আগামীর সবচেয়ে সম্ভাবনাময় শিল্প। তিনি দাবি করেন, ২০৪১ সালের উন্নত বাংলাদেশ তৈরিতে এই শিল্প বড় ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে রফতানি খাতের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে জুয়েলারি শিল্প ব্যাপক ভূমিকা রাখবে।

তিনি বলেন, ‘ভারত প্রতিবছর প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের জুয়েলারি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রফতানি করে—যা সে দেশের অর্থনীতিতে বিরাট অবদান রাখে। বাংলাদেশেও সেটি সম্ভব।’ স্বর্ণ খাত বাংলাদেশে বিনিয়োগের নিরাপদ ক্ষেত্র উল্লেখ করে দেশি-বিদেশি ব্যবসায়ীদের এই খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানান তিনি।

 

বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাজুস) সহ-সম্পাদক মাসুদুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই নীতিমালা হওয়ায় ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতিতে স্বর্ণ খাতের অবদান আরও বাড়বে। পাশাপাশি স্বর্ণালংকার রফতানি বাণিজ্য শুধু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সহায়তা করবে না, একইসঙ্গে এই খাতে কর্মরত প্রায় ৩ লাখ কারিগরের চাকরির নিরাপত্তাও দেবে।’

প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালে  নীতিমালা জারির আগ পর্যন্ত দেশে স্বর্ণ আসতো চোরাই পথে। স্বর্ণ চোরাচালানের বিশাল সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে এ দেশে। এর নেপথ্যে ছিল বিদেশি চোরাচালানকারীরা।

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্যমতে, হাতে তৈরি অলংকারের প্রায় ৮০ শতাংশ বাংলাদেশ ও ভারতে উৎপাদিত হয়। কিন্তু বিশ্ববাজারে অলংকার রফতানিতে খুব বেশি ভূমিকা রাখতে পারছে না বাংলাদেশ। চাহিদার প্রায় পুরোটাই রফতানি করছে ভারত। ২০২১-২২ অর্থবছরে অলংকার রফতানিতে ভারতে আয় ছিল ৩৯ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলার। এরমধ্যে শুধু স্বর্ণ থেকে রফতানি আয় হয় ৯ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার। ২০২০ সালে স্বর্ণ রফতানি করে বাংলাদেশ আয় করেছিল ২২ লাখ ২০ হাজার ডলার মাত্র। পুরোটাই রফতানি হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতে। ওই বছর স্বর্ণ রফতানির তালিকায় বাংলাদেশ ছিল ১৪৬তম দেশ। দেশের রফতানি পণ্য থেকে আয় করার মধ্যে স্বর্ণের আয় ছিল ১৮৫তম অবস্থানে। স্বর্ণ আমদানির দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশ ৩৩তম। ২০২০ সালে বাংলাদেশ ৩৯ কোটি ৭০ লাখ ডলারের স্বর্ণ আমদানি করেছে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘অর্থনীতিতে জুয়েলারি খাত থেকে সরকার রাজস্ব আরও বেশি পেতে পারে।’

ভারতের গহনা শিল্পের সাফল্য থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারি। জুয়েলারি খাতে প্রযুক্তিগত দক্ষতা, নকশা ও অন্যান্য সুবিধার জন্য বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি।

এদিকে বাজুসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আগামী বছর থেকেই টার্গেট করে স্বর্ণের গহনা রফতানি করবে বাংলাদেশ। ধাপে ধাপে বছরে ১০ টন স্বর্ণের গহনা রফতানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতির সহ-সভাপতি আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমরা আশা করছি ২০২৩-২৪ অর্থবছর থেকেই রফতানি শুরু করতে পারবো। এটি আমাদের একটি লক্ষ্যমাত্রা।’ তিনি বলেন, ‘বিশ্ববাজারে আমাদের দেশে তৈরি গহনার অনেক চাহিদা রয়েছে, কিন্তু আমরা বাজার ধরতে পারিনি। কারণ, আমাদের দেশে তৈরি গহনার দাম বেশি। এখন আমরা ভালো মানের গহনা তৈরি করবো। এভাবে আমরা একদিন বিশ্ববাজারেও প্রবেশ করবো স্বর্ণ শিল্প নিয়ে।’

তিনি উল্লেখ করেন, এই বিশ্ববাজার ধরার জন্য বাজুস সভাপতি সায়েম সোবহান আনভীর ব্যাপক উদ্যোগ নিচ্ছেন। বসুন্ধরা গ্রুপ বসুন্ধরা গোল্ড রিফাইনারি কারখানা স্থাপন করেছে। এখানে গোল্ড বার তৈরি এবং রফতানি করা হবে। শুধু তাই নয়, এই বার থেকে গহনা তৈরি করেও রফতানি করা হবে। এর মাধ্যমে দেশের স্বর্ণ শিল্পে বিপ্লব ঘটবে। আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আগামীতে স্বর্ণ শিল্প হবে দেশের রফতানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান খাত। এ শিল্পে নতুন নতুন কারখানা হবে, ব্যাপক কর্মসংস্থান হবে, বিকাশ ঘটবে স্বর্ণ শিল্পের।’

অবশ্য ব্যাগেজ রুলসের পরিবর্তে বাণিজ্যিকভাবে স্বর্ণ আমদানি নীতি সহজ করলে সরকারের রাজস্ব বাড়বে বলে মনে করছেন জুয়েলারি খাত-সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, এনবিআরসহ সরকারের অন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাজুস) সঙ্গে মিলে একটা গাইডলাইন তৈরি করতে পারে। স্বর্ণ যদি রফতানির উদ্দেশ্যে আমদানি করা হয়, তাহলে ২০৩০ সালের মধ্যে স্বর্ণ খাতের মোট টার্নওভার দাঁড়াবে ৩০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে।

আছে কিছু প্রতিবন্ধকতা

বাংলাদেশে সোনার বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৪০ টন। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, নীতিমালা জারির পর ২০১৯-এর শুরু থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দেশে সোনা আমদানি হয়েছে মাত্র ১৪৮ কেজির মতো। অর্থাৎ বাকি স্বর্ণ আসছে অবৈধভাবে। এই পরিমাণ বৈধভাবে সোনার চাহিদা পূরণ করার ক্ষেত্রে বড় বাধা কাঁচামালের উচ্চমূল্য, অতিরিক্ত উৎপাদন ব্যয়, শিল্প সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির উচ্চ আমদানি শুল্ক। বর্তমানে জুয়েলারি শিল্পের প্রায় সব ধরনের পণ্য ও যন্ত্রপাতির আমদানি শুল্ক ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ, যা স্থানীয় অন্যান্য শিল্পে আরোপিত শুল্কের চেয়ে অনেক বেশি। পাশাপাশি ৫ শতাংশ হারে উচ্চ ভ্যাট হার ও অতিরিক্ত উৎপাদন খরচের কারণে ভোক্তা পর্যায়ে আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে দামের পার্থক্য হচ্ছে। এতে ক্রেতা হারাচ্ছেন জুয়েলারি ব্যবসায়ীরা। আর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ছোট জুয়েলারি ব্যবসায়ী। অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে স্বর্ণের দাম বেশি হওয়ায় এই বাজার নিয়ন্ত্রণ করে চোরাচালান চক্র। তাই ক্রেতা সাধারণের একটা বিরাট অংশ পার্শ্ববর্তী দেশ ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে স্বর্ণ কিনতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

এদিকে স্বর্ণ নীতিমালাটি এত কঠিন করা হয়েছে যে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে সাধারণ ব্যবসায়ীদের পক্ষে সোনা আমদানির অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন বিষয়। বাধ্য হয়ে বাংলাদেশের অধিকাংশ ব্যবসায়ী এলসি না খুলে ব্যাগেজ রুলে (লাগেজ পার্টি) সোনার বার আনান। এছাড়া স্বর্ণ নীতিমালা এবং  রফতানি নীতি আদেশ ২০২১-২৪-এর মধ্যেও কিছু বৈষম্য রয়েছে। একদিকে স্বর্ণ নীতিমালায় নীতি সহায়তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, অপরদিকে রফতানি নীতি আদেশে জুয়েলারি শিল্প সরকারের অগ্রাধিকার বিবেচনার ১৪ খাতের তালিকায় স্থান পায়নি। এটি স্থান পেয়েছে ১৮ শিল্প খাতের (বিশেষ উন্নয়নমূলক খাত) একটি হিসেবে।

জুয়েলারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, অপরিশোধিত আকরিক সোনা আমদানির ক্ষেত্রে শর্ত সাপেক্ষে শুল্ক অব্যাহতি দেওয়া হলে স্বর্ণ চোরাচালান বন্ধ হবে। সরকার অধিক রাজস্ব আহরণ করতে পারবে।

উল্লেখ্য, প্রতিদিন সারা দেশের জল, স্থল ও আকাশ পথে কমপক্ষে প্রায় ২০০ কোটি টাকার অবৈধ সোনার অলংকার ও বার চোরাচালানের মাধ্যমে বাংলাদেশে আসছে, যা এক বছর শেষে দাঁড়ায় প্রায় ৭৩ হাজার কোটি টাকা।

বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি বলছে, অবৈধ স্বর্ণের অলংকার ও বার দেশের জুয়েলারি শিল্পের জন্য বড় বাধা। শুল্ক কমিয়ে লাইসেন্সধারী ডিলারদের জন্য আমদানির সুযোগ আরও সহজ করে দেওয়ার দাবি সংগঠনটির।

জুয়েলারি ব্যবসায়ীরা এই খাতের চুরি-ডাকাতিকেও প্রতিবন্ধকতা হিসেবে মনে করেন। তারা বলছেন,  রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে জুয়েলারি দোকানে চুরি ও প্রকাশ্যে ডাকাতির ঘটনা বেড়েছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন-বাজুসের তথ্য অনুযায়ী, দুর্ধর্ষ ডাকাতি ও প্রকাশ্যে হামলায় এখন পর্যন্ত ২০ জন জুয়েলারি ব্যবসায়ী নৃশংসভাবে হত্যার শিকার হয়েছেন।

/এপিএইচ/এমওএফ/
সম্পর্কিত
সোনার দাম আরও বাড়লো
আবারও বাড়লো সোনার দাম
রফতানিতে নগদ সহায়তা কমানোর সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি
সর্বশেষ খবর
ইন্টারনেটে বিঘ্ন ঘটায় বাংলা ট্রিবিউন পাঠকদের সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখপ্রকাশ
ইন্টারনেটে বিঘ্ন ঘটায় বাংলা ট্রিবিউন পাঠকদের সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখপ্রকাশ
টিভিতে আজকের খেলা (১৯ জুলাই, ২০২৪)
টিভিতে আজকের খেলা (১৯ জুলাই, ২০২৪)
দিনাজপুরে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশ-ছাত্রলীগের সংঘর্ষ, আ.লীগ কার্যালয় ভাঙচুর
দিনাজপুরে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশ-ছাত্রলীগের সংঘর্ষ, আ.লীগ কার্যালয় ভাঙচুর
কোটা পদ্ধতি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থি: জিএম কাদের
কোটা পদ্ধতি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থি: জিএম কাদের
সর্বাধিক পঠিত
ইন্টারনেটে বিঘ্ন ঘটায় বাংলা ট্রিবিউন পাঠকদের সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখপ্রকাশ
ইন্টারনেটে বিঘ্ন ঘটায় বাংলা ট্রিবিউন পাঠকদের সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখপ্রকাশ