বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণে প্রতিবন্ধকতা দূর করতে সম্পূরক ও আবগারি শুল্ক কাঠামোয় সময়োপযোগী ও ব্যবসাবান্ধব সংস্কারের তাগিদ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকেরা। উচ্চহারের জটিল শুল্ক ব্যবস্থা রাজস্ব আদায়ে প্রত্যাশিত সুফল দিচ্ছে না—বরং এটি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে বলে মত দেন বক্তারা।
মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই) আয়োজিত ‘সম্পূরক ও আবগারি শুল্কের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বাংলাদেশের রাজস্ব কার্যক্রম পর্যালোচনা’ শীর্ষক এক কর্মশালায় এসব কথা উঠে আসে।
পিআরআই চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা পরিচালক ড. বজলুল এইচ. খন্দকার। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সদস্য সৈয়দ মুশফিকুর রহমান এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এনবিআরের প্রথম সচিব মো. মশিউর রহমান।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সৈয়দ মুশফিকুর রহমান বলেন, উচ্চহারের শুল্ককে উৎসাহিত করতে চায় না এনবিআর, তবে রাজস্ব আয়ের বিষয়টিও সমানভাবে বিবেচনায় রাখতে হয়। তিনি জানান, বর্তমানে অভ্যন্তরীণ সম্পূরক শুল্ক ব্যবস্থায় প্রায় ১৭ হাজার আদর্শমাত্রা রয়েছে, যা বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের জন্য সহায়ক নয়। যৌক্তিক শুল্কহার নির্ধারণের ঘাটতির কারণেই ক্ষুদ্র ও মধ্য আয়ের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান থেকে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় সম্ভব হচ্ছে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মো. মশিউর রহমান বলেন, শুল্ক নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও পরিবেশ অধিদপ্তরের মতো সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। ব্যবসা-বাণিজ্যের বিকাশে যেসব প্রতিষ্ঠান ভূমিকা রাখছে, তাদের টিকিয়ে রাখতে বাণিজ্যবান্ধব শুল্কনীতির ওপর জোর দেন তিনি।
মূল প্রবন্ধে ড. বজলুল এইচ. খন্দকার বলেন, মাথাপিছু আয় বাড়লেও জিডিপির বিপরীতে কর রাজস্বের অনুপাত বাংলাদেশে ক্রমাগত কমছে। বর্তমানে জিডিপির প্রায় ১৭ শতাংশ আসে আবগারি শুল্ক থেকে, যা আধুনিক অর্থনৈতিক কাঠামোর তুলনায় পিছিয়ে। তিনি আরও বলেন, দেশে কর্পোরেট কর ও ভ্যাট হার তুলনামূলকভাবে বেশি এবং আবগারি শুল্ক এখনও মূলত দামের ওপর নির্ভরশীল— যেখানে উন্নত দেশগুলোতে পরিমাণভিত্তিক শুল্ক আরোপ করা হয়। গবেষণার পরবর্তী ধাপে আবগারি শুল্ক কাঠামো বিশ্লেষণ করে কার্যকর সংস্কার প্রস্তাব দেওয়ার কথা জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে উদ্বোধনী বক্তব্যে এম গ্রুপের প্রধান হাফিজ চৌধুরী বলেন, এনবিআরের বর্তমান কাঠামো আবগারি শুল্ক নির্ধারণে কতটা ন্যায্য ও যুক্তিসংগত ভূমিকা রাখতে পারছে— তা নতুন করে পর্যালোচনা প্রয়োজন।
সভাপতির বক্তব্যে ড. জাইদী সাত্তার বলেন, ২০১২ সালের কর আইনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৯ সালে যে শুল্কনীতি প্রণীত হয়েছে, তা যুগোপযোগী হলেও অত্যন্ত জটিল। জাতীয় টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে একক ও সহজ শুল্কব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি জানান, বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য দুই স্তরের শুল্কনীতি—ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য নিম্নহার এবং অন্যদের জন্য আদর্শহার—অধিক কার্যকর হতে পারে। বর্তমানে আমদানিকৃত ও দেশীয় পণ্যের ক্ষেত্রে ভিন্ন শুল্কহার আরোপ করা হচ্ছে, যা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং এলডিসি উত্তরণ প্রক্রিয়ায় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সময়োপযোগী ও কার্যকর রাজস্ব ব্যবস্থার জন্য শুল্কনীতি সংস্কার অপরিহার্য বলে মন্তব্য করেন তিনি।
কর্মশালার সমাপনী বক্তব্যে পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক ড. খুরশিদ আলম বলেন, আর্থিক ও রাজস্ব সংস্কার বিষয়ে তথ্যভিত্তিক নীতি সংলাপ অব্যাহত থাকবে। তিনি বক্তা ও অংশগ্রহণকারীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।









