৫ বছর ধরে ইউরোপে রফতানিতে নেতৃত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ

গোলাম মওলা
২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২০:০২আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২০:০২

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে গত পাঁচ বছরে তৈরি পোশাক রফতানির ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী অবস্থান গড়ে তুলেছে। ইইউ’র পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্টাটের সর্বশেষ তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১ থেকে ২০২৫ সময়কালে ইইউ’র তৈরি পোশাক আমদানি বাজার ২৪ দশমিক ৫৬ শতাংশ সম্প্রসারিত হলেও এই সময়ে প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় প্রবৃদ্ধির হারে এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১ সালে বিশ্ব থেকে ইইউ’র পোশাক আমদানি ছিল ৭২ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ইউরো, যা ২০২৫ সালে এসে দাঁড়ায় ৯০ বিলিয়ন ইউরোতে। যদিও ২০২২ সালের রেকর্ড উচ্চতার পর ২০২৩ সালে বাজারে ধাক্কা লাগে। তবু সামগ্রিক পাঁচ বছরে বাজারের বিস্তার উল্লেখযোগ্য। এই বিস্তৃত বাজারে নিজেদের অংশ বাড়াতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ।

প্রবৃদ্ধির তুলনায় এগিয়ে বাংলাদেশ

২০২১ সালে ইইউ বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি ছিল ১৪ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ইউরো। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৯ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ইউরোতে। অর্থাৎ পাঁচ বছরে প্রবৃদ্ধি ৩৫ দশমিক ৮১ শতাংশ।

একই সময়ে চীনের রফতানি বেড়েছে ২১ দশমিক ৪৮ শতাংশ (২১ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন থেকে ২৬ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ইউরো)। ভারতের বেড়েছে ৩৩ দশমিক ১৮ শতাংশ। অপরদিকে তুরস্কের রফতানি কমেছে ৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ।

অর্থাৎ প্রবৃদ্ধির হারে বাংলাদেশ প্রধান প্রতিযোগীদের ছাড়িয়ে গেছে। বাজার সম্প্রসারণের এই পর্যায়ে তুলনামূলক দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন করায় ইইউ বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় হয়েছে।

সাম্প্রতিক দুই বছর: ধীরগতি, তবু শক্ত অবস্থান

২০২৪ থেকে ২০২৫ সালে ইইউ’র মোট পোশাক আমদানি বেড়েছে মাত্র ২ দশমিক ১০ শতাংশ। বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি, ভোক্তা আস্থার ঘাটতি এবং ইউরোপের অর্থনৈতিক মন্থরতা এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এই সীমিত প্রবৃদ্ধির মধ্যেও বাংলাদেশ ৫ দশমিক ৯৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, যেখানে চীনের প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ১ দশমিক ১৭ শতাংশ এবং তুরস্কের রফতানি কমেছে ১০ দশমিক ৭৩ শতাংশ।

অর্থাৎ বাজারের গতি কমলেও প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলকভাবে শক্ত হয়েছে— এটি পরিসংখ্যানগতভাবে স্পষ্ট।

মূল্যচাপের বছর, ভলিউমে টিকে থাকা

২০২৫ সালের চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, বছরের দ্বিতীয়ার্ধ ছিল অত্যন্ত কঠিন। সামগ্রিকভাবে বছর শেষে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক থাকলেও দ্বিতীয়ার্ধে রফতানি ঋণাত্মক ধারায় চলে যায়। একইভাবে ইউরোপ ও চীনও বছর শেষে নেতিবাচক প্রবণতায় ছিল। তবে বাংলাদেশের পতন তুলনামূলকভাবে বেশি তীব্র ছিল।

ইউরোপীয় বাজারে এই সময়ে ব্যাপক মূল্যচাপ তৈরি হয়। খুচরা বিক্রেতারা সরবরাহকারীদের ওপর দামের বড় ধরনের ছাড় দেওয়ার চাপ সৃষ্টি করে। ফলে গড় রফতানি মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

তবে এই প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও বাংলাদেশ ভলিউম বাড়াতে সক্ষম হয়। কম দামে বেশি পণ্য সরবরাহের কৌশলে ইউরোপীয় ক্রেতারা ঝুঁকলে, বৃহৎ উৎপাদন সক্ষমতা ও স্থিতিশীল সরবরাহ ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশ সেই সুযোগ কাজে লাগায়।

চীন তার উচ্চ দক্ষতা ও স্কেলের সুবিধায় আরও বেশি দামে ছাড় দিতে সক্ষম হলেও সামগ্রিক বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব বেড়েছে। ভিয়েতনাম ও তুরস্ক তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত হলেও প্রবৃদ্ধির ধারায় বাংলাদেশ এগিয়ে রয়েছে।

প্রতিযোগিতার নতুন মানচিত্র

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে কম্বোডিয়া উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে— পাঁচ বছরে ৮৮ শতাংশের বেশি। ভিয়েতনাম ও পাকিস্তানও সাম্প্রতিক বছরে ভালো করেছে।

তবে বড় বাজার দখলের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনও দ্বিতীয় বৃহত্তম সরবরাহকারী এবং প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় কার্যত নেতৃত্বের অবস্থানে। কারণ, বাজার সম্প্রসারণের পুরো সময়ে ধারাবাহিকভাবে অংশ বাড়াতে পেরেছে বাংলাদেশ— যা নেতৃত্বের অন্যতম সূচক।

কৌশলগত বার্তা

বিশ্লেষক ও শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইইউ বাজারে প্রবৃদ্ধির এই নেতৃত্ব ধরে রাখতে হলে কেবল ভলিউম নয়, ভ্যালু অ্যাডিশন, পণ্যের বৈচিত্র্য, টেকসই উৎপাদন এবং উচ্চমূল্যের সেগমেন্টে প্রবেশ জরুরি।

কারণ বাজার এখন ‘ভলিউম গ্রোথ’-এর পাশাপাশি ‘ভ্যালু প্রেশার’-এর মধ্যে রয়েছে। অর্ডার থাকলেও দাম কম। ফলে কেবল কম দামে বেশি পণ্য সরবরাহের মডেল দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নাও হতে পারে।

পরিসংখ্যান বলছে, ইইউ বাজারে গত পাঁচ বছরে প্রবৃদ্ধির দৌড়ে বাংলাদেশই এগিয়ে। প্রতিযোগীদের তুলনায় বেশি হারে রফতানি বৃদ্ধি, বাজার অংশীদারত্ব শক্তিশালী করা এবং মূল্যচাপের মধ্যেও ভলিউম ধরে রাখা— এই তিনটি সূচকই প্রমাণ করে যে ইউরোপীয় বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত ধারাবাহিক নেতৃত্ব দিচ্ছে।

তবে সাম্প্রতিক মন্থরতা স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে—এখন সময় গুণগত রূপান্তরের। নেতৃত্ব ধরে রাখতে হলে পরবর্তী ধাপে কৌশল বদল অপরিহার্য।

বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক ও ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘‘দীর্ঘমেয়াদে ইইউ বাজারে বাংলাদেশের অগ্রগতি স্পষ্ট হলেও সাম্প্রতিক দুই বছরের ধীর প্রবৃদ্ধি সতর্কবার্তা দিচ্ছে।’’ তার মতে, ‘‘মোট বাজার সম্প্রসারিত হলেও চাহিদা আগের মতো শক্তিশালী নয়। তাই শুধুমাত্র ভলিউমের ওপর নির্ভর না করে পণ্যের মান, ডিজাইন ও ভ্যালু অ্যাডিশনের দিকে নজর দিতে হবে।” তিনি উল্লেখ করেন, ইইউ বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্ত হলেও সাম্প্রতিক মন্থর প্রবৃদ্ধি আগামী দিনের কৌশল নির্ধারণে নতুন করে ভাবতে হবে।

/এপিএইচ/এমওএফ/
সম্পর্কিত
‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ কী, কেন এত গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার 
বিক্রির জন্য নিলামে উঠছে এই আধুনিক দুর্গটি
৫৩০০ বছর পরও মমিতে জীবিত অণুজীব
সর্বশেষ খবর
তীব্র গরমে ৪ জনের মৃত্যু
তীব্র গরমে ৪ জনের মৃত্যু
বজ্রপাতে একদিনে ১২ জনের মৃত্যু
বজ্রপাতে একদিনে ১২ জনের মৃত্যু
মধ্যপ্রাচ্যের তিন যুদ্ধবিরতিকেই কেন যুদ্ধ মনে হচ্ছে
মধ্যপ্রাচ্যের তিন যুদ্ধবিরতিকেই কেন যুদ্ধ মনে হচ্ছে
কর্মসংস্থান রক্ষায় ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল আনলো বাংলাদেশ ব্যাংক
কর্মসংস্থান রক্ষায় ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল আনলো বাংলাদেশ ব্যাংক
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
আপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি
সংবাদ সম্মেলনে ইউএনও মুনমুন নাহার আশাআপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি