দেশের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসায় আগামী জুলাই-ডিসেম্বর মেয়াদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার (পলিসি রেট) অপরিবর্তিত রাখার পথে হাঁটতে যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে ১০ শতাংশে থাকা পলিসি রেট কমানোর মতো পরিস্থিতি এখনও তৈরি হয়নি বলে মনে করছেন অধিকাংশ অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞ। ফলে আগামী ছয় মাসও কঠোর মুদ্রানীতি বহাল থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংক আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে ২০২৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধের জন্য নতুন মুদ্রানীতি (মনিটারি পলিসি স্টেটমেন্ট-মপস) ঘোষণা করতে পারে। ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতি বিভাগ নতুন নীতিপত্রের খসড়া প্রস্তুতের কাজ প্রায় শেষ করেছে। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গত এক মাস ধরে দেশের অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার, গবেষক ও বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করা হয়েছে।
সোমবার (২২ জুন) অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে অর্থনীতির সার্বিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতির প্রবণতা, ঋণের সুদহার, প্রবৃদ্ধির গতি এবং সম্ভাব্য নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে মুদ্রানীতি বিভাগের কর্মকর্তারা অর্থনীতির সর্বশেষ চিত্র তুলে ধরেন।
কেন অপরিবর্তিত থাকতে পারে নীতি সুদহার
নীতিসুদহার বা রিপো রেট হলো সেই হার, যে হারে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে স্বল্পমেয়াদে অর্থ ধার করে। এই হার বাড়লে ব্যাংকগুলোর তহবিলের ব্যয় বৃদ্ধি পায়, ফলে ঋণের সুদও বাড়ে। বিপরীতে নীতিসুদ কমলে ঋণ নেওয়া সহজ হয় এবং অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ বাড়ে।
কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থনীতিতে অতিরিক্ত তারল্য প্রবাহিত করতে চায় না। কারণ মূল্যস্ফীতি এখনও স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে নামেনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ। যদিও এটি আগের বছরের তুলনায় কিছুটা কমেছে, তবে এখনও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক বেশি। বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের দাম কমার গতি ধীর হওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এখনও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা সুদহার কমানোর পক্ষে মত দিলেও অধিকাংশ অর্থনীতিবিদ ও গবেষক বর্তমান পরিস্থিতিতে সুদ কমানোর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাদের মতে, মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসার আগে নীতিসুদ কমানো হলে বাজারে আবারও চাহিদা বাড়বে, যা মূল্যস্ফীতিকে পুনরায় উসকে দিতে পারে।
টানা ১১ দফা বৃদ্ধির পর স্থিতাবস্থা
২০২২ সালের মে মাস থেকে শুরু হওয়া মুদ্রানীতি কঠোর করার ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ ব্যাংক টানা ১১ দফায় নীতিসুদহার বৃদ্ধি করে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে তা ১০ শতাংশে উন্নীত করা হয়। এরপর থেকে প্রায় দুই বছর ধরে এ হার অপরিবর্তিত রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ সুদহার বজায় রাখার ফলে বাজারে ঋণ প্রবাহ কিছুটা কমেছে এবং অতিরিক্ত চাহিদা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তবে এর নেতিবাচক প্রভাবও রয়েছে। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের গতি কমেছে, অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান নতুন প্রকল্পে যেতে নিরুৎসাহিত হয়েছে এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা ঋণের উচ্চ ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।
মূল্যস্ফীতি বনাম প্রবৃদ্ধি: নীতিনির্ধারকদের কঠিন সমীকরণ
বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। এর আগের অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ এবং তার আগের বছর ছিল ৪ দশমিক ২২ শতাংশ।
যদিও নতুন অর্থবছরের জন্য সরকার ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, তবে অর্থনীতিবিদদের অনেকেই মনে করেন, উচ্চ সুদহার, বিনিয়োগে স্থবিরতা, বৈদেশিক ঋণপ্রবাহের ধীরগতি এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে এ লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে না।
সুদ কমাতে চাপ বাড়ছে ব্যবসায়ীদের
দেশের ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে সুদহার কমানোর দাবি জানিয়ে আসছে। তাদের যুক্তি, বর্তমানে শিল্পঋণের কার্যকর সুদহার অনেক ক্ষেত্রে ১৩ থেকে ১৬ শতাংশের মধ্যে পৌঁছেছে, যা উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিশেষ করে তৈরি পোশাক, চামড়া, হালকা প্রকৌশল ও রপ্তানিমুখী শিল্প খাতের উদ্যোক্তারা মনে করছেন, উচ্চ সুদহার নতুন বিনিয়োগের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে অর্থনীতিবিদদের একটি বড় অংশ মনে করেন, শুধু সুদহার কমালেই বিনিয়োগ বাড়বে না। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, ব্যবসা পরিচালনার সহজ পরিবেশ এবং আর্থিক খাতের সুশাসনও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা নিয়েও উদ্বেগ
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে সরকারের ঘোষিত প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য প্রণোদনা প্যাকেজ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। নীতিনির্ধারকদের আশঙ্কা, এই বিপুল পরিমাণ অর্থ যদি বাজারে দ্রুত প্রবাহিত হয়, তাহলে তা মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
এ কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে একদিকে প্রবৃদ্ধি সহায়ক নীতি নিতে হবে, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতিও নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে—যা নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি জটিল ভারসাম্যের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে নীতিসুদহার অপরিবর্তিত রাখাই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত হবে। তার মতে, মূল্যস্ফীতি এখনও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে এবং অর্থনীতিতে চাহিদাজনিত চাপ পুরোপুরি কমেনি। ফলে এখন সুদহার কমালে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের অর্জন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের ভাষ্য, মূল্যস্ফীতি যদি আগামী কয়েক মাসে আরও কমে ৬-৭ শতাংশের ঘরে নেমে আসে, তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ধীরে ধীরে নীতিসুদ কমানোর বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে মুদ্রানীতির মূল লক্ষ্য থাকবে মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা।
সামনে কী হতে পারে
সব মিলিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন এমন এক অবস্থানে রয়েছে, যেখানে প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সুদ কমানোর প্রয়োজনীয়তা থাকলেও মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি সেই পথকে সংকুচিত করে রেখেছে। ফলে আগামী ছয় মাসের জন্য ১০ শতাংশ নীতিসুদহার বহাল রাখার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এর অর্থ হলো, ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তাদের উচ্চ ঋণ ব্যয়ের বাস্তবতা আরও কিছুদিন বহন করতে হতে পারে। অন্যদিকে সাধারণ ভোক্তারা আশা করতে পারেন, মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার কঠোর অবস্থান অব্যাহত রাখবে।
অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে—মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি কীভাবে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং প্রবৃদ্ধির গতি পুনরুদ্ধার করা যায়। আগামী মুদ্রানীতি সেই পথনকশারই একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হয়ে উঠবে।







