গ্যাস নেই, থেমে যাচ্ছে কারখানা, ঝুঁকিতে লাখো শ্রমিকের চাকরি 

গোলাম মওলা
২১ আগস্ট ২০২৬, ০৮:০০আপডেট : ২১ আগস্ট ২০২৬, ০৮:০০

গ্যাসের সংকট সাময়িক দুর্ভোগের সীমা ছাড়িয়ে এখন শিল্প খাতের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া, ময়মনসিংহের ভালুকা ও গাজীপুরের শ্রীপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ এতটাই কমে গেছে যে, গ্যাসনির্ভর অনেক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। কোথাও উৎপাদন নেমে এসেছে স্বাভাবিক সক্ষমতার ২০-৩০ শতাংশে, কোথাও ৭০-৭৫ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। আবার কোনও কোনও কারখানায় মেশিন চালু রাখার মতো গ্যাসই মিলছে না।

ফলে কারখানার ভেতরে যেখানে দিনভর মেশিনের শব্দ, শ্রমিকের ব্যস্ততা আর উৎপাদনের কর্মচাঞ্চল্য থাকার কথা, সেখানে এখন নেমে এসেছে নীরবতা। কোথাও শ্রমিকেরা কারখানায় এসেও কাজ না করে বসে থাকছেন, কোথাও তাঁদের ছুটিতে পাঠানো হচ্ছে। কোনও কোনও কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকায় শ্রমিকদের বাড়ি ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, সংকট দ্রুত না কাটলে শুধু উৎপাদন ও রফতানিই নয়, বিপুলসংখ্যক কর্মসংস্থানও ঝুঁকিতে পড়বে। দীর্ঘ সময় উৎপাদন বন্ধ থাকলে শ্রমিকের বেতন, ব্যাংকঋণের কিস্তি, বিদ্যুৎ-গ্যাসের বিলসহ নিয়মিত খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়বে। একপর্যায়ে কারখানা বন্ধ বা জনবল কমানোর মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হতে পারেন উদ্যোক্তারা।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, গ্যাসের সংকট এখন শুধু একটি শিল্পের সমস্যা নয়। টেক্সটাইল, সুতা, ডাইং, ফিনিশিং, সিরামিক, ইস্পাত, স্পিনিংসহ উৎপাদনব্যবস্থার একের পর এক ধাপ এতে আক্রান্ত হচ্ছে। এসব শিল্পের ওপর নির্ভরশীল তৈরি পোশাক খাতেও এর প্রভাব পড়ছে। অর্থাৎ একটি কারখানায় গ্যাস না থাকার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে পুরো সরবরাহব্যবস্থায়।

এক মাস ধরে সংকট, আবারও অবনতি

তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহের একটি ভাসমান টার্মিনালে দুর্ঘটনা ও কারিগরি সমস্যার পর গত প্রায় এক মাস ধরে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। মাঝখানে সরবরাহ কিছুটা বাড়ায় শিল্পাঞ্চলগুলোতে স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছিল। কিন্তু সেই স্বস্তি বেশি দিন স্থায়ী হয়নি।

সামিট পরিচালিত এলএনজি টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় এবং এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল আংশিকভাবে চালু হওয়ার পর গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়ে। কিন্তু পরে আবার সরবরাহ কমতে থাকে। সর্বশেষ কার্গো সংকটের কারণে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শিল্পাঞ্চলে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

পেট্রোবাংলার হিসাবে, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ স্বাভাবিক সময়েও কম থাকে। সংকটের সময় সরবরাহ আরও নিচে নেমে যাওয়ায় শিল্প, বিদ্যুৎ, সার, সিএনজি ও আবাসিক— সব খাতের মধ্যে গ্যাস বণ্টনে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। গত কয়েক দিনে দেশের মোট গ্যাস সরবরাহ একসময় ১৭৩ কোটি ঘনফুটে নেমে গিয়েছিল। পরে তা ২৪৪ কোটি ঘনফুটে উঠলেও আবার কমে প্রায় ২১৮ কোটি ঘনফুটে নেমেছে। অর্থাৎ সরবরাহ এখনো চাহিদার তুলনায় অনেক কম।

এ অবস্থায় সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে— সীমিত গ্যাস কীভাবে কোন খাতে দেওয়া হবে। সার ও বিদ্যুৎ উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে শিল্পকারখানায় সরবরাহ কমছে। কিন্তু শিল্পে গ্যাসের চাপ কমে গেলে উৎপাদন বন্ধ হচ্ছে, কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়ছে এবং রফতানি আদেশ সময়মতো সরবরাহ করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

নরসিংদীতে থেমে গেছে শিল্পের চাকা

দেশের অন্যতম বড় শিল্পাঞ্চল নরসিংদীর চিত্রই সংকটের গভীরতা সবচেয়ে স্পষ্ট করে তুলছে। সদর, মাধবদী, চৌয়ালা ও আশপাশের শিল্প এলাকায় গ্যাসনির্ভর শত শত কারখানা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে বা বন্ধ রেখেছে। স্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তাদের হিসাবে, নরসিংদীতে ছোট-বড় মিলিয়ে চার হাজারের বেশি কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় তিন হাজার টেক্সটাইল, ডাইং, সাইজিং, স্পিনিং ও তৈরি পোশাক খাতের। প্রায় ৪০০ কারখানা সরাসরি গ্যাসনির্ভর।

শিল্পোদ্যোক্তাদের হিসাবে সাম্প্রতিক সংকটে নরসিংদীতে প্রতিদিন কয়েকশ কোটি টাকার উৎপাদন ক্ষতি হচ্ছে। অনেক কারখানায় উৎপাদন ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। কোথাও উৎপাদন নেমে এসেছে মাত্র ১০ শতাংশে।

কয়েকটি কারখানা বিকল্প জ্বালানি হিসেবে কাঠ পুড়িয়ে বয়লার চালানোর চেষ্টা করছে। এতে উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার হাত থেকে কারখানাকে কিছুটা রক্ষা করা গেলেও খরচ বাড়ছে। একটি কারখানায় প্রতিদিন কাঠের পেছনেই ১০ হাজার টাকার বেশি অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে।

চৌয়ালা শিল্প এলাকার একটি কারখানায় শ্রমিকদের বয়লারে কাঠ পোড়াতে দেখা গেছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাস ছাড়া সাইজিং ও ডাইং কারখানা কার্যত চালানো সম্ভব নয়। বিকল্প জ্বালানি দিয়ে উৎপাদন চালু রাখলেও তা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিকভাবে টেকসই নয়।

১০ ইউনিটের সাতটিই বন্ধ

চৌয়ালার মোমিন টেক্সটাইল মিলের ১০টি ইউনিটের মধ্যে সাতটি গ্যাসের সংকটে বন্ধ রয়েছে। কারখানাটির স্বাভাবিক উৎপাদনের জন্য যে পরিমাণ গ্যাস প্রয়োজন, তার তুলনায় বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে অর্ধেকেরও কম। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে উৎপাদনে। প্রতিদিন ২৫ লাখ গজ কাপড় উৎপাদনের সক্ষমতা থাকা কারখানাটির উৎপাদন নেমে এসেছে মাত্র কয়েক হাজার গজে। প্রায় আড়াই হাজার শ্রমিকের মধ্যে প্রায় দেড় হাজার এখন কার্যত কর্মহীন।

আশুলিয়ায় উৎপাদন কমেছে ৭৫ শতাংশ

গ্যাস সংকটের তীব্রতা দেখা যাচ্ছে সাভার-আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলেও। কাঠগড়া-আমতলা এলাকার ফ্যাশন গ্লোব গ্রুপের একটি কারখানা কয়েক সপ্তাহ কম সক্ষমতায় চলার পর পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।

কারখানাটির দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা ৫০ হাজার পিস। কিন্তু গ্যাস সংকট শুরু হওয়ার পর বাইরে থেকে গ্যাস এনে সর্বোচ্চ ২০ হাজার পিস পর্যন্ত উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে। একইসঙ্গে ৮০ থেকে ৯০টি মেশিনের মধ্যে প্রায় ২৪টি বন্ধ রাখতে হয়েছে। কারখানাটিতে স্বাভাবিক উৎপাদনের জন্য প্রায় ১০ পিএসআই গ্যাসের চাপ প্রয়োজন। কিন্তু সেখানে চাপ শূন্য থেকে ২ দশমিক ৫ পিএসআইয়ের মধ্যে ওঠানামা করছে। কখনও সামান্য চাপ পাওয়া গেলেও তা দিয়ে মেশিন চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না।

বিকল্পভাবে বাইরে থেকে গ্যাস এনে উৎপাদন চালানোর চেষ্টা করেও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। এতে প্রতি ঘণ্টায় অতিরিক্ত প্রায় ৩০ হাজার টাকা ব্যয় হচ্ছে। অন্যদিকে আশুলিয়ার একটি টেক্সটাইল কারখানা প্রায় ১৫ দিন ধরে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। উদ্যোক্তার হিসাবে, এতে প্রতিদিন প্রায় এক কোটি টাকা করে লোকসান হচ্ছে।

আরেকটি ডাইং কারখানার দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা ৯০ টন হলেও বর্তমানে দুই টনও উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। কারখানাটিতে প্রায় ৯৭৫ শ্রমিক কর্মরত। উৎপাদন বন্ধ থাকলেও তাঁদের বেতন দিতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিই উদ্যোক্তাদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কারণ। কারণ উৎপাদন না হলেও শ্রমিকের বেতন, ঋণের কিস্তি, বিদ্যুৎ, নিরাপত্তা ও কারখানা রক্ষণাবেক্ষণের খরচ বন্ধ হয় না।

নারায়ণগঞ্জে ডাইং-ফিনিশিং কার্যত অচল

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা ও বিসিক শিল্প এলাকার চিত্রও একই। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় ডাইং, ফিনিশিং ও টেক্সটাইল কারখানার বড় অংশ উৎপাদন চালাতে পারছে না। কোথাও গ্যাসের চাপ এক থেকে দেড় পিএসআইয়ের মধ্যে। অথচ স্বাভাবিক উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন অনেক বেশি চাপ। ফলে বড় মেশিনগুলো চালু করা সম্ভব হচ্ছে না।

কারখানার ভেতরে সারি সারি কাপড় পড়ে আছে। কিন্তু উৎপাদন নেই। কোথাও শ্রমিকেরা হাজিরা দিয়ে বাড়ি চলে যাচ্ছেন। কোথাও কারখানা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সংস্কারকাজ করিয়ে শ্রমিকদের কর্মস্থলে ধরে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জের নিট ডাইং শিল্পের উদ্যোক্তাদের সংগঠনের হিসাবে, অন্তত ১৫২টি কারখানা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ইতোমধ্যে একটি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার তথ্যও দিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

এটি শুধু একটি শিল্পের জন্য নয়, তৈরি পোশাক রপ্তানির জন্যও বড় সতর্কবার্তা। কারণ ডাইং ও ফিনিশিং কারখানা থেকে সময়মতো কাপড় না পেলে পোশাক কারখানার উৎপাদনও থেমে যায়।

গাজীপুরে সক্ষমতার চার ভাগের এক ভাগ উৎপাদন

গাজীপুরের মাওনা এলাকায় আর্টিসান সিরামিকসের কারখানায় গ্যাস সংকটে উৎপাদন নেমে এসেছে প্রায় ২৫ শতাংশে। দিনে ২২ হাজার পিস তৈজসপত্র উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে উৎপাদন হয়েছে মাত্র ছয় হাজার পিস

গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় উচ্চ তাপমাত্রায় পোড়ানোর প্রয়োজন হয়—এমন পণ্য উৎপাদন করা যাচ্ছে না। এর ফলে কিছু ক্রয়াদেশ স্থগিত হয়েছে। এখানেও সংকটের প্রভাব শুধু বর্তমান উৎপাদনে সীমাবদ্ধ নেই। উৎপাদন কমলে ক্রেতাকে সময়মতো পণ্য দেওয়া যায় না। সময়মতো পণ্য না গেলে ক্রেতা বিকল্প দেশ থেকে পণ্য নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। একবার কোনও ক্রেতা অন্য দেশে চলে গেলে সেই ক্রয়াদেশ ফিরিয়ে আনা সহজ নয়।

এ প্রসঙ্গে তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “গ্যাস সংকট এখন আর স্বাভাবিক ব্যবসায়িক সমস্যা নেই; এটি শিল্পের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডাইং, নিটিং, ফিনিশিংসহ গ্যাসনির্ভর কারখানাগুলোতে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক কারখানা সক্ষমতার তুলনায় অর্ধেকেরও কম উৎপাদন করছে, কোথাও কোথাও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু উৎপাদন বন্ধ থাকলেও শ্রমিকের বেতন, ব্যাংকঋণের কিস্তি, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য খরচ বন্ধ থাকে না। ফলে উদ্যোক্তারা প্রতিদিন লোকসান গুনছেন। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে অনেক প্রতিষ্ঠান শ্রমিক ধরে রাখার সক্ষমতা হারাবে, যার ফলে কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।”

তিনি বলেন, “সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, গ্যাসের চাপ কখন থাকবে আর কখন থাকবে না—এটার কোনও নিশ্চয়তা নেই। মোহাম্মদ হাতেম আরও বলেন, “গ্যাস সংকট শুধু কারখানার উৎপাদন কমাচ্ছে না, এর প্রভাব রপ্তানিতেও পড়ছে।’’

তৈরি পোশাকের চেয়ে ঝুঁকিতে সরবরাহব্যবস্থার আগের ধাপ

গ্যাস সংকটের সরাসরি প্রভাব তৈরি পোশাক কারখানার তুলনায় সুতা, কাপড়, ডাইং ও ফিনিশিং কারখানায় বেশি। কারণ এসব শিল্পের উৎপাদনপ্রক্রিয়া গ্যাসের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল।

একটি পোশাক কারখানা হয়তো সীমিত গ্যাস বা বিকল্প জ্বালানি দিয়ে কোনোভাবে উৎপাদন চালিয়ে নিতে পারে। কিন্তু ডাইং, ফিনিশিং কিংবা কাপড় তৈরির কারখানায় বয়লার, স্টিম ও বিভিন্ন তাপভিত্তিক প্রক্রিয়া চালাতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস দরকার। ফলে গ্যাস সংকটের একটি বড় প্রভাব হচ্ছে পোশাকশিল্পের সরবরাহব্যবস্থায়। সুতা নেই, কাপড় নেই, ডাইং হচ্ছে না—তাহলে পোশাক কারখানায় পর্যাপ্ত কাঁচামাল থাকবে না।

এরই মধ্যে শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, সময়মতো পণ্য পাঠাতে না পারায় কেউ কেউ অতিরিক্ত খরচ করে আকাশপথে পণ্য পাঠাচ্ছেন। কোথাও আবার ক্রেতাকে মূল্যছাড় দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ গ্যাস সংকটের কারণে একটি কারখানার উৎপাদন বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রফতানি আয়, বৈদেশিক মুদ্রা, সরবরাহব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।

সবচেয়ে বড় ভয় কর্মসংস্থান নিয়ে

গ্যাস সংকট দীর্ঘ হলে সবচেয়ে বড় আঘাত আসতে পারে কর্মসংস্থানে। কারখানা বন্ধ থাকলে শ্রমিককে অনির্দিষ্টকাল বেতন দেওয়া সম্ভব নয়। উৎপাদন কমে গেলে শিফট কমাতে হয়। এরপর শ্রমিককে ছুটিতে পাঠানো, অস্থায়ীভাবে কর্মসংস্থান কমানো এবং শেষ পর্যন্ত ছাঁটাইয়ের ঝুঁকি তৈরি হয়।

ইতোমধ্যে নরসিংদীর একটি কারখানায় প্রায় আড়াই হাজার শ্রমিকের মধ্যে দেড় হাজার কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। আশুলিয়ার একটি স্পিনিং মিলে উদ্যোক্তা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে অন্তত ৩০ শতাংশ জনবল কমানো ছাড়া উপায় থাকবে না। অন্য কারখানায় শ্রমিকদের ছুটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হলেও এর মধ্যে বড় একটি সম্ভাব্য সংকটের ইঙ্গিত রয়েছে। দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে যদি একইভাবে উৎপাদন কমে যায়, তাহলে সরাসরি কারখানার শ্রমিকদের পাশাপাশি পরিবহন, খাবারের দোকান, বাসাবাড়ি ভাড়া, স্থানীয় বাজার ও ছোট ব্যবসার ওপরও এর প্রভাব পড়বে। অর্থাৎ গ্যাস সংকটের অর্থনৈতিক ক্ষতি কারখানার গেটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; তা ছড়িয়ে পড়বে স্থানীয় অর্থনীতির সর্বত্র।

উদ্যোক্তাদের সামনে তিন দিকের চাপ

বর্তমান পরিস্থিতিতে শিল্পোদ্যোক্তারা একসঙ্গে তিন ধরনের চাপের মুখে পড়েছেন। প্রথমত, উৎপাদন বন্ধ বা কমে যাওয়ায় আয় কমছে। দ্বিতীয়ত, উৎপাদন না হলেও শ্রমিকের বেতন, ব্যাংকঋণের কিস্তি, বিদ্যুৎ, রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য ব্যয় চালিয়ে যেতে হচ্ছে। তৃতীয়ত, বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করলে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে।

কেউ কাঠ পুড়িয়ে বয়লার চালাচ্ছেন, কেউ বাইরে থেকে গ্যাস কিনছেন, কেউ ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করছেন। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম ইচ্ছামতো বাড়ানোর সুযোগ নেই ফলে বাড়তি খরচের বড় অংশ উদ্যোক্তার ওপরই চাপছে। দীর্ঘদিন এভাবে চললে কারখানার আর্থিক সক্ষমতা দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়বে।

বিদ্যুৎ-গ্যাসের সংকট একে অন্যকে আরও গভীর করছে

গ্যাস সংকটের আরেকটি বড় প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর একটি বড় অংশ গ্যাসনির্ভর। ফলে গ্যাসের সরবরাহ কমলে বিদ্যুৎ উৎপাদনও কমে যায়।

আবার বিদ্যুৎ না থাকলে কারখানাকে ডিজেলচালিত জেনারেটর চালাতে হয়। ফলে জ্বালানি খরচ বাড়ে। অর্থাৎ গ্যাসের সংকট বিদ্যুৎ সংকট তৈরি করছে, আর বিদ্যুৎ সংকট শিল্পের উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। কিছু শিল্পোদ্যোক্তার হিসাবে, দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের কারণে ডিজেলের ব্যবহার কয়েক গুণ বেড়েছে। পোশাক ও চামড়াজাত পণ্যের কারখানাগুলোতেও বাড়তি জ্বালানি খরচের চাপ তৈরি হয়েছে। এতে বাংলাদেশের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে ঠিক এমন সময়ে, যখন আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতারা দাম কমানোর জন্য চাপ দিচ্ছেন

বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও মহিউদ্দিন রুবেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “গ্যাস সংকট এখন শিল্পের জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ডাইং, ফিনিশিং, নিটিং ও টেক্সটাইল কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় এর প্রভাব ধীরে ধীরে পুরো পোশাকশিল্পের সরবরাহব্যবস্থায় পড়ছে। একটি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হলে শুধু সেই কারখানাই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, তার সঙ্গে যুক্ত অন্য কারখানা, শ্রমিক ও রফতানি কার্যক্রমও ক্ষতির মুখে পড়ে।’’ তিনি বলেন, ‘‘সংকট দীর্ঘায়িত হলে উৎপাদন খরচ বাড়ার পাশাপাশি সময়মতো রফতানি আদেশ পূরণ করা কঠিন হবে। এতে ক্রেতাদের আস্থা কমার এবং ভবিষ্যতের ক্রয়াদেশ অন্য দেশে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। একইসঙ্গে দীর্ঘদিন উৎপাদন ব্যাহত হলে অনেক কারখানার পক্ষে শ্রমিকদের ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। তাই শিল্পের স্বার্থে দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন ও পূর্বানুমানযোগ্য গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।”

পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন কমছে, বাড়ছে আমদানিনির্ভরতা

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক সংকটের তাৎক্ষণিক কারণ এলএনজি টার্মিনালের সমস্যা হলেও মূল সংকট আরও গভীরে। দেশের পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ধীরে ধীরে কমছে। নতুন গ্যাসক্ষেত্র ও কূপ থেকে পর্যাপ্ত উৎপাদন যোগ করা যায়নি। ফলে দেশীয় গ্যাসের ঘাটতি পূরণে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।

এখন মোট গ্যাস সরবরাহের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আসে আমদানি করা এলএনজি থেকে। ফলে কোনও এলএনজি টার্মিনালে সমস্যা হলে তার প্রভাব সরাসরি জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় পড়ে। এটি দেখিয়ে দিয়েছে, শুধু আমদানিনির্ভরতা বাড়িয়ে গ্যাস সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়।

এখনই সিদ্ধান্ত না নিলে ক্ষতি আরও বাড়বে

শিল্পোদ্যোক্তাদের সবচেয়ে বড় দাবি হলো—তাঁদের অন্তত নির্ভরযোগ্য সরবরাহের নিশ্চয়তা দিতে হবে। গ্যাস ২৪ ঘণ্টা দেওয়া সম্ভব না হলেও কখন, কতক্ষণ এবং কী পরিমাণ গ্যাস পাওয়া যাবে—এ বিষয়ে পূর্বঘোষিত একটি সময়সূচি প্রয়োজন। তাহলে কারখানাগুলো উৎপাদন পরিকল্পনা করতে পারবে।

দীর্ঘমেয়াদে সমাধান কোথায়

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বল্পমেয়াদে এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনাল দ্রুত সচল করা জরুরি। একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও নতুন কূপ খননে গতি আনতে হবে। পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রের যেসব কূপ থেকে বাড়তি উৎপাদন সম্ভব, সেগুলো দ্রুত কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া দরকার। ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে আনার বিষয়টিও দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

তবে শুধু গ্যাসের সরবরাহ বাড়ালেই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হবে না। শিল্পে জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার বাড়াতে হবে। যেখানে সম্ভব, বিদ্যুৎ, সৌরবিদ্যুৎ বা অন্যান্য বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। একইসঙ্গে অবৈধ গ্যাস সংযোগ, অপচয় এবং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা বন্ধ করতে হবে।

কারখানার চাকা কত দিন থেমে থাকবে?

গ্যাস সংকটের বর্তমান চিত্র শুধু কয়েকটি শিল্পাঞ্চলের দুর্ভোগের গল্প নয়। এটি বাংলাদেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি সক্ষমতার জন্য একটি বড় সতর্কসংকেত। তাই গ্যাস সংকট এখন আর শুধু জ্বালানি খাতের সমস্যা নয়। এটি শিল্প, কর্মসংস্থান, রফতানি ও অর্থনীতির সমস্যা। দ্রুত সমাধান না হলে আজ যে কারখানায় মেশিন বন্ধ, আগামী দিনে সেই কারখানার গেটেই হয়তো দেখা দিতে পারে আরও বড় প্রশ্ন—কারখানা আবার চালু হবে তো, নাকি কর্মসংস্থানের চাকা স্থায়ীভাবেই থেমে যাবে?

/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
পোশাক কারখানার ছাদেই সম্ভব ২৮১৫ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন
সংকটে বাড়ছে খরচ, আঁচ লেগেছে টিফিন বক্সেও
সিএনজি স্টেশন বন্ধের কর্মসূচি ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্থগিত
সর্বশেষ খবর
চকলেটপ্রেমী হয়েও ৪৭-এ ফিট ইমরান হাশমি, কী তার ডায়েটের রহস্য
চকলেটপ্রেমী হয়েও ৪৭-এ ফিট ইমরান হাশমি, কী তার ডায়েটের রহস্য
২০০ মেগাপিক্সেলের গিম্বল ক্যামেরা নিয়ে চীনে এলো অনার রোবট ফোন
২০০ মেগাপিক্সেলের গিম্বল ক্যামেরা নিয়ে চীনে এলো অনার রোবট ফোন
পোড়ামাটির কারুকাজে ইতিহাসের অনন্য নিদর্শন কান্তজিউ মন্দির
পোড়ামাটির কারুকাজে ইতিহাসের অনন্য নিদর্শন কান্তজিউ মন্দির
পনির পোলাও: এক হাঁড়িতেই জমে উঠুক সুগন্ধি ও স্বাদের আয়োজন
পনির পোলাও: এক হাঁড়িতেই জমে উঠুক সুগন্ধি ও স্বাদের আয়োজন
সর্বাধিক পঠিত
চুল ও শেভের বিল আড়াই হাজার টাকা, সেলুনে অভিযান চালিয়ে জরিমানা
চুল ও শেভের বিল আড়াই হাজার টাকা, সেলুনে অভিযান চালিয়ে জরিমানা
অবশেষে সেনাপ্রধানের হস্তক্ষেপে অচলাবস্থার অবসান
অবশেষে সেনাপ্রধানের হস্তক্ষেপে অচলাবস্থার অবসান
মির্জা ফখরুল ভোট দিতে পারলেও পারছেন না অলি আহমেদ
আজ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনমির্জা ফখরুল ভোট দিতে পারলেও পারছেন না অলি আহমেদ
বিএনপির বাইরেও  ১১ ভোট বেশি পেয়েছেন মির্জা ফখরুল
বিএনপির বাইরেও ১১ ভোট বেশি পেয়েছেন মির্জা ফখরুল
পাল্টা পদক্ষেপে পাকিস্তান হাইকমিশনের বাইরের স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিলো ভারত
পাল্টা পদক্ষেপে পাকিস্তান হাইকমিশনের বাইরের স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিলো ভারত