এলডিসি উত্তরণের পর মেধাস্বত্ব সুরক্ষায় শক্তিশালী কাঠামোর তাগিদ

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট 
২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৬:৩০আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৬:৩০

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের শিল্প ও ব্যবসা খাতে মেধাস্বত্ব সুরক্ষা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে এই পরিবর্তন দেশের উদ্ভাবন, প্রযুক্তি উন্নয়ন, ব্র্যান্ডিং ও পণ্যের মূল্য সংযোজনের নতুন সুযোগও তৈরি করবে। এ জন্য এখন থেকেই কার্যকর আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি শিল্পখাতের সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকরা।

তাদের মতে, এলডিসি-পরবর্তী বাস্তবতায় ওষুধ, তৈরি পোশাক, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও শিল্প-নকশাসহ বিভিন্ন খাতে মেধাস্বত্ব অধিকার নিয়ে নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না, আইনের কার্যকর প্রয়োগ, দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তি, গবেষণা ও উন্নয়ন এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বয় জোরদার করতে হবে।

সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে ‘এলডিসি-পরবর্তী সময়ে শিল্পখাতের রূপান্তর: মেধাস্বত্ব অধিকার সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ ও কৌশল নির্ধারণ’ শীর্ষক ফোকাস গ্রুপ আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সাপোর্ট টু সাসটেইনেবল গ্রাজুয়েশন প্রজেক্ট (এসএসজিপি) ও ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। 

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ইআরডি সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী। সভাপতিত্ব করেন ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ। 

শুধু উৎপাদন বাড়ালে হবে না

ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে পণ্যের মেধাস্বত্বের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। এলডিসি-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের জন্য একটি শক্তিশালী মেধাস্বত্ব অধিকারভিত্তিক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।

তিনি বলেন, “দেশের ওষুধ, তৈরি পোশাকসহ সম্ভাবনাময় খাতগুলোতে শুধু উৎপাদন বাড়ানোর দিকে নজর দিলে চলবে না। উদ্ভাবন, ব্র্যান্ডিং, প্রযুক্তি বিনিময় ও মূল্য সংযোজনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।” 

তাসকীন আহমেদ বলেন, “মেধাস্বত্ব আইনের বিদ্যমান কাঠামোগত দীর্ঘসূত্রতা, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি, প্রয়োজনীয় নীতিমালার অভাব, সীমিত প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং বেসরকারি খাতে সচেতনতার ঘাটতি বড় চ্যালেঞ্জ।”

এ জন্য একটি আধুনিক ও কার্যকর মেধাস্বত্ব অধিকারবিষয়ক কার্যালয় প্রতিষ্ঠা, দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য ঢাকা ও চট্টগ্রামে আইপি ট্রাইব্যুনাল চালু, ট্রেডমার্ক নিবন্ধনে স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু এবং প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োগের প্রস্তাব দেন তিনি। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের মধ্যে মেধাস্বত্ব বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।

গবেষণার বরাদ্দ থাকলেও ব্যবহার হচ্ছে না

ইআরডি সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী বলেন, এলডিসি উত্তরণের পর মেধাস্বত্ব ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের দিকে আরও বেশি নজর দেওয়া প্রয়োজন।

তিনি বলেন, “দেশে উৎপাদিত অনেক পণ্যের অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা রয়েছে। এসব পণ্যের নকশা ও গুণমান উন্নত করা গেলে আন্তর্জাতিক বাজারেও ভালো সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।” 

গবেষণা ও উন্নয়ন খাতের বরাদ্দের বিষয়ে তিনি বলেন, “একদিকে বলা হচ্ছে গবেষণার জন্য বরাদ্দ রয়েছে, কিন্তু তা ব্যবহার হচ্ছে না। আবার অন্যদিকে বলা হচ্ছে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ নেই। অর্থাৎ এখানে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। এ ঘাটতি দূর করতে হবে।” 

ইআরডি সচিব জানান, এসএমই খাতের জন্য সরকার বিশেষ তহবিল দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে বরাদ্দ দিলেই হবে না, তা বাস্তবায়নের জন্য উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং টেকসই উন্নয়নের দিকে নজর দিতে হবে।

তিনি বলেন, “এসএসজিপির মাধ্যমে খাতভিত্তিক কারিগরি সহায়তা দেওয়ার কাজ চলছে। প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট নীতিমালায় সংশোধন ও সংস্কার করা হবে। সরকারি সেবাগুলোকে ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।” 

ট্রিপস-প্লাস বাধ্যবাধকতার ঝুঁকি

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদ ও ওয়াইপো একাডেমির সাবেক পরামর্শক মোহাম্মদ আতাউল করিম।

তিনি বলেন, “এলডিসি-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের শিল্পখাতকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে মেধাস্বত্ব অধিকারকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করতে হবে। ওষুধ, সফটওয়্যার ও তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি এবং শিল্প-নকশাসহ বিভিন্ন খাতে ট্রিপস ও সম্ভাব্য ট্রিপস-প্লাস বাধ্যবাধকতা নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।” তবে একই সঙ্গে এসব পরিবর্তনকে উদ্ভাবন, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও শিল্পের রূপান্তরের সুযোগ হিসেবেও দেখা যেতে পারে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তার মতে, বাংলাদেশের বিদ্যমান মেধাস্বত্ব কাঠামোর যে আইনি নমনীয়তা রয়েছে, তা যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে। পাশাপাশি গবেষণা ও উন্নয়ন, শিল্প ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা এবং উদ্ভাবনে প্রণোদনা বাড়ানো প্রয়োজন।

সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বে বেসরকারি খাত

এসএসজিপির প্রকল্প পরিচালক ও ইআরডির অতিরিক্ত সচিব এ.এইচ.এম জাহাঙ্গীর বলেন, এলডিসি উত্তরণের পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে দেশের বেসরকারি খাত। এ অবস্থায় মেধাস্বত্ব আইনের যথাযথ প্রয়োগ, শিল্পখাতের প্রস্তুতি এবং প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি।

পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, এলডিসি-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিল্পের প্রতিটি খাতের নিজস্ব কর্মপরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর উদ্যোগ ও সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে।

এসএসজিপির প্রকল্প উপদেষ্টা ও সাবেক সচিব আবদুল বাকী বলেন, এলডিসি উত্তরণের বর্ধিত সময়সীমাকে কাজে লাগাতে সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর পাশাপাশি বেসরকারি খাতের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করতে হবে।

পোশাকে ডিজাইন ও মেধাস্বত্বে জোর

বিজিএমইএর সেক্রেটারি জেনারেল মেজর জেনারেল ড. মোঃ শাহেদুল ইসলাম (অব.) বলেন, এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশের নিজস্ব মেধাস্বত্ব আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং উদ্যোক্তাদের প্রণোদনা দেওয়া জরুরি।

তিনি জানান, তৈরি পোশাক খাতে নতুন পণ্যের ডিজাইন ও মেধাস্বত্ব নিয়ে কাজ করতে বিজিএমইএ ইতোমধ্যে একটি সেন্টার অব এক্সিলেন্স স্থাপন করেছে।

এগ্রোকেমিক্যাল খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বাংলাদেশ এগ্রোকেমিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কাজী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এ খাতের জন্য কার্যকর ও যুগোপযোগী নীতিমালা প্রয়োজন।

আউটসোর্সিং থেকে উদ্ভাবনে যেতে হবে

তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিষয়ে ব্রেইন স্টেশন ২৩ লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রাইসুল কবির বলেন, শুধু আউটসোর্সিংনির্ভর ব্যবসা দিয়ে ভবিষ্যতে এগিয়ে যাওয়া কঠিন হবে। নতুন প্রযুক্তি ও পণ্য উদ্ভাবনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

এ জন্য শিক্ষা ও শিল্প খাতের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং মেধাস্বত্বের নিরাপত্তা ও আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

ওষুধের দাম নিয়ে উদ্বেগ

ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার ফায়েজ আহমেদ বলেন, এলডিসি-পরবর্তী সময়ে ওষুধ খাতে আন্তর্জাতিক মেধাস্বত্ব আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হলে দেশে ওষুধের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তবে একই সঙ্গে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই বলেও মত দেন তিনি।

ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের মহাপরিচালক মো. আজিজুর রহমান নিজস্ব পণ্যের ব্র্যান্ড তৈরি, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা এবং নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. আবুরেজা এম. মুজারেবা বলেন, নতুন পণ্য ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে উৎপাদিত পণ্যের জিআই নিবন্ধনের পাশাপাশি সেগুলোর বাণিজ্যিকীকরণের ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।

অনুষ্ঠানে কপিরাইট অফিস বাংলাদেশের রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত সচিব) এস. এম. আরশাদ ইমাম, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ড. সাইফ উদ্দিন আহম্মদসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট খাতের প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন।

/জিএম/এসটি/ 
সম্পর্কিত
এলডিসি উত্তরণে খাতভিত্তিক কর্মকৌশল চান উদ্যোক্তারা
‘এলডিসি উত্তরণে তাড়াহুড়া নয়’ 
এলডিসি-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পাঁচ বছরের নতুন কর্মপরিকল্পনা
সর্বশেষ খবর
এজাহারে এমপি নজরুলের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ
এজাহারে এমপি নজরুলের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ
রুদ্রনীল আহমেদের নতুন কাব্যগ্রন্থ 'ঊনচিন্তা অথবা বিচ্ছিন্ন ভাবনার বুদ্‌বুদ'
রুদ্রনীল আহমেদের নতুন কাব্যগ্রন্থ 'ঊনচিন্তা অথবা বিচ্ছিন্ন ভাবনার বুদ্‌বুদ'
জ্বালানি তেলের বর্ধিতমূল্য প্রত্যাহারের দাবী যাত্রী কল্যাণ সমিতির
জ্বালানি তেলের বর্ধিতমূল্য প্রত্যাহারের দাবী যাত্রী কল্যাণ সমিতির
সংসদের চিঠি পেলে গাজী নজরুলের বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে ইসি
সংসদের চিঠি পেলে গাজী নজরুলের বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে ইসি
সর্বাধিক পঠিত
নিউইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়লেন প্রধানমন্ত্রী, সফরসঙ্গী কারা?
নিউইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়লেন প্রধানমন্ত্রী, সফরসঙ্গী কারা?
‘নিজেকে শেষ করার’ আগে চিরকুটে কষ্টের কথা লিখে গেছেন মরিয়ম
‘নিজেকে শেষ করার’ আগে চিরকুটে কষ্টের কথা লিখে গেছেন মরিয়ম
এমপি গাজী নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী পুলিশি হেফাজতে
এমপি গাজী নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী পুলিশি হেফাজতে
সরকারি চাকরিজীবীর মৃত্যুতে আজীবন পেনশন পাবেন স্ত্রী বা স্বামী, তবে....
সরকারি চাকরিজীবীর মৃত্যুতে আজীবন পেনশন পাবেন স্ত্রী বা স্বামী, তবে....
অপ্রতিম হত্যা: আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়ে যা জানিয়েছে তিন আসামি 
অপ্রতিম হত্যা: আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়ে যা জানিয়েছে তিন আসামি