‘ডাচ-বাংলা ব্যাংক থেকে বলছি। আপনার অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। নমিনি ঠিক করতে হবে।’
সম্প্রতি +880 9658519187 নম্বর থেকে এমন একটি ফোন আসে এক গ্রাহকের কাছে। ফোনের অপর প্রান্তের ব্যক্তি নিজেকে ডাচ-বাংলা ব্যাংকের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে অ্যাকাউন্ট-সংক্রান্ত তথ্য জানতে চান এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চাপ দেন।
তবে পরে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা যায়, নম্বরটি ডাচ-বাংলা ব্যাংকের নয়। অর্থাৎ ব্যাংকের কর্মকর্তা পরিচয়ে করা ওই ফোনটি ছিল ভুয়া।
শুধু ‘অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যাবে’— এমন ভয় দেখানোই নয়, প্রতারকরা কখনও ব্যাংক কর্মকর্তা, কখনও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) কর্মকর্তা, আবার কখনও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা পরিচয়ে ফোন ও বার্তা পাঠাচ্ছে। এরপর নানা অজুহাতে চাওয়া হচ্ছে পিন, ওটিপি, কার্ডের তথ্য, পাসওয়ার্ড কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য।
একবার এসব তথ্য প্রতারকের হাতে গেলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা সরিয়ে নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
‘অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যাবে’— ভয় দেখানোই প্রথম ফাঁদ
প্রতারকদের বহুল ব্যবহৃত কৌশল হলো গ্রাহককে ভয় দেখানো। ফোন করে বলা হয়, ‘আপনার অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যাবে’, ‘কেওয়াইসি হালনাগাদ হয়নি’, ‘নমিনি পরিবর্তন করতে হবে’, ‘অ্যাকাউন্টে সন্দেহজনক লেনদেন হয়েছে’ কিংবা ‘এখনই তথ্য না দিলে অ্যাকাউন্ট স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাবে’।
আতঙ্কিত গ্রাহক তখন অনেক সময় যাচাই না করেই প্রতারকের কথামতো তথ্য দিতে শুরু করেন।
এরপর প্রতারক বলতে পারে, ‘আপনার মোবাইলে একটি ওটিপি গেছে, সেটা বলুন’, ‘কার্ডের পিনটি নিশ্চিত করুন’ অথবা ‘এই লিংকে ঢুকে তথ্য আপডেট করুন।’
কিন্তু মনে রাখতে হবে, ব্যাংক বা বৈধ আর্থিক প্রতিষ্ঠান পরিচয়ে ফোন করলেও কাউকে পিন, ওটিপি, পাসওয়ার্ড বা নিরাপত্তা কোড দেওয়া যাবে না।
লটারির পুরস্কার থেকে ‘ভুল করে টাকা পাঠানো’— ফাঁদ অনেক রকম
প্রতারণার ধরন শুধু ব্যাংক কর্মকর্তা পরিচয়ের ফোনেই সীমাবদ্ধ নয়। ‘আপনি এক লাখ টাকা লটারি জিতেছেন’, ‘সরকারি অনুদান পেয়েছেন’, ‘বিশেষ ক্যাশব্যাকের টাকা নিতে এই লিংকে ক্লিক করুন’— এমন বার্তাও নিয়মিত ছড়ানো হয়।
কখনও বলা হয়, ‘আপনার নম্বরে ভুল করে টাকা চলে গেছে। দয়া করে টাকাটা ফেরত দিন।’
আবার কখনও প্রতারক ভুয়া এসএমএস পাঠিয়ে দাবি করে, টাকা পাঠানো হয়েছে। এরপর দ্রুত সেই টাকা ফেরত দিতে বলা হয়।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে শুধু এসএমএস দেখে বিশ্বাস করা যাবে না। সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা এমএফএস অ্যাপ খুলে লেনদেনের ইতিহাস ও ব্যালেন্স যাচাই করতে হবে। প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠানের অফিসিয়াল হেল্পলাইনে যোগাযোগ করে নিশ্চিত হতে হবে।
ওটিপি মানেই আপনার নিরাপত্তার চাবি
প্রতারণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হলো ওটিপি বা ওয়ান-টাইম পাসওয়ার্ড। অনেকেই মনে করেন, শুধু ওটিপি বললে আর কী হবে। বাস্তবে নির্দিষ্ট লেনদেন বা অ্যাকাউন্টে প্রবেশের অনুমোদনের সঙ্গে এই কোড যুক্ত থাকতে পারে।
তাই কেউ ফোন করে যত পরিচয়ই দিক না কেন, ওটিপি, পিন, কার্ডের গোপন তথ্য বা পাসওয়ার্ড জানতে চাইলে সতর্ক হতে হবে।
‘আমি ব্যাংক থেকে বলছি’, ‘আমি কাস্টমার কেয়ার থেকে বলছি’ কিংবা ‘আমি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা’— পরিচয় শুনেই বিশ্বাস করার সুযোগ নেই।
পরিচয় দাবি করা আর পরিচয় প্রমাণ করা এক বিষয় নয়।
ভুয়া কাস্টমার কেয়ার নম্বরেও বিপদ
অনেকেই সমস্যায় পড়ে গুগল, ফেসবুক বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া নম্বরে ফোন করে কাস্টমার কেয়ারের সহায়তা নিতে চান। এখানেও প্রতারণার ঝুঁকি রয়েছে।
প্রতারকরা অনেক সময় প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে ভুয়া কাস্টমার কেয়ার নম্বর ছড়িয়ে দেয়। সেখানে ফোন করলে গ্রাহকের কাছ থেকে অ্যাকাউন্টের তথ্য, পিন বা ওটিপি চাওয়া হতে পারে।
তাই ব্যাংক, বিকাশ, নগদ, রকেটসহ যেকোনও আর্থিক সেবার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের অফিসিয়াল অ্যাপ, ওয়েবসাইট বা অনুমোদিত মাধ্যমে দেওয়া যোগাযোগ নম্বর ব্যবহার করা উচিত।
অপরিচিত লিংকে ক্লিক করাও বিপজ্জনক
‘অ্যাকাউন্ট চালু রাখতে ক্লিক করুন’, ‘পুরস্কার পেতে আবেদন করুন’, ‘কেওয়াইসি আপডেট করুন’— এমন নানা বার্তার সঙ্গে লিংক পাঠানো হয়।
অপরিচিত বা সন্দেহজনক লিংকে ক্লিক করে ব্যক্তিগত তথ্য, কার্ডের তথ্য কিংবা ব্যাংকিং সংক্রান্ত তথ্য দেওয়া উচিত নয়। একইভাবে কেউ যদি ফোন করে বলে, ‘সমস্যা সমাধানের জন্য এই অ্যাপটি ইনস্টল করুন’— তাহলেও সতর্ক হতে হবে।
বিশেষ করে অপরিচিত ব্যক্তির কথায় রিমোট অ্যাক্সেস বা ফোন নিয়ন্ত্রণের সুযোগ দেয়— এমন কোনও অ্যাপ ইনস্টল করা ঝুঁকিপূর্ণ।
হোয়াটসঅ্যাপে পুলিশ বা সরকারি কর্মকর্তা পরিচয়েও প্রতারণা
সাইবার প্রতারকরা এখন শুধু ব্যাংক বা এমএফএস প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করছে না। হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যমে পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা, আদালত বা সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়েও ফোন ও মেসেজ করা হচ্ছে।
কখনও বলা হচ্ছে, আপনার নামে মামলা হয়েছে। কখনও বলা হচ্ছে, আপনার মোবাইল নম্বর অপরাধে ব্যবহার হয়েছে। এরপর দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নামে টাকা পাঠাতে বলা হয়।
প্রোফাইল ছবিতে পুলিশের পোশাক, সরকারি লোগো বা কোনও কর্মকর্তার ছবি থাকলেও সেটিকে পরিচয়ের প্রমাণ হিসেবে নেওয়া যাবে না। প্রযুক্তির সাহায্যে সহজেই ভুয়া পরিচয় ও প্রোফাইল তৈরি করা সম্ভব।
কীভাবে বুঝবেন ফোনটি প্রতারকের?
কয়েকটি বিষয় খেয়াল করলেই অনেক ক্ষেত্রে প্রতারণার চেষ্টা বোঝা যায়।
প্রথমত, অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন করে জরুরি সিদ্ধান্ত নিতে চাপ দেওয়া হচ্ছে কিনা। দ্বিতীয়ত, ভয় দেখিয়ে বা লোভ দেখিয়ে টাকা বা গোপন তথ্য চাওয়া হচ্ছে কিনা। তৃতীয়ত, পিন, ওটিপি, পাসওয়ার্ড কিংবা কার্ডের গোপন তথ্য জানতে চাওয়া হচ্ছে কিনা।
এ ছাড়া ‘এখনই করতে হবে’, ‘কয়েক মিনিটের মধ্যে না করলে অ্যাকাউন্ট বন্ধ’, ‘কাউকে বলবেন না’— এ ধরনের কথাও সতর্ক হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।
সন্দেহ হলে ফোনে কথা চালিয়ে না গিয়ে কল কেটে দেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অফিসিয়াল মাধ্যমে যোগাযোগ করাই নিরাপদ।
প্রতারণামূলক কল এলে যা করবেন
প্রথমেই আতঙ্কিত হওয়া যাবে না। কেউ ব্যাংক বা সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা পরিচয় দিলেও ফোনে দেওয়া নির্দেশনা অনুসরণ করার আগে পরিচয় যাচাই করতে হবে।
যা করবেন
—কোনও অবস্থাতেই পিন, ওটিপি, পাসওয়ার্ড বা কার্ডের গোপন তথ্য কাউকে দেবেন না।
—অপরিচিত লিংকে ক্লিক করবেন না।
—অচেনা ব্যক্তির কথায় কোনও অ্যাপ ইনস্টল করবেন না।
—‘ভুল করে টাকা পাঠানো হয়েছে’— এমন দাবি এলে আগে নিজের অ্যাকাউন্টে লেনদেন যাচাই করুন।
—শুধু এসএমএসের ওপর নির্ভর না করে সংশ্লিষ্ট অ্যাপ বা অফিসিয়াল হেল্পলাইনের মাধ্যমে তথ্য নিশ্চিত করুন।
—সন্দেহজনক নম্বর থেকে আসা কল বা মেসেজের স্ক্রিনশট সংরক্ষণ করুন।
—প্রয়োজনে নম্বরটি ব্লক ও রিপোর্ট করুন।
—ইতোমধ্যে কোনও তথ্য দিয়ে ফেললে বা সন্দেহজনক লেনদেন হলে দ্রুত ব্যাংক বা সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।
কয়েক মিনিটের সতর্কতাই বাঁচাতে পারে সঞ্চয়
ডিজিটাল লেনদেন যত বাড়ছে, প্রতারণার কৌশলও তত বদলাচ্ছে। একসময় যেখানে শুধু ফোন করে পিন বা গোপন তথ্য চাওয়া হতো, এখন সেখানে ভুয়া লিংক, নকল কাস্টমার কেয়ার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভুয়া পরিচয় এবং ভয় দেখিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে।
তাই অপরিচিত নম্বর থেকে আসা কোনও ফোনকে শুধু পরিচয়ের কারণে বিশ্বাস করার সুযোগ নেই। ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত কর্মকর্তা হলেও গোপন নিরাপত্তা তথ্য কাউকে দেওয়া যাবে না— এই বিষয়টি মনে রাখা জরুরি।
বিশেষ করে পরিবারের বয়স্ক সদস্য ও প্রযুক্তি ব্যবহারে কম অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের এ বিষয়ে সচেতন করা প্রয়োজন। কারণ প্রতারকরা অনেক সময় মানুষের ভয়, লোভ, অজ্ঞতা ও তাড়াহুড়াকে কাজে লাগিয়েই সফল হয়।
একটি ফোন, একটি লিংক কিংবা একটি ওটিপি— ভুল সিদ্ধান্তে মুহূর্তেই বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হতে পারে। তাই সন্দেহ হলেই থামুন, যাচাই করুন, তারপর সিদ্ধান্ত নিন।