ক্ষুদ্র, কুটির, অতিক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ৫ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের অর্থ দ্রুত বিতরণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আগামী নভেম্বরের মধ্যে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী পুরো অর্থ বিতরণ শেষ করতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাগাদা দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ডেপুটি গভর্নরের উপস্থিতিতে সিএমএসএমই খাতের জন্য চুক্তিবদ্ধ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। বৈঠকে ৩৪টি ব্যাংক ও পাঁচটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীরা অংশ নেন।
বৈঠক শেষে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি)-এর চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান।
তিনি বলেন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের স্বল্প সুদে চলতি মূলধনের ঋণ দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ৫ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন স্কিম চালু করেছে। গত ১০ সেপ্টেম্বর ব্যাংকগুলোর সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর এ তহবিল থেকে ঋণ বিতরণ শুরু হয়। তবে প্রথম দুই সপ্তাহে বিতরণ করা হয়েছে প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা।
মাসরুর আরেফিন বলেন, নভেম্বরের মধ্যে পুরো ৫ হাজার কোটি টাকা বিতরণ শেষ করতে ব্যাংকগুলোকে তাগাদা দেওয়া হয়েছে। প্রান্তিক পর্যায়ের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য এ উদ্যোগ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এর মাধ্যমে তারা তুলনামূলক কম সুদে ব্যবসার প্রয়োজনীয় চলতি মূলধন সংগ্রহের সুযোগ পাবেন।
প্রথম দুই সপ্তাহে বিতরণ ৪৫০ কোটি টাকা
৫ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের অর্থ দ্রুত বিতরণের নির্দেশনা দেওয়া হলেও প্রথম দুই সপ্তাহে বিতরণ হয়েছে প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা। অর্থাৎ, মোট তহবিলের ৯ শতাংশের মতো ইতোমধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। বাকি প্রায় ৪ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা বিতরণ করতে হবে নভেম্বরের মধ্যে।
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে এই অর্থ প্রকৃত উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছানো এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিতরণ সম্পন্ন করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যবসা পরিচালনা, কাঁচামাল কেনা এবং দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে চলতি মূলধনের প্রয়োজন হয়। সহজ শর্তে অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলে তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণ ও উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখতে সহায়তা মিলতে পারে।
তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ‘উদ্যোগ’ প্রকল্পে প্রচারণা বাড়ানোর নির্দেশ
বৈঠকে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘উদ্যোগ’ প্রকল্প নিয়েও আলোচনা হয়। দেশের বিভিন্ন বিভাগের কয়েকটি নির্বাচিত জেলায় পরীক্ষামূলকভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তবে এখনো এ প্রকল্পে প্রত্যাশিত সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানান এবিবি চেয়ারম্যান।
তিনি বলেন, প্রকল্পটির বিষয়ে উপজেলা, ইউনিয়ন ও জেলা পর্যায়ে প্রচারণা বাড়াতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তরুণ উদ্যোক্তাদের কাছে প্রকল্পের সুবিধা তুলে ধরতে ব্যাংকগুলোর নিজস্ব প্রচার কার্যক্রম জোরদার করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পটির আওতায় তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিল থেকে ১০ লাখ টাকা এবং ঋণ হিসেবে আরও ১০ লাখ টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। ২১ বছর বা তার কম বয়সী তরুণ উদ্যোক্তাদের এ উদ্যোগের আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করা হলেও প্রকল্প সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকলে অনেকেই আবেদন করতে আগ্রহী হন না। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ে প্রচারণা, সহজ আবেদনপ্রক্রিয়া এবং উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বন্ধ কারখানা চালুতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ
বৈঠকে বন্ধ ও অর্ধবন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালু এবং সক্ষমতার তুলনায় কম উৎপাদনে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা দিতে সরকারের ৬০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজের অর্থ বিতরণ নিয়েও আলোচনা হয়।
এই প্যাকেজের অর্থ ছাড়ের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর অসহযোগিতার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মাসরুর আরেফিন বলেন, ব্যাংকগুলোর অসহযোগিতা করার কোনো সুযোগ বা প্রশ্ন নেই। তবে ঋণ বিতরণের পর তা যেন নতুন করে খেলাপি ঋণে পরিণত না হয়, সে বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
তিনি বলেন, শুধু লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য ঋণ বিতরণ করা ঠিক হবে না। যেসব প্রকল্প বাস্তবসম্মত, অর্থবহ এবং ভবিষ্যতে টেকসইভাবে পরিচালিত হওয়ার সক্ষমতা রাখে, সেসব প্রকল্পে অর্থায়ন করতে হবে। কাউকে সহায়তা করতে গিয়ে ব্যাংকগুলো নতুন করে খারাপ ঋণ তৈরি করতে চায় না।
বন্ধ, অর্ধবন্ধ ও সক্ষমতার তুলনায় কম উৎপাদনে থাকা শিল্পকারখানাগুলোকে সহায়তা দিতে ব্যাংকগুলো কাজ করছে জানিয়ে তিনি বলেন, এ ধরনের অর্থায়নের জন্য উপযুক্ত প্রকল্প খুঁজে পাওয়া বর্তমানে কিছুটা কঠিন। তবে ব্যাংকগুলো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
ঋণ বিতরণে গুরুত্ব প্রকৃত উদ্যোক্তাদের
মাসরুর আরেফিন বলেন, ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে এ অর্থায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাই জনগণের অর্থ যেন প্রকৃত উদ্যোক্তা ও প্রয়োজনীয় খাতে যথাযথভাবে পৌঁছায়, সেটিই ব্যাংকগুলোর মূল লক্ষ্য।
অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এ খাতের ব্যবসা পরিচালনা, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। তবে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তার সক্ষমতা, প্রকল্পের সম্ভাব্যতা এবং ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য যাচাই করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের অর্থ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিতরণ করা গেলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের চলতি মূলধনের চাহিদা পূরণে সহায়তা মিলতে পারে। একই সঙ্গে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ‘উদ্যোগ’ প্রকল্পের প্রচারণা বাড়ানো এবং বন্ধ শিল্পকারখানায় টেকসই অর্থায়ন নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে ব্যাংকগুলো।