ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে টালমাটাল জ্বালানি বাজার। বিশ্ববাজারে ক্রমাগতভাবে বাড়ছে জ্বালানির দাম। বাংলাদেশের বাজারে জ্বালানির দাম না বাড়লেও দেখা দিয়েছে সংকট। সরকারের তরফ থেকে সংকটের কথা বারবার অস্বীকার করা হলেও ফিলিং স্টেশনগুলোতে দেখা যাচ্ছে যানবাহানের দীর্ঘ সারি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও তেল না পেয়ে ঘটছে অপ্রীতিকর ঘটনাও। রাজধানী থেকে শুরু করে দেশজুড়ে এই চিত্রের দেখা মিলছে।
জ্বালানির এই সংকটে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে গোটা অর্থনীতি। পণ্য পরিবহনে বাড়ছে খরচ। ডিজেল না পেয়ে কৃষি সেচও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। গ্যাসের অভাবে বন্ধ হচ্ছে সার কারখানাও। এর ফলে আসন্ন মৌসুমে সারের তীব্র সংকট দেখা দিতে পারে। এর প্রভাব পড়বে খাদ্য উৎপাদনেও। আমদানির্ভর জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে অপর্যাপ্ত বিনিয়োগের কারণে এই সংকট তীব্রতর হয়েছে, যা সরাসরি উৎপাদনশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করছে। ফলে, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির শঙ্কাও রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি সংকট ও অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহের ফলে বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যার মধ্যে কৃষি উৎপাদন হ্রাস, সেচ কার্যক্রম ব্যাহত এবং গ্রামীণ ক্ষুদ্র শিল্প বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটতে পারে।
পরিবহন খাত
জ্বালানি সংকটের জেরে পরিবহন ও পণ্য পরিবহন খাতে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ডিজেল ও অন্যান্য জ্বালানির সংকটে পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান এবং নৌযানের চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, যা পণ্য পরিবহন খরচ ও ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসহ আমদানিকৃত পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জ্বালানি তেল ও ডিজেলের সংকটের কারণে পরিবহন ব্যবসায়ীরা ট্রাক এবং কাভার্ড ভ্যানের ভাড়া বাড়িয়েছেন। কিছু রুটে ভাড়া ট্রাক প্রতি ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এমনকি, পর্যাপ্ত তেল না পাওয়ায় অভ্যন্তরীণ নৌপথে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছে, যা চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য পরিবহনে বিঘ্ন সৃষ্টি করছে।
কৃষি সেচ ব্যবস্থা
জ্বালানি সংকটে বিশেষ করে ডিজেল ও বিদ্যুতের তীব্র ঘাটতিতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি সেচ ব্যবস্থা। ডিজেলের সংকটে চালানো যাচ্ছে না সেচ পাম্প। ফলে বোরো ধানসহ ফসলের উৎপাদন ঝুঁকিতে পড়ছে। ডিজেলের সংকটে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বোরো ধানের সেচ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পর্যাপ্ত ডিজেল না পাওয়ায় এবং চড়া দামে কিনতে বাধ্য হওয়ায় কৃষকদের উৎপাদন খরচ বাড়ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খুলনা, মেহেরপুর ও সিরাজগঞ্জসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ভরা মৌসুমে ডিজেল না পেয়ে সেচ পাম্প বন্ধ থাকায় জমি ফেটে যাচ্ছে। এতে বোরো আবাদ নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি সামাল দিতে জরুরি ডিজেল আমদানির পদক্ষেপ নেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পটুয়াখালী জেলার গলাচিপা উপজেলার পানপট্টি গ্রামের কৃষক পরেশ দাস বলেন, “বাজারে ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। অনেকেই ডিজেল লুকিয়ে রেখে অল্প পরিমানে বেশি দামে বিক্রি করছে। গ্রামে বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটে অহরহ। সেচ কার্যক্রম চালু রাখতে মুনাফাখোর ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বেশি দামে ডিজেল কিনে পাম্প সচল রাখতে হচ্ছে। এতে ফসলের উৎপাদন খরচ বাড়বে।”
গ্রামীণ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জ্বালানি সংকট ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি গ্রামীণ ক্ষুদ্র এবং কুটির শিল্পকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। লোডশেডিং এবং কাঁচামাল পরিবহনে বাধার কারণে এই শিল্পগুলো বন্ধের উপক্রম হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সৌরশক্তি, বায়োগ্যাস, বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার এবং সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা অপরিহার্য বলেও মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
তারা বলছেন, সংকট মোকাবিলায় করণীয় ও বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে। সৌরবিদ্যুৎ বা সোলার প্যানেল স্থাপন এবং বায়োগ্যাস প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে গ্রামীণ শিল্পে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানো যেতে পারে। কারখানাগুলোয় জ্বালানি সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি ব্যবহার এবং নিয়মিত এনার্জি অডিট করা যেতে পারে। এমনকি, ক্ষতিগ্রস্থ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও কুটির শিল্পের জন্য স্বল্প সুদে বিশেষ ঋণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
জানতে চাইলে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত পিরোজপুর জেলার স্বরূপকাঠি উপজেলায় কৌড়িখাড়া বিসিক শিল্প নগরীর ব্যবস্থাপক এম এ হাশেম বলেন, “পল্লী বিদ্যুতের আওতায় চলছে কৌড়িখাড়া বিসিক শিল্প নগরী। অধিকাংশ সময় বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটে। ঝড়ো আবহাওয়ায় তো কথাই নাই। জেনারেটর দিয়ে বিদ্যুতের সরবরাহ ঠিক রাখতে হলে জ্বালানি তেলের প্রয়োজন। অতীতে এভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারলেও এখন পারছি না। কারণ, ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। পেলেও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ছে।”
মৎস্য ও পোল্ট্রি খামার
জ্বালানি তেল সংকটের কারণে দেশের মৎস্য ও পোল্ট্রি খাত চরম লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছে। ডিজেলের অভাবে অনেক জেলে নৌকা নিয়ে নদীতে মাছ ধরতে যেতে পারছে না, যার প্রভাব পড়বে বাজারে। এছাড়া অনেক জেলে বেকার হয়ে পড়ছেন।
এদিকে, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় জেনারেটর চালানোর জন্য ডিজেল পাচ্ছে না খামারিরা। ফলে অনেক খামারে মুরগির বাচ্চা মারা যাচ্ছে। ফিড বা পোল্ট্রি খাদ্য আনা-নেওয়ায় বিঘ্ন ঘটায় উৎপাদন প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। উৎপাদন খরচ বাড়লেও ন্যায্য দাম না পাওয়ায় পোল্ট্রি খামারিরা ঋণের বোঝা ও আর্থিক সংকটে পড়েছেন।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে গাজীপুরের পোল্ট্রি খামারি মালিক শাহজাহান মৃধা বলেন, “তেলের সংকটের কারণে জেনারেটর চালানো সম্ভব হচ্ছে না। অতিরিক্ত দাম দিয়ে জ্বালানি কিনতে বাধ্য হচ্ছি। এতে উৎপাদন খরচ বাড়লেও বাজারে পণ্যের দাম সেভাবে বাড়েনি। এতে আমরা খামারীরা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছি।”









