গ্যাস সংকটের ওপর বিলের খড়গ, সমাধান চান গ্রাহকরা

সাদ্দিফ অভি ও ইমরান আলী
০১ আগস্ট ২০২৬, ২১:৫৮আপডেট : ০১ আগস্ট ২০২৬, ২২:১৬

রাজধানীসহ সারা দেশে গ্যাসের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ কম থাকায় বাসাবাড়িতে রান্নার কাজ সবচেয়ে বেশি ব্যাহত হচ্ছে। দিনের বেলায় চুলা জ্বালানোই দায় হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ নগরবাসীর। কবে এই সংকট কাটবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন তারা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গ্যাস বিল নিয়ে তীব্র অসন্তোষ। গ্যাসের বিকল্প হিসেবে ইলেকট্রিক চুলা ব্যবহার করায় বাড়ছে বিদ্যুৎ বিল। সব মিলিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন গ্রাহকরা। তাদের দাবি, অন্তত গ্যাসের বিল মওকুফ করে কিছুটা স্বস্তি দেওয়া হোক।

সরেজমিনে দেখা গেছে, গ্রিন রোড, মহাখালী, আজিমপুর, আদাবর, কামরাঙ্গীরচর, আরামবাগ, ফকিরাপুল, যাত্রাবাড়ী, মৌচাক, নাজিরাবাজার, মগবাজার, ধলপুর, কাঁঠালবাগান, মিরপুর, নয়াবাজার, কল্যাণপুর, মীরবাগ, মধুবাগ, নয়াটোলা, রামপুরা, বনশ্রী, ডেমরা, খিলগাঁও ও তেজগাঁওসহ রাজধানীর প্রায় সব এলাকাতেই একই চিত্র। দিনের বেলায় গ্যাস না থাকায় রান্না করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। কিছু সময় গ্যাস এলেও চাপ এত কম থাকে যে টিমটিম করে চুলা জ্বলে। বাধ্য হয়ে অনেক পরিবার গভীর রাতে কিংবা ভোরে রান্না করছেন। কেউ এলপিজি সিলিন্ডার, কেউ ইনডাকশন চুলা বা হিটার ব্যবহার করছেন। নিম্ন আয়ের মানুষের ভরসা হয়ে উঠেছে লাকড়ির চুলা।

সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে কর্মজীবী পরিবার

গ্যাস সংকটে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে কর্মজীবী পরিবার। সকালে সন্তানদের টিফিন তৈরি করতে পারছেন না অনেক অভিভাবক। আগের রাতে রান্না করে রাখতে হচ্ছে, আবার কেউ বাইরে থেকে খাবার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।

বনশ্রী, রামপুরা, বাড্ডা, মিরপুর ও উত্তরার বাসিন্দারা জানান, গত এক সপ্তাহে সংকট আরও ভয়াবহ হয়েছে।

বাড্ডার বাসিন্দা গৃহবধূ আঁখি আক্তার বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে আমাদের এলাকায় গ্যাসের তীব্র সংকট চলছে। রান্নার সময় প্রতিদিন বিপাকে পড়তে হচ্ছে। তাই বাধ্য হয়ে একটি ইনডাকশন চুলা কিনতে এসেছি।’

তিনি বলেন, ‘মাস শেষে ১ হাজার ৮০ টাকা গ্যাস বিল দিতে হয়, কিন্তু গ্যাস তো এক বেলাও ঠিকমতো পাচ্ছি না। অন্যদিকে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলও দিতে হচ্ছে। আমাদের আয় বাড়েনি, কিন্তু খরচ দিন দিন বাড়ছেই।’

মিরপুরের বাসিন্দা সাবিনা আক্তার বলেন, ‘সকালে রান্না করতে গিয়ে দেখি চুলায় গ্যাস নেই। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পরও না আসায় হিটারে রান্না করতে হয়েছে। প্রতিদিন এমন হলে বিদ্যুৎ বিলও বাড়বে।’

বনশ্রীর বাসিন্দা ফিরোজ আলম বলেন, ‘সারা দিনে দুই ঘণ্টাও ঠিকমতো গ্যাস পাওয়া যায় না। গ্যাসের চাপ এত কম যে পানিও গরম করা যায় না।’

মিরপুরের বাসিন্দা নুজহাত আক্তার বলেন, ‘সকালে নাশতা বানাতে পারিনি। বাচ্চাদের শুকনো খাবার দিয়ে স্কুলে পাঠাতে হয়েছে। এভাবে চললে খুব কষ্ট হয়ে যায়।’

চুলা জ্বলছে না, বিল থামছে না

গ্যাস না থাকলেও প্রতি মাসে পুরো বিল পরিশোধ করতে হওয়ায় গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। আবাসিক গ্রাহকদের প্রতি মাসে ১ হাজার ৮০ টাকা বিল দিতে হচ্ছে। বিল না দিলে অনেক জায়গায় সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ চান গ্রাহকরা।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, প্রিপেইড মিটারের গ্রাহকরা টাকা রিচার্জ করেও গ্যাস পাচ্ছেন না। আবার আবাসিক সংযোগের গ্রাহকদেরও মাস শেষে ১ হাজার ৮০ টাকা বিল দিতে হচ্ছে। গ্যাস ব্যবহার না করেও বিল পরিশোধকে তারা ‘জুলুম’ হিসেবে দেখছেন।

বাড্ডার বাসিন্দা রুবিনা ইয়াসমিন বলেন, ‘গ্যাসের সংকট হলেই পুরো সংসার এলোমেলো হয়ে যায়। হিটারে রান্না করতে সময় বেশি লাগে, বিদ্যুৎ খরচও বাড়ে। একদিকে গ্যাসের বিল, অন্যদিকে বাড়তি বিদ্যুৎ বিল—দুই দিক থেকেই আমরা চাপে আছি।’

বনশ্রীর বাসিন্দা ফিরোজ আলম জানান, বাসাবাড়িতে সারা দিনে দুই ঘণ্টাও ঠিকমতো গ্যাস পাওয়া যায় না। আর গ্যাসের চাপ এতটাই কম থাকে যে পানিও গরম করা যায় না। অথচ আমাদের নিয়মিত গ্যাসের বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে। এ সংকট নিরসনে অনতিবিলম্বে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষসহ প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।

সাধারণ গ্রাহকরা বলছেন, ‘বর্তমানে গ্যাসের এমন পরিস্থিতি বিগত কোনো সময়েই হয়নি। আমরা এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। গ্যাসের এই হাহাকার কবে মিটবে, নাকি আর মিটবে না—সরকার ও তিতাস কর্তৃপক্ষের তা পরিষ্কার করা উচিত।’

ভুক্তভোগীদের আশঙ্কা, এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যাবে।

সংকট আরও প্রকট

রাজধানীতে গ্যাসের চাপ দীর্ঘদিন ধরেই কম। তবে গত কয়েক দিনে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। শুধু বাসাবাড়ি নয়, শিল্পকারখানাতেও গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। একদিকে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে গৃহস্থালিতে রান্না নিয়েও তৈরি হয়েছে সংকট। গৃহস্থালির চুলা থেকে শুরু করে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পরিবহন খাত পর্যন্ত এর প্রভাব পড়েছে। এতে সার্বিক অর্থনীতি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

প্রাকৃতিক গ্যাসের ঘাটতির পাশাপাশি এলএনজি টার্মিনালের ত্রুটিও সংকটকে আরও বাড়িয়েছে। ফলে চাহিদার মাত্র ৫৬ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ করছে পেট্রোবাংলা।

গত সপ্তাহে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে আগুন লাগার পর সৃষ্ট যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে সেখান থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এর আগে এলএনজি থেকে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১০৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলেও বর্তমানে তা ৫০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে এসেছে। সব মিলিয়ে দেশে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ ২১৫ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমেছে, যা আগে ছিল প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট। অথচ দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গ্যাস সংকট স্বাভাবিক হতে এক থেকে দুই সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। তবে তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

/ইউএস/
সম্পর্কিত
গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির বিষয়ে যা বলছে পেট্রোবাংলা
‘লাইনে গ্যাস নেই, পাম্প বন্ধ’
পেট্রোবাংলা ঘেরাওয়ের হুঁশিয়ারি দিলেন নাহিদ ইসলাম  
সর্বশেষ খবর
পকেটে টান, তবু থামে না ছোট ছোট বিলাসিতা! কী এই ‘লিপস্টিক ইফেক্ট’?
পকেটে টান, তবু থামে না ছোট ছোট বিলাসিতা! কী এই ‘লিপস্টিক ইফেক্ট’?
পরিচালকের বুকে কাজলের ট্যাটু, বিপর্যস্ত নায়িকা
পরিচালকের বুকে কাজলের ট্যাটু, বিপর্যস্ত নায়িকা
মিছিলে ‘শিবির ধর’ স্লোগান দিয়েছে ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ ব্যক্তি, বলছে এনসিপি
মিছিলে ‘শিবির ধর’ স্লোগান দিয়েছে ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ ব্যক্তি, বলছে এনসিপি
হঠাৎ কেন ‘সর্বোচ্চ’ সতর্কতা জা‌রি করলো পুলিশ?
হঠাৎ কেন ‘সর্বোচ্চ’ সতর্কতা জা‌রি করলো পুলিশ?
সর্বাধিক পঠিত
‘এনসিপির সালাউদ্দিনকে গ্রেফতার না করলে আইন হাতে তুলে নেওয়া হতে পারে’
‘এনসিপির সালাউদ্দিনকে গ্রেফতার না করলে আইন হাতে তুলে নেওয়া হতে পারে’
এবার নাসীরুদ্দীনের সঙ্গে কথোপকথনের প্রমাণ দিলেন রাশেদ খাঁন
এবার নাসীরুদ্দীনের সঙ্গে কথোপকথনের প্রমাণ দিলেন রাশেদ খাঁন
রাজধানীতে ঘরে ঢুকে নারী চিকিৎসককে হত্যা
রাজধানীতে ঘরে ঢুকে নারী চিকিৎসককে হত্যা
পেট্রোবাংলা ঘেরাওয়ের হুঁশিয়ারি দিলেন নাহিদ ইসলাম  
পেট্রোবাংলা ঘেরাওয়ের হুঁশিয়ারি দিলেন নাহিদ ইসলাম  
অ্যাথোস সালমের ভবিষ্যদ্বাণীতে এবার নতুন যুদ্ধের সতর্কবার্তা
অ্যাথোস সালমের ভবিষ্যদ্বাণীতে এবার নতুন যুদ্ধের সতর্কবার্তা