গ্যাস সংকটের মধ্যেই এলপিজি’র দাম বৃদ্ধি, ভোক্তার মাথায় হাত

সাদ্দিফ অভি ও ইমরান আলী
০২ আগস্ট ২০২৬, ২৩:৫৪ আপডেট : ০২ আগস্ট ২০২৬, ২৩:৫৪

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় চলছে তীব্র গ্যাস সংকট। প্রাকৃতিক গ্যাসের বিকল্প ব্যবহারে চাপ পড়েছে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) ওপর। তবে রবিবার (২ আগস্ট) সেটির বেড়েছে দাম। এবার প্রতি কেজিতে বেড়েছে ৫ টাকা ৮৫ পয়সা। এতে বাজারে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বেড়েছে ৭০ টাকা। ফলে ১ হাজার ৫২৮ টাকা থেকে বেড়ে নতুন দাম হয়েছে ১ হাজার ৫৯৮ টাকা। কিন্তু তাতেও বিপত্তি , কারণ নির্ধারিত দামে কেউ সিলিন্ডারে কিনতে পারছেন না। প্রতিটি সিলিন্ডারের জন্য অতিরিক্ত ২০০-৩০০ টাকা খরচ করতে হয় বলে অভিযোগ ভোক্তাদের।

প্রতিদিন ভোর হতে না হতেই উধাও হয়ে যাচ্ছে লাইনের গ্যাস, যা ফিরছে গভীর রাতে। ফলে চরম বিপাকে পড়েছেন সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে গৃহিণী ও কর্মজীবীরা। রান্নাঘর এখন স্থবির, আর খাবারের জন্য বাড়ছে বিকল্প জ্বালানি বা রেস্তোরাঁর ওপর নির্ভরতা।

ভোক্তাদের মতে, তীব্র গ্যাস সংকটের মধ্যে ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে এসেছে এলপিজির দাম বৃদ্ধি। পাইপলাইনে গ্যাস না থাকায় বাসাবাড়িতে রান্নার একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠা এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে এমনিতেই অতিরিক্ত অর্থ খরচ করতে হয়। এই মুল্য বৃদ্ধি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম আরও বেড়ে যাবে বলে আশংকা করছেন গ্রাহকরা। 

দিনভর জ্বলছে না চুলা, চরম ভোগান্তি

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সকাল ৬টা বাজতেই গ্যাসের চাপ একবারে শূন্যে নেমে আসে। দুপুরের খাবারের সময়ও গ্যাসের দেখা মেলে না। কোনও কোনও এলাকায় হালকা মিটমিট করে শিখা জ্বললেও তাতে পানি গরম করতেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায়। ফলে সকালে টিফিন বা সন্তানদের স্কুলের টিফিন তৈরি করা একপ্রকার অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

মিরপুরের এক গৃহিণী সাদেকা আক্তার বলেন, “সকালে উঠে দেখি লাইনে গ্যাস নেই। মাঝেমধ্যে রাত ১২টার পর সামান্য গ্যাস আসে, তখন ঘুম ভেঙে রান্না করতে হয়। নিয়মিত এভাবে চলায় পরিবারের সবার শারীরিক ও মানসিক কষ্ট বাড়ছে।”

রাজধানীর কল্যাণপুরের বাসিন্দা সেলিনা আহমেদ বলেন, “বাসায় তিতাসের গ্যাস থাকে নাই বললেই চলে। বাধ্য হয়ে এলপিজি ব্যবহার করি। সরকার দাম বেঁধে দেয়, সেই দামে তো এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়া যায় না। এখন ৭০ টাকা ১২ কেজি সিলিন্ডারে যদি বাড়ে এটা কিনতে অন্তত আরও ২০০-৩০০ টাকা অতিরিক্ত খরচ করা লাগবে। গ্যাস সংকটের সুযোগে আমাদের জিম্মি করা হচ্ছে।”

গ্যাসের এই অনিশ্চয়তায় বাধ্য হয়ে অনেকে ঝুঁকছেন এলপিজি গ্যাসে (সিলিন্ডার), কেরোসিনের স্টোভ কিংবা ইলেকট্রিক ইনডাকশন কুকারে। তবে হঠাৎ করে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। একদিকে মাস শেষে ডাবল বার্নারের নির্ধারিত গ্যাস বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে, অপরদিকে এলপিজি কিংবা অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল মেটাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে সাধারণ মানুষ।

হোটেল ও রেস্তোরাঁয় বাড়ছে মানুষ

বাসায় রান্না না হওয়ায় দুপুরের ও সন্ধ্যার খাবারের জন্য মানুষ ছুটছেন স্থানীয় হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলোতে। সেখানেও অতিরিক্ত চাহিদার কারণে খাবারের দাম বৃদ্ধির অভিযোগ উঠেছে। পাড়া-মহল্লার বেকারি ও খাবারের দোকানগুলোতেও আগের চেয়ে বিক্রি বেড়েছে কয়েক গুণ।

মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা মুনতাসির আহমেদ বলেন, “গ্যাসের বিল দেই প্রতি মাসে, কিন্তু গ্যাস পাই না। মনে হচ্ছে প্রতি মাসে এই টাকা পানিতে ফেলছি। এর মধ্যে এলপিজি’র দাম বাড়াল, সেখানেও অতিরিক্ত টাকা খরচ হচ্ছে। খরচ সামলানো মুশকিল হয়ে যাচ্ছে।  ”

প্রসঙ্গত, রাজধানীতে গ্যাসের সংকট দীর্ঘদিনের। গ্যাসের চাপ বরাবরই কম থাকে। তবে গত কয়েক দিন ধরে গ্যাস সংকট প্রবল আকার ধারণ করেছে। বাসায় তো নেই-ই, শিল্পকারখানাতেও গ্যাসের সংকট। একদিকে কাজ বন্ধ, অন্যদিকে রান্নার যুদ্ধ। গৃহস্থালির চুলা থেকে শুরু করে বিশাল শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং পরিবহন খাত পর্যন্ত এই সংকটের ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করেছে—যা সার্বিক অর্থনীতিকে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। প্রাকৃতিক গ্যাসের ঘাটতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এলএনজি টার্মিনালের ত্রুটি। এতে চাহিদার মাত্র ৫৬ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ করছে পেট্রোবাংলা।

গত সপ্তাহে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে আগুনের পর সৃষ্ট যান্ত্রিক ত্রুটিতে সেখান থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। এর আগে এলএনজি থেকে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১০৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলেও বর্তমানে তা ৫০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে এসেছে। সব মিলিয়ে দেশে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ কমে ২১৫ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমেছে, যা আগে ছিল প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট। অথচ দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। সরকারি তথ্য অনুযায়ী গ্যাস সংকট স্বাভাবিক হতে এক থেকে দুই সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। তবে তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। এই সপ্তাহে গ্যাসের পরিস্থিতি কিছুটা পরিবর্তন হওয়ার কথা থাকলেও তেমন কোনও উন্নতি দেখা যাচ্ছে না।

 

/এম/
সম্পর্কিত
সামিটের এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ: বিদ্যুৎ উৎপাদন কতটা কমলো?
২০৩১ সালের মধ্যে ১৫০ কূপ খনন ও ওয়ার্কওভারের পরিকল্পনা
নির্ধারিত দামে মিলছে না এলপিজি: বাজারে গেলে সিলিন্ডারপ্রতি দিতে হয় ৫০০ টাকা বেশি
সর্বশেষ খবর
প্রাথমিকের ছাত্রীকে যৌন হয়রানি, সেই শিক্ষককে বরখাস্ত
প্রাথমিকের ছাত্রীকে যৌন হয়রানি, সেই শিক্ষককে বরখাস্ত
‘ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ড’ সিরিজের পর্দার আড়ালের অজানা কাহিনি
‘ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ড’ সিরিজের পর্দার আড়ালের অজানা কাহিনি
বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায় আজ ৪ নম্বরে ঢাকা, শীর্ষে এখনও লাহোর
বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায় আজ ৪ নম্বরে ঢাকা, শীর্ষে এখনও লাহোর
৬২ হাজার টন কয়লা নিয়ে পায়রা বন্দরে সিঙ্গাপুরের জাহাজ
৬২ হাজার টন কয়লা নিয়ে পায়রা বন্দরে সিঙ্গাপুরের জাহাজ
সর্বাধিক পঠিত
নতুন দায়িত্বে ইশরাক হোসেন
নতুন দায়িত্বে ইশরাক হোসেন
আগস্টের পর একের পর এক পদোন্নতি, এবার ডিআইজি হলেন আশরাফ আলী
আগস্টের পর একের পর এক পদোন্নতি, এবার ডিআইজি হলেন আশরাফ আলী
বাংলাদেশের এমপির বড় ভাই জিতলেন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে, এলাকায় আনন্দ
বাংলাদেশের এমপির বড় ভাই জিতলেন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে, এলাকায় আনন্দ
‘আমেরিকানরা বিরক্ত হলে ইসরায়েলে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী হবো’: ট্রাম্প
‘আমেরিকানরা বিরক্ত হলে ইসরায়েলে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী হবো’: ট্রাম্প
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে ‘হাদিসের’ সঙ্গে তুলনা করা সেই কর্মকর্তা পদ হারালেন
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে ‘হাদিসের’ সঙ্গে তুলনা করা সেই কর্মকর্তা পদ হারালেন