দেশে এলএনজি সরবরাহ শুরু হলেও গ্যাসের সংকট কাটছে না। জাতীয় গ্রিডে বর্তমানে দেশীয় গ্যাসের পাশাপাশি এক্সিলারেট ও সামিটের দুই টার্মিনাল থেকে এলএনজি সরবরাহ করা হলেও চাহিদার তুলনায় ঘাটতি থাকছে গড়ে প্রায় ১ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে বাসাবাড়ি, সিএনজি পাম্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের সংকট এখনও কাটেনি। আগামী দিনগুলোতে নতুন এলএনজি কার্গো সময়মতো না এলে এই সংকট আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পেট্রোবাংলা জানায়, সোমবার সন্ধ্যা ৬টায় জাতীয় গ্রিডে মোট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে ২ হাজার ২৫৭ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় উৎপাদন ১ হাজার ৬২৯ মিলিয়ন ঘনফুট। আর এক্সিলারেট ও সামিটের দুই টার্মিনাল থেকে এলএনজি আসছে ৬৩১ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এলএনজি সরবরাহ বাড়লেও চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সংকট পুরোপুরি কাটতে আরও সময় লাগতে পারে। পাশাপাশি নতুন কার্গো সরবরাহে সমস্যা হলে পরিস্থিতি আবারও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
টার্মিনাল চালাতে কমানো হচ্ছে এলএনজি সরবরাহ
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা আমাদের যথাসাধ্য চেষ্টা করছি। আগামী ২০ আগস্ট একটি কার্গো আসার কথা রয়েছে।’
এলএনজি সংকটের মধ্যে এক্সিলারেটের এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যেতে পারে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, টার্মিনাল বন্ধ হবে না। বরং এলএনজি টার্মিনাল থেকে এলএনজি সরবরাহ কমিয়ে চালানো হচ্ছে, যাতে করে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি না হয়।
এলএনজি পরিস্থিতি
জানা যায়, সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে অর্ডার করা চার কার্গোর একটিও এখনো দেশে পৌঁছায়নি। এর মধ্যে হংকংভিত্তিক ঝেনইউ শিপিং কোম্পানির সরবরাহ করার কথা থাকা একটি জাহাজ যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকায় সেটি গ্রহণে রাজি হয়নি সরকার। অন্য তিন কার্গোর সরবরাহের সময়ও এখনো নিশ্চিত নয়। এমনকি সরবরাহকারীরা সময় বাড়িয়ে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নেওয়ার আবেদন করতে পারে বলে জানা গেছে।
এদিকে পেট্রোবাংলা জানায়, আগস্টে আগে নির্ধারিত ৯ কার্গোর মধ্যে চারটি দেশে পৌঁছালেও বাকি কার্গোগুলো নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। সংকট মোকাবিলায় সোমবার সরকার নতুন করে পাঁচ কার্গো কেনার উদ্যোগ নেয়। এর মধ্যে মঙ্গলবার দুই কার্গো কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অনুমোদিত একটি কার্গো ২৩-২৪ আগস্ট দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
অন্যদিকে সৌদি আরামকোর সরবরাহ করা ‘আলহামরা’ নামের একটি এলএনজিবাহী জাহাজ প্রয়োজনীয় কারিগরি ও নিরাপত্তা মানদণ্ড পূরণ না করায় পেট্রোবাংলা সেটি গ্রহণ করেনি। এর পরিবর্তে বিকল্প কার্গো পাঠানোর কথা জানিয়েছে আরামকো।
ভোগান্তি কমেনি
এলএনজি সরবরাহ বাড়লেও দেশে গ্যাসের ভোগান্তি কমেনি। বাসাবাড়িতে আগের মতোই দিনে গ্যাসের দেখা পাওয়া যাচ্ছে না। একই সঙ্গে সিএনজি পাম্পগুলোতেও গ্যাসের চাপ কম।
বাসায় গ্যাস না থাকায় অনেক এলাকার মানুষ হোটেল-রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার কিনে খাচ্ছেন। গৃহিণীরা গ্যাসের অপেক্ষায় বসে থাকছেন। কোথাও একেবারেই গ্যাস আসে না, আবার কোথাও কোথাও সন্ধ্যায় অল্প চাপে গ্যাস পাওয়া যায়।
মধ্য বনশ্রীর বাসিন্দা পলি বেগম বলেন, ‘সকালে উঠে দেখি গ্যাস নাই। দোকান থেকে নাস্তা কিনে এনে দিনের কাজ শুরু করি। এরপর বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে রাইসকুকারে রান্না করি।’
একই ধরনের ভোগান্তির কথা জানান উলনের বাসিন্দা কাজী মিলি। তিনি বলেন, ‘সারাদিন গ্যাস থাকে না। রাতের দিকে অল্প চাপে গ্যাস আসে। আমরা অপেক্ষা করি। সে সময় কোনোমতে দুই-একটা তরকারি করে পরের দিনটা চালাই। এইভাবেই চলছে আমাদের দিন।’
এদিকে গ্যাসের সংকটে সিএনজি চালকরাও বাড়তি ভোগান্তিতে পড়েছেন। শান্তিনগর থেকে পান্থপথের যাত্রীকে দেড়শ টাকার ভাড়ার পরিবর্তে ৩০০ টাকা ভাড়া চান সিএনজি চালক রফিক মোল্লা।
দ্বিগুণ ভাড়া চাওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সারাদিন পাম্পে পাম্পে ঘুরে গ্যাস পাই না। অনেক কষ্ট করে গ্যাস নিসি। এখন গেলে চলেন, না গেলে যাত্রীর অভাব নাই। উলটা গ্যাসের কারণে রাস্তায় সিএনজি কম।’
বিদ্যুৎ উৎপাদনেও প্রভাব
গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। পিডিবির এক কর্মকর্তা জানান, পিক আওয়ারে গ্যাসের চাহিদা প্রায় ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে গড়ে ৯৩০ থেকে ৯৪০ মিলিয়ন ঘনফুট।
এদিকে গতকাল সোমবারের হিসাবে গ্যাস ঘাটতির কারণে ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়নি। এদিন বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৯৩০ মেগাওয়াট।
প্রসঙ্গত, বিদ্যুতের বড় একটি অংশ গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র থেকে উৎপাদন করা হয়। এর বাইরে কয়লার কারণে ২২৩ মেগাওয়াট এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেরামত ও সংরক্ষণের কারণে আরও ১ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম উৎপাদন হয়েছে।
সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ার শঙ্কা
এমন পরিস্থিতিতে গ্যাস সংকট আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম।
তিনি বলেন, ‘আমরা এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রে বারবার বলে আসছিলাম। এই আমদানিনির্ভরতা আমাদের জন্য ক্ষতিকর হবে। দেশীয় গ্যাস উত্তোলনে মনোযোগ হওয়া প্রয়োজন।’
তিনি বলেন, ‘এখন আমদানিনির্ভর হওয়ার পর যদি এলএনজি আনায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, সেটা খুবই আশঙ্কার বিষয়। এমনিতেই গ্যাসের জন্য সারাদেশে হাহাকার। এই অবস্থা চলতে থাকলে সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ার শঙ্কা বাড়বে। সরকারের উচিত দ্রুত এই সমস্যার সমাধান করা। পাশাপাশি বিকল্প চিন্তাও করতে হবে।’









