চুলা জ্বলে না, ডিম-পরোটার দোকানে ভিড়

ইমরান আলী
১৮ আগস্ট ২০২৬, ১৯:২৮আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০২৬, ১৯:২৮

রাজধানীজুড়ে তীব্র গ্যাস সংকটে বাসাবাড়িতে চুলা জ্বলছে না। বাধ্য হয়ে অনেকে ইলেকট্রিক ও লাকড়ির চুলায় রান্না করছেন। আবার সকালের নাস্তার জন্য অনেকেই হোটেলনির্ভর হয়ে পড়েছেন। এতে বাড়ছে খাবারের খরচ, পাশাপাশি স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টায় রাজধানীর বনশ্রীর এফ ব্লকের একটি হোটেলে গিয়ে দেখা যায়, সকালের নাস্তার জন্য ভিড়। কেউ খাচ্ছেন, কেউ পার্সেল নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন। কথা হয় বেশ কয়েকজনের সঙ্গে।

হোটেলে নাস্তার অপেক্ষায় থাকা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সেলিম বলেন, ‘গ্যাসের অভাবে গত দুই সপ্তাহ ধরে সকালের খাওয়া-দাওয়া হোটেলেই হচ্ছে। এরপর ইলেকট্রিক চুলায় রান্না করে দুপুর ও রাতের খাবার সারছি। এভাবে হোটেলে খাবারের অভ্যাস না থাকলেও এখন বাধ্য হয়ে হোটেলে খেতে হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘বর্তমানে গ্যাসের যা অবস্থা, তাতে বিকল্প উপায় ছাড়া কোনো উপায় নেই। গ্যাসে কোনো প্রকার রান্নাই করা যায় না। যে কারণে আমরা সকালে হোটেলের ওপর নির্ভরশীল। এতে যেমন খরচ বাড়ছে, তেমন পেটেরও নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।’

হোটেলে খেতে আসা আব্দুল্লাহ বলেন, ‘সকালে বাসায় নাস্তা হতো। কিন্তু এখন আর হয় না। কারণ বাসায় গ্যাস নেই। আমরা ইলেকট্রিক চুলায় রান্না করছি। কিন্তু সকালে ইলেকট্রিক চুলায় রান্না করতেও অনীহা আছে। বাধ্য হয়ে এখন হোটেলে আসছি।’

আকবর জানান, তিনি ও তাঁর স্ত্রী দুজনই চাকরি করেন। আগে সকালে উঠে রান্না করে খেয়ে আবার দুপুরের খাবার সঙ্গে নিয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু এখন আর সেটি হয় না। গ্যাস সংকটের কারণে চুলা একেবারেই জ্বলে না। এ কারণে সকালে হোটেল থেকে নাস্তা নিয়ে তা খেয়ে অফিসে যান। আর রাতে এসে বাসায় ইলেকট্রিক চুলায় রান্না হয়।

তিনি বলেন, ‘এতে করে আমাদের এখন খরচও বেড়েছে। চারটি পরোটা, ডিম, সঙ্গে ডাল ভাজি নিলে ১২০ টাকা খরচ। আর সঙ্গে অন্য কিছু নিলে ২০০ টাকার মতো হয়ে যায়। এর পাশাপাশি স্বাস্থ্যসম্মত কি না, সেটাও দেখার বিষয়। অথচ বাসায় সবকিছু স্বাস্থ্যসম্মত হতো। খরচও কম হতো। মানুষ এখন উভয় সংকটে পড়েছে।’

বনশ্রীর এক হোটেলে সকালে ভিড়। ছবি: বাংলা ট্রিবিউন

হোটেলে আসা মঞ্জুর রহমান বলেন, ‘আমার বাসায় স্বামী, স্ত্রী, সন্তানসহ মোট পাঁচজন। গত প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে সকালে আমরা বাসায় রান্না করা নাস্তা খেতে পারি না। হোটেলে নিয়মিত খেতে পেটেরও সমস্যা হচ্ছে। আর বাচ্চারাও খেতে চায় না। কিন্তু কোনো উপায় নেই।’

তিনি বলেন, ‘গ্যাসের এই সংকট নিয়ে সরকারও কোনো কথা বলে না। আমরা আর কতদিন এই ভোগান্তিতে থাকবো?’

শুধু বনশ্রী নয়, রাজধানীজুড়েই একই অবস্থা। গ্যাসের তীব্র সংকটে বাসাবাড়িতে গ্যাসের চুলা জ্বলছে না। বিকল্প উপায়ে রান্না করছেন গৃহিণীরা। সকালের নাস্তার জন্য হোটেলনির্ভর হয়ে পড়েছেন অনেকে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজধানীর বাড্ডা, রামপুরা, মালিবাগ, খিলগাঁও, ধানমন্ডি, মিরপুর, উত্তরাসহ সব এলাকায় তিতাস গ্যাস ব্যবহারকারীদের ভয়াবহ সংকট চলছে। যারা সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করেন, তারা এ সংকটের বাইরে রয়েছেন। অনেকেই বিকল্প হিসেবে ইলেকট্রিক চুলা ব্যবহার করছেন। আবার নিম্ন আয়ের মানুষ লাকড়ির চুলা ব্যবহার করছেন।

বনশ্রীর গৃহবধূ আসমা খানম বলেন, ‘আমরা এখন গ্যাসের বিকল্প হিসেবে ইলেকট্রিক চুলা ব্যবহার করি। গ্যাস টোটালি বন্ধ রয়েছে। বারবার ফায়ার মারলেও গ্যাস পাওয়া যায় না। গত এক মাসের বেশি সময় ধরে এই দুর্ভোগ রয়েছে। এখন এমন একটা অবস্থা, গ্যাসই নেই হয়ে গেছে।’

রামপুরার গৃহবধূ সেলিনা আকতার বলেন, ‘গ্যাসই জ্বলে না, কী আর রান্না করবো। আগে রাতে একটু করে আসতো। কিন্তু এখন রাত-দিন সমান হয়ে গেছে। ইলেকট্রিক চুলা ছাড়া আর রান্না করা যাচ্ছে না।’

সকালে নাস্তা সারতে হচ্ছে হোটেলেই। ছবি: বাংলা ট্রিবিউন

বাড্ডার গৃহবধূ আরিফা আক্তার বলেন, ‘লাকড়ির চুলা ব্যবহার করছি আমরা। গ্যাস না থাকায় এভাবে রান্না করতে হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের মতো গরিব মানুষ ইলেকট্রিক চুলা কিনতে পারে না। তারা এখন এভাবেই রান্না করছে।’

বনশ্রী এলাকার ‘মেহরিন হোটেল’-এর ম্যানেজার আবু বকর বলেন, ‘সকালে আগের চেয়ে একটু চাপ বেড়েছে।’

পাশের ‘পিঠামেলা’ রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আগের চেয়ে সকালে লোকজন বেশি হচ্ছে। বেচাকেনাও ভালো।’

কেন সকালে ভিড় বেড়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে গ্যাস সংকট। বাসাবাড়িতে অনেকেই নাস্তা বানাতে পারছেন না। তাই অনেকেই হোটেল-রেস্তোরাঁমুখী।’

ঘরোয়া রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার সুমন বলেন, ‘আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে সকালে আমাদের কাস্টমার বেশি। বর্তমান গ্যাস সংকটের কারণে সকালে অনেকে ঝামেলা করে নাস্তা বানাতে চান না। তারাই হোটেলমুখী হয়েছেন।’

প্রসঙ্গত, গ্যাস সংকটের অন্যতম বড় কারণ মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউতে (ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট) কারিগরি সমস্যা এবং বৈরী আবহাওয়া। দুটি এফএসআরইউয়ের ওপর দেশের এলএনজি সরবরাহ নির্ভরশীল। সাম্প্রতিক সময়ে একটি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির পর সরবরাহ কমে যায়। পরে গতকাল বিকাল থেকে বৈরী আবহাওয়ার কারণে অন্য টার্মিনালও স্বাভাবিকভাবে এলএনজি সরবরাহ করতে পারছে না। এতে গ্যাস সংকট আরও চরম আকার ধারণ করেছে।

/ইউএস/
সম্পর্কিত
প্রথম দিনেই পিংক বাসকে বলাকার ধাক্কা
‘মাস্টার্স পাস করে গাড়ি চালাবো, এ নিয়ে কত প্রশ্ন!’
সংকট কাটাতে ভারত থেকে জ্বালানি? নুর বললেন, ‘সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে নয়’
সর্বশেষ খবর
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতীয় ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের সাক্ষাৎ
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতীয় ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের সাক্ষাৎ
চলন্ত ট্রেন থেকে তেল চুরি, ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে রেলওয়ের লোকজনও জড়িত
চলন্ত ট্রেন থেকে তেল চুরি, ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে রেলওয়ের লোকজনও জড়িত
দীর্ঘ অচলাবস্থার অবসান: শুরু হচ্ছে হকি লিগ
দীর্ঘ অচলাবস্থার অবসান: শুরু হচ্ছে হকি লিগ
রোইংকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে নতুন রোডম্যাপ
রোইংকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে নতুন রোডম্যাপ
সর্বাধিক পঠিত
মৃত্যুদণ্ডে ফাঁসির বদলে ইনজেকশনের আবেদন, সুপ্রিম কোর্টের ‘না’
মৃত্যুদণ্ডে ফাঁসির বদলে ইনজেকশনের আবেদন, সুপ্রিম কোর্টের ‘না’
ব্যাংকের বাইরে টাকা জমানোর নতুন সুযোগ, ১০ শতাংশ বরাদ্দ শুধু ব্যক্তিদের 
ব্যাংকের বাইরে টাকা জমানোর নতুন সুযোগ, ১০ শতাংশ বরাদ্দ শুধু ব্যক্তিদের 
ঢাকায় এসে ক্যানিজিয়া বললেন, পেলে-ম্যারাডোনা-মেসি তিন জনই সর্বকালের সেরা  
ঢাকায় এসে ক্যানিজিয়া বললেন, পেলে-ম্যারাডোনা-মেসি তিন জনই সর্বকালের সেরা  
প্রেম নাকি পরিবারের পছন্দে বিয়ে—কোনটিতে ভালোবাসা বেশি? গবেষণায় চমকপ্রদ তথ্য
প্রেম নাকি পরিবারের পছন্দে বিয়ে—কোনটিতে ভালোবাসা বেশি? গবেষণায় চমকপ্রদ তথ্য
চার দেশের বাংলাদেশি প্রবাসীদের সতর্ক করলো দূতাবাস 
চার দেশের বাংলাদেশি প্রবাসীদের সতর্ক করলো দূতাবাস