সৌরবিদ্যুতের দিকে ঝুঁকছে বাংলাদেশ, বাধা কোথায়?

সঞ্চিতা সীতু
১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:০০আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:০০

বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর চাপ কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার। ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তত ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ২০৩০ সালের মধ্যে সৌর বিদ্যুৎ থেকে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগ এ লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে। তবে সৌর বিদ্যুতের বড় সমস্যা হচ্ছে; প্ল্যান্ট বসানোর জন্য প্রয়োজনীয় জমির সংকট। জমির সংস্থান করা না গেলে সব লক্ষ্যমাত্রাই পিছিয়ে যাবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

প্রসঙ্গত, গত ১০ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘এতদিন বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর উৎস থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের গ্রাহক ছিল। বর্তমান সরকারের সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশ শুধু গ্রাহক থাকবে না, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদক হবে।’ জ্বালানি সংকটের এই চরম মুহূর্তে কীভাবে কতদিনে আসলে বাংলাদেশ সেই সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদক হয়ে উঠতে পারবে, সে প্রশ্নই সামনে এসেছে এখন।

সম্প্রতি সংসদে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ ইসলাম অমিত বলেছেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও শিল্পায়নের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ২৪ হাজার থেকে ২৫ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে। এই চাহিদা বিবেচনায় আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, ২০৩০ সাল পর্যন্ত নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ খাতে বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌর বিদ্যুৎ থেকে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট, ভূমিভিত্তিক সৌর বিদ্যুৎ থেকে ৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট এবং বায়ু, বর্জ্য, পানি বিদ্যুৎ, ভাসমান সৌর ও এগ্রিভোলটাইকসহ অন্যান্য প্রযুক্তি থেকে ৪৫০ থেকে ৫৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে।

রুফটপ থেকে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ কিনবে সরকার

টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে ব্যাটারিসহ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনে বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বর্তমান বাজারদর এবং বিদ্যুৎ বিভাগ কর্তৃক প্রাপ্ত বিভিন্ন দরপত্রের মূল্য বিবেচনায় ব্যাটারিসহ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় প্রতি ইউনিট সর্বোচ্চ ৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষ প্রণোদনার অংশ হিসেবে এই উৎপাদন ব্যয়ের ওপর ২০ শতাংশ মুনাফা ও ১১ দশমিক ২৫ শতাংশ প্রিমিয়াম যুক্ত করে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য ১০ টাকা ৫০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। কোনও গ্রাহক নির্ধারিত ব্যয়ের চেয়ে কম খরচে এ ধরনের সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করতে সক্ষম হলে সাশ্রয়কৃত অর্থ তার লভ্যাংশ হিসেবে বিবেচিত হবে।

নেট মিটারিং নির্দেশিকা, ২০২৫ অনুযায়ী, যেসব গ্রাহক ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭ তারিখের মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করে নিজস্ব ব্যবহারের পর উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করবেন, তারা পরবর্তী তিন বছর অর্থাৎ ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০৩০ পর্যন্ত জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য ১০ টাকা ৫০ পয়সা হারে মূল্য পাবেন। তবে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭-এর পর স্থাপিত সিস্টেমের ক্ষেত্রে এই প্রণোদনা প্রযোজ্য হবে না।

সৌরবিদ্যুতের বড় প্রকল্প

৪৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প রামপালে স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদ্যুকেন্দ্রের পাশের ব্লক ‘বি’তে ৬৮৫ একর জমিতে এই কেন্দ্রটি স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে পিডিবি। ২ হাজার ১২৭ কোটি টাকা বিদ্যুৎ খাত উন্নয়ন তহবিল এবং ৩৭৫ কোটি টাকা পিডিবি তাদের নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় করে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৯ সালের মধ্যে কেন্দ্রটি উৎপাদনে আনতে চায় তারা। পাশাপাশি মাতারবাড়ী কোল পাওয়ার প্রকল্পের অ্যাশ পন্ডের জায়গায় ৭০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। বর্মমানে প্রকল্পটির ফিজিবিলিটি স্টাডি এবং পরামর্শক নিয়োগের কাজ শেষ হয়েছে। এতে অর্থায়ন করছে বিশ্বব্যাংক। তবে কবে নাগাদ এটি উৎপাদনে আসবে, তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।

সংসদে সৌরবিদ্যুৎ

এমনকি জাতীয় সংসদের সব কার্যক্রমে ন্যাশনাল গ্রিড থেকে কোনও বিদ্যুৎ না নিয়ে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে চায় সরকার। এ বিষয়ে সংসদে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা আগামী দিনে এই জাতীয় সংসদের সব কার্যক্রমে ন্যাশনাল গ্রিড থেকে কোনও বিদ্যুৎ গ্রহণ করবো না। সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা এই প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে চাই।’

নতুন উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ

সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প সম্প্রসারণের ফলে একদিকে জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় হওয়া বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে, অপরদিকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করতে সরকার নতুন উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করছে। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘তরুণ ও যুব সমাজের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টির দায়িত্ব সরকারের রয়েছে। এজন্য সৌরবিদ্যুৎ খাতের উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। এতে তারা উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে সৌরবিদ্যুৎ খাতে এগিয়ে আসতে পারবেন।’

বড় বাধা জমি

বিদ্যুৎ বিভাগ জানায়, বিনিয়োগকারীদের নিজেদের জমি কিনতে হলে প্রকল্পের বিনিয়োগ ও বিদ্যুতের দাম দুটোই বাড়বে। তাই সৌরবিদ্যুতের বড় প্রকল্পের জন্য পিপিপি পদ্ধতিতে সরকার জমি দেবে।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদফতর তাদের পতিত জমির তালিকা জমা দিয়েছে। সব মন্ত্রণালয় মিলে প্রায় ৬০ হাজার একর জমির প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে যাচাই-বাছাই করে প্রায় ৩০০ একর জমি চিহ্নিত করা হয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে জানান, সরকার জমি দেবে এবং বিনিয়োগকারীরা সেখানে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি নিয়ে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবেন। জমি নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিতরণ ও সঞ্চালন লাইনের সক্ষমতাও বিবেচনা করা হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, এক মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে আড়াই থেকে তিন একর জমি প্রয়োজন হয়। তবে জমির বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করে বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআরইএ) সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জমির সংকটের কারণে নয়, ভালো ধারণা ও নীতিগত সমস্যার কারণে জ্বালানি রূপান্তর পিছিয়ে যাচ্ছে।’ জমি ছাড়াও সরকারের প্রকল্পগুলো এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে আন্তরিকতাও জরুরি বলে তিনি জানান।

তিনি আরও বলেন, ‘এক শ্রেণির ব্যবসায়ী চান না সৌরবিদ্যুতের প্রসার ঘটুক এদেশে। দেশের ঘরে ঘরে সৌরবিদ্যুৎ চলে গেলে সেটা তাদের জন্য লাভজনক হবে না বলেই, তারা এটা চান না। আগের সরকারগুলো সৌরবিদ্যুতের প্রসারে নানা কথা বললেও বাস্তবে কোনও কাজ এগোতে পারেনি। বর্তমান সরকার আবার নতুন করে উদ্যোগ নিচ্ছে।’ সংকট কাটাতে সৌরবিদ্যুৎ বেশ ভালো ভূমিকা রাখতে পারবে বলে তিনি অভিমত দেন।

/এপিএইচ/ইউএস/
সম্পর্কিত
১৩ ঘণ্টা ধরে হাসপাতালে বিদ্যুৎ নেই, টর্চলাইটের আলোতে চলছে চিকিৎসা
‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি, এখনই’ প্রচারাভিযানের উদ্বোধন
গ্যাসের ঘাটতিতে পরিবহন সংকট, ভাড়াও বেশি
সর্বশেষ খবর
কারিপাতা-দইয়ে মুচমুচে চিংড়ি
কারিপাতা-দইয়ে মুচমুচে চিংড়ি
আর্জেন্টিনা দলে চমকের ইঙ্গিত
আর্জেন্টিনা দলে চমকের ইঙ্গিত
সার না পেয়ে ক্ষোভ বাড়ছে কৃষকদের, বাস্তবে মাঠের তথ্য জানে না কৃষি বিভাগ
সার না পেয়ে ক্ষোভ বাড়ছে কৃষকদের, বাস্তবে মাঠের তথ্য জানে না কৃষি বিভাগ
ইউকে-ইউরোপ ট্যুরে চার্লি এক্সসিএক্স
ইউকে-ইউরোপ ট্যুরে চার্লি এক্সসিএক্স
সর্বাধিক পঠিত
একসঙ্গে ঝিনুক-কোরাল চাষে সফলতা, অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা
একসঙ্গে ঝিনুক-কোরাল চাষে সফলতা, অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা
আমাকে সবসময় টাকা কামানোর মেশিন হিসেবে ব্যবহার করেছে: পপি
আমাকে সবসময় টাকা কামানোর মেশিন হিসেবে ব্যবহার করেছে: পপি
গ্রেফতারের পর ৬৩ বিদেশি নাগরিক যার কথা বলেছেন, এবার সেই কর্মকর্তা গ্রেফতার
গ্রেফতারের পর ৬৩ বিদেশি নাগরিক যার কথা বলেছেন, এবার সেই কর্মকর্তা গ্রেফতার
পে-স্কেল ঘোষণা হলেও গেজেট প্রকাশে দেরি কেন
পে-স্কেল ঘোষণা হলেও গেজেট প্রকাশে দেরি কেন
স্বর্ণের দাম বাড়লো, ভরি কত 
স্বর্ণের দাম বাড়লো, ভরি কত