বাংলাদেশের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্র, চীনের পর এবার রাশিয়ার একটি কোম্পানির আগ্রহ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি দেশে এলএনজি সরবরাহ করছে। সম্প্রতি চীনের একটি কোম্পানির সঙ্গে আরও একটি এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের বিষয়ে বাংলাদেশের চুক্তি হয়েছে। এরপর রাশিয়ার একটি কোম্পানিও বাংলাদেশে এলএনজি নিয়ে প্রস্তাব দিয়েছে।
এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি সংকট কাটাতে নতুন প্রকল্প নিতেই হবে। তবে প্রকল্প নেওয়ার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সুবিধার পাশাপাশি দেশের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থও বিবেচনা করতে হবে।
প্রসঙ্গত, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়ায় দেশে জ্বালানির চাহিদা পূরণে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। বর্তমানে প্রতি মাসে প্রায় ১০ কার্গো এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে। প্রতিটি কার্গো আমদানিতে খরচ হচ্ছে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা। সে হিসাবে মাসে এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। ভবিষ্যতে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন আরও কমে গেলে আমদানির পরিমাণ বাড়াতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মহেশখালীতে যা আছে
মহেশখালীতে বর্তমানে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল রয়েছে। এর একটি যুক্তরাষ্ট্রের এক্সিলারেট এনার্জির এবং অন্যটি দেশীয় উদ্যোক্তা সামিট পাওয়ারের। দুটি টার্মিনালই পরিচালনা করে এক্সিলারেট এনার্জি। এসব টার্মিনাল থেকে সর্বোচ্চ ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাইপলাইনে সরবরাহ করা যায়। শনিবার এই দুই টার্মিনাল থেকে মোট ৯৯৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় গানভরের সরবরাহ করা প্রথম এলএনজি কার্গো ১৭ সেপ্টেম্বর দেশে এসেছে। সামিট টার্মিনালে নোঙর করা কার্গোটি থেকে সেদিন বিকালেই এলএনজি খালাস শুরু হয়। এই কার্গোতে ১ লাখ ৪২ হাজার ৪০০ ঘনমিটার এলএনজি রয়েছে। এর আগে ১৪ সেপ্টেম্বরও একটি এলএনজি কার্গো দেশে আসে। পরপর দুটি কার্গো আসায় গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতিতে কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলে পেট্রোবাংলা সূত্র জানিয়েছে।
চীনের কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি
মহেশখালীতে দৈনিক ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ সক্ষমতার একটি ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণে চীনা কোম্পানি চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানির (সিএনইই) সঙ্গে সরকারের চুক্তি হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।
গত ৮ সেপ্টেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, সংকট মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে আরও একটি এফএসআরইউ আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং এ বিষয়ে চীনের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য দেড় বছরের মধ্যে সেটি পাওয়া।
শুধু এফএসআরইউ আনলেই সমস্যার সমাধান হবে না। সেখান থেকে গ্যাস জাতীয় গ্রিডে নিতে প্রয়োজনীয় সঞ্চালন পাইপলাইনও নির্মাণ করতে হবে। ফলে পুরো অবকাঠামো একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। তিনি বলেন, দ্রুত এফএসআরইউ পেতে কিছু অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে। তবে গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে অর্থনীতিতে যে ক্ষতি হয়, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।
এবার রাশিয়ার প্রস্তাব
অন্যদিকে পেট্রোবাংলা ও জ্বালানি বিভাগ সূত্র জানায়, চলতি মাসের শুরুতে মহেশখালীতে এলএনজি খালাস করার জন্য একটি গ্র্যাভিটি বেইজড স্ট্রাকচার (জিবিএস) স্থাপনের প্রস্তাব দেয় নোভাটেক মিডলইস্ট। কোম্পানিটি পেট্রোবাংলার কাছে জিবিএস নির্মাণের অর্থায়ন, এলএনজি ক্রয়, টার্মিনাল উন্নয়ন এবং পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে।
রাশিয়ার কোম্পানি নোভাটেকের প্রস্তাব অনুযায়ী, মহেশখালীতে সমুদ্রের তলদেশে স্থাপন করা বিশাল কংক্রিটের কাঠামোর ওপর স্থায়ী এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে। ভাসমান টার্মিনালের মতো এটি ঢেউ বা ঝড়ের সঙ্গে দুলবে না। টার্মিনালে এক মাসের গ্যাসের মজুত রাখার ব্যবস্থা থাকবে বলে জানা যায়।
তারা জানায়, চুক্তি করলে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ৩২ মাস সময় লাগবে। এতে ৯৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। দৈনিক ৯৫০ থেকে ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়।
পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তাকে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এলএনজির বিষয়ে অনেকেই এখন আগ্রহ দেখাচ্ছে। এটা নতুন কিছু না। যে কেউ প্রস্তাব দিতে পারে। তবে সরকার কী করবে, সেটা উচ্চপর্যায়ের আলোচনা।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বি. ডি রহমত উল্লাহ বলেন, কোনো ঝুঁকি রয়েছে কি না, তা সবার আগে দেখতে হবে। যেকোনো প্রস্তাব যথেষ্ট যাচাই-বাছাই করে নিতে হবে। তবে সংকট কাটাতে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া দরকার। যত দেরি করবে, ততই সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে।









