আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমলেও সুবিধা নিতে পারে না কেন বাংলাদেশ

সঞ্চিতা সীতু
২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩:২৫আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩:২৫

আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম কমলেও তার সুফল পুরোপুরি নিতে পারছে না বাংলাদেশ। দেশে অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের সক্ষমতা সীমিত, একইসঙ্গে জ্বালানি তেল মজুদের সক্ষমতাও তুলনামূলক কম। ফলে বিশ্ববাজারে দাম কমার সময় বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল কিনে মজুদ করে পরে পরিশোধন করে ব্যবহারের সুযোগ নেই বাংলাদেশের।

বিপরীতে সংকটের সময় চাহিদা মেটাতে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সঙ্গে জাহাজভাড়া, বীমা, ঝুঁকি প্রিমিয়ামসহ বিভিন্ন আমদানি ব্যয় যুক্ত হয়। ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দামে ওঠানামার পুরো সুবিধা বা ঝুঁকি প্রায় সরাসরি দেশের বাজারে এসে পড়ে।

সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জাহাজ চলাচল, বীমা ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। এতে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির ব্যয়ও বেড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে দেশের বাজারে।

কমছে অপরিশোধিত তেলের দাম, বাড়ছে আমদানি ব্যয়

বাংলাদেশ পেট্রোলয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ফেব্রুয়ারিতে ব্যারেলপ্রতি ৭১ দশমিক ১৫ ডলার থেকে মার্চে বেড়ে ১০৩ দশমিক ৮৯ ডলার এবং এপ্রিলে ১২১ দশমিক ৬৭ ডলারে উঠেছিল। এরপর দাম ধারাবাহিকভাবে কমে জুনে ৮৫ দশমিক ৪৭, জুলাইয়ে ৮৩ দশমিক ৪১, আগস্টে ৯০ এবং সেপ্টেম্বরের এ পর্যন্ত গড়ে ৬৭ দশমিক ৪৩ ডলারে নেমেছে।

তবে শুধু অপরিশোধিত তেলের দাম কমলেই দেশের আমদানি ব্যয় কমে না বলে মনে করেন বিপিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাদের হিসাবে, ফেব্রুয়ারিতে মেরিন ফুয়েলের দাম টনপ্রতি ৪৭০ দশমিক ৪৩ ডলার থাকলেও বর্তমানে তা ৫৭৭ দশমিক ৫০ ডলার। ফলে জাহাজভাড়া, বীমা ও ঝুঁকি প্রিমিয়ামসহ আমদানি ব্যয় বেড়েছে।

বিপিসির এক কর্মকর্তা বলেন, ‘শুধু অপরিশোধিত তেলের দাম দিয়ে আমদানি ব্যয় হিসাব করলে প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে না। পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিতে জাহাজভাড়া, বীমা ও ঝুঁকি প্রিমিয়ামসহ বিভিন্ন ব্যয় যুক্ত হয়। সংকটের সময় এসব ব্যয় আরও বেড়ে যায়।’

পরিশোধন ও মজুত—দুই সক্ষমতাই সীমিত

দেশে বছরে জ্বালানি তেলের চাহিদা প্রায় ৭০ লাখ টন। বিপরীতে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অপরিশোধন ও পরিশোধনের সক্ষমতা প্রায় ১৫ লাখ টন। বাস্তবে গড়ে প্রায় ১২ লাখ টন পরিশোধন করা হয়। ফলে চাহিদার বড় অংশই পরিশোধিত অবস্থায় আমদানি করতে হয়।

বিপিসির এক কর্মকর্তা বলেন, ‘বাংলাদেশের পরিশোধন ও মজুত—দুই সক্ষমতাই সীমিত। তিন মাসের চাহিদার তেলও মজুত রাখা সম্ভব হয় না। অনেক দেশ এক বছরের বেশি সময়ের তেল সংরক্ষণ করতে পারে। বিশ্ববাজারে দাম কমলে তারা বেশি করে অপরিশোধিত তেল কিনে মজুত ও পরিশোধন করে সুবিধা নিতে পারে। বাংলাদেশ সেই সুযোগ পায় না।’

অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমলেও কম দামের তেল বেশি পরিমাণে কিনে দেশে এনে সংরক্ষণ ও পরিশোধনের মতো অবকাঠামো বাংলাদেশের নেই। ফলে দাম কমার সময় বড় পরিসরে সুবিধা নেওয়ার সুযোগও সীমিত।

সংকটে বাড়ে পরিশোধিত তেলের দাম

এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ায় পরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার চাপ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগস্টে বিশ্বে তেলের উৎপাদন দৈনিক ১৬ লাখ ব্যারেল কমে ১০ কোটি ১ লাখ ব্যারেলে নেমেছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে দৈনিক এক কোটির বেশি ব্যারেল উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক সরবরাহে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে।

বিপিসির সংশ্লিষ্ট ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘বিশ্বের অনেক দেশ কম দামের সময় অপরিশোধিত তেল কিনে দীর্ঘ সময়ের জন্য মজুদ করতে পারে। পরে প্রয়োজন অনুযায়ী তা পরিশোধন করে ব্যবহার করে। বাংলাদেশের সেই সক্ষমতা সীমিত। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার সময়ও আমরা বড় আকারে সুবিধা নিতে পারি না।’

রিফাইনারির সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দাম সমন্বয় করে পরিস্থিতি মোকাবিলা না করে দীর্ঘমেয়াদে দেশের পরিশোধন ও মজুদ সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার সময় তুলনামূলক কম দামে অপরিশোধিত তেল সংগ্রহ করে মজুদ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে সংকটের সময় আমদানিনির্ভরতাও কিছুটা কমানো যাবে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম বলেন, ‘শুরু থেকেই সরকারগুলো সাধারণ মানুষের সুবিধার চেয়ে নির্দিষ্ট শ্রেণির সুবিধাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। এর ফলে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও প্রয়োজন অনুযায়ী শক্তিশালী করা হয়নি।’

দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ না নেওয়ার সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘যুদ্ধের পর ইস্টার্ন রিফাইনারির একটি ইউনিট করা হয়েছিল। কিন্তু এর পরিশোধন ক্ষমতা বর্তমান চাহিদার তুলনায় অনেক কম। দ্বিতীয় ইউনিট করার কথা দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।’

তার ভাষ্য, ‘এত বড় বড় প্রকল্প হয়েছে, অথচ প্রয়োজনীয় এই প্রকল্প সরকার নিজেও করতে পারতো। কিন্তু তা করা হয়নি। এর ফলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।’

শামসুল আলমের অভিযোগ, রিফাইনারির সক্ষমতা না বাড়ানোর পেছনে বেসরকারি খাতকে জ্বালানি তেলের বাজারে সুযোগ করে দেওয়ার স্বার্থ কাজ করেছে। তিনি বলেন, ‘রিফাইনারির সক্ষমতা বাড়ানো হলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে তেলের বাজার ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ কমে যেত। তাদের জন্য জায়গা রাখতেই হয়তো এ উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।’

দীর্ঘমেয়াদে পরিশোধনাগারের সক্ষমতা বাড়ানো, পর্যাপ্ত মজুত সক্ষমতা তৈরি এবং সংকটের সময় আমদানিনির্ভরতা কমানোই বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করার অন্যতম উপায় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

/ইউএস/
সম্পর্কিত
সরকারের এক সিদ্ধান্তে কত মানুষের কষ্ট বাড়লো?
তেলের ডিপোতে ২০ লাখ টাকা চাঁদা চেয়ে গ্রেফতার কৃষক দলের নেতা, পরে বহিষ্কার
সরকার বাড়তি দামে এলএনজি আমদানি করছে কেন
সর্বশেষ খবর
নেদারল্যান্ডসের রানির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কুশল বিনিময়
নেদারল্যান্ডসের রানির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কুশল বিনিময়
সরকারের এক সিদ্ধান্তে কত মানুষের কষ্ট বাড়লো?
সরকারের এক সিদ্ধান্তে কত মানুষের কষ্ট বাড়লো?
চট্টগ্রাম কলেজের এত সুনাম কেন?
চট্টগ্রাম কলেজের এত সুনাম কেন?
প্রতারণার শিকার ১৭ হাজার বিনিয়োগকারীকে ৭২ কোটি টাকা দেবে ডিএসই
প্রতারণার শিকার ১৭ হাজার বিনিয়োগকারীকে ৭২ কোটি টাকা দেবে ডিএসই
সর্বাধিক পঠিত
সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নওফেলের স্ত্রী ইমা ক্লেয়ারের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা
সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নওফেলের স্ত্রী ইমা ক্লেয়ারের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা
রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, যোগদানের ২০ দিনের মাথায় এসিল্যান্ডকে প্রত্যাহার
রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, যোগদানের ২০ দিনের মাথায় এসিল্যান্ডকে প্রত্যাহার
‘শিগগিরই চার টুকরোয় ভাঙবে উত্তর প্রদেশ’
‘শিগগিরই চার টুকরোয় ভাঙবে উত্তর প্রদেশ’
বুধবার দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি
বুধবার দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি
গুলশান থেকে আ.লীগের তিনবারের এমপি গ্রেফতার
গুলশান থেকে আ.লীগের তিনবারের এমপি গ্রেফতার