X

সেকশনস

অনুবাদ : চর্চা থেকে তত্ত্বজ্ঞান

আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২০, ১৪:২৩

আমি অনুবাদ করা শুরু করি আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে যখন আমি শিল্পকলা নামে একটি অনিয়মিত লিটল ম্যাগাজিন যৌথ সম্পাদনা করতাম আমার বন্ধু প্রয়াত আবদুল মানান সৈয়দ-এর সাথে। আর আমি অনুবাদ তত্ত্ব ও অনুশীলন (Translation Theories/Studies) নামে একটি পাঠক্রম (course) পড়ানো  শুরু করি ১৯৯৮ সালে, অর্থাৎ বাইশ বছর আগে—হিসাবে বলছে আমার অনুবাদ তত্ত্ব পড়ানোর শুরু হাতেকলমে অনুবাদ করা শুরু করার অন্তত দীর্ঘ আঠাশ বছর পর থেকে। আমার প্রথম সাড়া জাগানো মঞ্চানুবাদগ্যালিলিও অনুবাদ করেছিলাম—এবং সেটিই আমার প্রথম সম্পূর্ণ গ্রন্থানুবাদ—পূর্বে উল্লেখিত পাঠক্রম নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি-তে পড়ানো শুরু করার অন্তত বাইশ বছর আগে। এবং আমি ঐ অনুবাদ সম্পন্ন করার আগে অনুবাদ তত্ত্ব নিয়ে কোনোই আনুষ্ঠানিক পড়াশোনা করিনি। এ বিষয়ে আমার আনুষ্ঠানিক পড়াশোনার পত্তন ১৯৭৫-৭৭ সালে যখন আমি যুক্তরাজ্যের এক্সিটার ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করতে যাই। ফলে দেখা যাচ্ছে অনুবাদের আনুষ্ঠানিক নীতিমালা এবং কৌশল আমার অজানা ছিল দীর্ঘ দিন যদিও অনুবাদ চর্চার শুরু থেকেই অনুবাদের প্রায় অধিকাংশ সমস্যার সাথেই আমার পরিচয় ঘটে গিয়েছিল এবং সেসবের সম্ভাব্য সমাধানও তাৎক্ষণিকভাবে নিজ সাধারণ বুদ্ধি থেকে উদ্ভাবন করার প্রচেষ্টা করেছি। আজ আমি এই প্রবন্ধে আমার তত্ত্ব অজানা সময়ের অনুবাদ-অভিজ্ঞতা এবং তত্ত্ব জানা পরবর্তী অনুবাদ-অভিজ্ঞতার একটি বর্ণনা দেবার চেষ্টা করবো।

২ 

আমার অনুবাদ অভিজ্ঞতা আমাকে যে সমস্যাটির সাথে প্রথম পরিচয় করিয়েছে সেটি হলো ভাষার অন্তর্গত দুর্বোধ্যতা। অনেক পরে নোয়াম চমস্কি পড়ে যদিও জেনেছি ভাষার দুটি স্তর আছে: উপর-কাঠামো (surface structure) এবং  গভীর-কাঠামো (deep structure) এবং ভাষা থেকে ভাষার মূল অমিলটা আসলে ঐ উপর-কাঠামোতে, তাতে কিন্তু আমার অনুবাদকর্মের কোনো সাশ্রয় হয়নি। কারণ ভাষা আসলে একটি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির আধার, যাকে বুঝতে হলে ঐ জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক সংকেতগুলোকেও (semiotics) বুঝতে হয়, জানতে হয়, যার ভেতর রয়েছে খাদ্যাভ্যাস, পোশাকপরিচ্ছদ, আলাপচারিতা, উৎসব, আতিথেয়তা, মেলামেশা, আনন্দ-দুঃখ-রাগ-ভালবাসার প্রকাশভঙ্গী এবং এমন আরও অনেক কিছু। এ বিষিয়টি আমি জেনেছি যখন মিখাইল বাখতিন পড়েছি, এবং সেটা পড়েছি বিদেশে পড়তে গিয়ে। কিন্তু অনুবাদ করতে গিয়ে শুরু থেকেই জেনেছি অনুবাদককে এই প্রসঙ্গে দুটি অনিবার্য সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়: শব্দের অন্তর্গত দুর্বোধ্যতা এবং বাক্যের অন্তর্গত দুর্বোধ্যতা।

আমরা তো জানি শব্দের দুর্বোধ্যতা সব স্থানেই আছে কারণ প্রায় সব শব্দের শুধু একাধিক অর্থই নয় প্রয়োগ অনুক্রমেও অর্থের তারতম্য আছে। অনুবাদ চর্চা আমাকে স্পষ্ট জ্ঞান দিয়েছে যে শাব্দিক সমস্যাগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়—ক. নির্দেশিত বা আভিধানিক অর্থ, খ. গূঢ়ার্থ বা দ্যোতনিক অর্থ এবং গ. সংসৃষ্টক বা  প্রায়োগিক অর্থ। আমি এই তিনটি বিষয় আলাদাভাবে অলোচনা করতে চাই।

ক. নির্দেশিত বা আভিধানিক অর্থ: যে কোন শব্দের নির্দেশিত অর্থ আমরা অভিধানে পাই। কিন্তু কবি সাহিত্যিকরা এসব অর্থকে খুব একটা তোয়াক্কা করেন না। শুধু তাই নয় ভাষা আসলে সদা সচল এবং একমাত্র সচল ভাষাই টিকে থাকে—সংস্কৃত ও ল্যাটিন ভাষা টিকে থাকেনি তাদের গোঁড়ামির জন্য, সচলতাকে না মানার জন্য। ইংরেজি অনেক শব্দ আছে যা ধার করা, বাংলাতেও তাই, বিশ্বের সব ভাষাতে তাই। আবার শব্দের পুরনো অর্থ ও ব্যবহার আধুনিক যুগে বদলে গেছে। যেমন luxury, gay, cool শব্দগুলো তাদের আদি নির্দেশিত অর্থ থেকে সরে এসেছে। এযুগে luxury কোন অনুচ্চার্য শব্দ নয় অথচ শেক্সপিয়র তার কিং লিয়ার নাটকে এটিকে ব্যবহার করেছেন ‘coupling’ অর্থাৎ যৌনকর্ম করা অর্থে। তেমনিভাবে gay শব্দটি আজকাল অনেক ভেবেচিন্তে ব্যাবহার করতে হয় কারণ আমাদের ছোটবেলায় আমরা নিশ্চিন্তে বলতে পারতাম I’m gay, অর্থাৎ আমি হাসিখুশি। এখন একথা বল্লেই সবাই ভাববে আমি সমকামী। cool শব্দ তো আজকাল একাধিক অর্থে ব্যাবহার হয় অথচ এর আভিধানিক প্রাথমিক অর্থ হলো ঠান্ডা বা শান্ত। একজন অনুবাদককে তাই শুধুমাত্র অভিধানের নির্দেশিত অর্থে বিশ্বাস করলে চলবে না।

খ. গূঢ়ার্থ বা দ্যোতনিক অর্থ: গূঢ়ার্থ বা দ্যোতনিক অর্থ আসলে দুটো দিক নির্দেশ করে—মনস্তাত্তিক এবং সাংস্কৃতিক। এটি কিন্তু একটি বিশাল বিষয় কারণ প্রতিটি লেখকের, বিশেষ করে কবিদের, একটি নিজস্ব ভুবন আছে যেখানে আভিধানিক নির্দেশিত অর্থ কার্যকর নয়। যেমন অ্যাবসার্ড নাট্যকার বা পরাবাস্তববাদী কবিরা শব্দের ব্যবহারে কোন প্রচলই মানেন না। আমি স্যামুয়েল বেকেট, হ্যারল্ড পিনটার এবং এডওয়ার্ড অ্যালবি অনুবাদ করতে গিয়ে এমন সমস্যায় একাধিকবার পড়েছি। যতদূর মনে পড়ে পরাবাস্তব ফরাসি কবি পল এলুয়ার কোনো এক কবিতাতে তার প্রেমিকাকে তুলনা করতে গিয়ে বলেছিলেন তার প্রেমিকার সাথে চাঁদের সাদৃশ্য আছে কারণ উভয়ই ‘আই’ বর্ণের মতো। আমরা জানি সুকান্ত-এর কাছে চাঁদকে ঝলসানো রুটি মনে হয়েছে, কিন্তু ‘আই’ বর্ণের সাথে চাঁদের সাদৃশ্য সত্যিই দুর্বোধ্য যদিনা তার প্রেমিকার নাম ‘আইভি’ হয়ে থাকে। এসবকে কাব্য পরিভাষায় সম্ভবত বলা যায় allusion বা পরোক্ষ উল্লেখ যাতে টি এস এলিয়ট অতি পারঙ্গম ছিলেন যদিও তিনি পরাবাস্তববাদী ছিলেন না। ঠিক একারণেই বোধহয়, যেটা আমি অনেক পরে জেনেছি, গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক বলেছেন অনুবাদে, বিশেষ করে কবিতা অনুবাদে, মূল থেকে অনেক কিছু হারিয়ে যায়, ইংরেজিতে যাকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে lost in translation বলে। অন্যদিকে ইংরেজ কবি জন ড্রাইডেন সেই সতের শতকে বলেছিলেন কবিতা অনুবাদ করতে হলে অনুবাদককে কবি হতে হবে। আমার অনুবাদ চর্চাতে এই মতামতগুলোর তেমন গুরুত্ব নেই বললেই চলে। হিস্পানি সাহিত্যেক অক্তাবিও পাস-এর মতে যদিও তাত্বিকভাবে কবিদেরই কবিতা অনুবাদ করা উচিত, প্রায়োগিকভাবে লক্ষ্য করা যায় খুব কম কবিই ভাল অনুবাদক। নীরদ চৌধুরী রবীন্দ্রনাথের নিজ কবিতার ইংরেজি অনুবাদের তেমন প্রশস্তি গাইতে পারেননি, বরং বলেছেন বিশ্বের সাহিত্যিক ও পাঠকরা তার ঐ অনুবাদ পড়ে তাকে কবি হিসেবে ভুল বুঝেছে।          

আমি মানি, যুগ বা সময়, মনস্ততত্ব এবং সাংস্কৃতিক বিভাজনকে অতিক্রম করা সুকঠিন। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় অনেক শব্দ আছে যেগুলো উৎস ভাষাতে (Source Language বা SL) যে গূঢ়ার্থ বা দ্যোতনা সৃষ্টি করে লক্ষ্য ভাষাতে (Target Language  বা TL) তা করে না, আর এসব সবচাইতে বেশি পরিলক্ষিত হয় কবিতাতে বা নাটকে। কিন্তু এক অজানা স্বজ্ঞা বা intuition একজন অনুবাদককে এই দুর্গম পথ পাড়ি দিতে সাহায্য করে (যা আমাকে করেছে ব্রেশট-এর গ্যালিলিও অনুবাদ কালে) যেমন শার্ল বোদলেয়ার-এর কাব্যগ্রন্থ The Flowers of Evil ফরাসি থেকে এবং মিগাল দে সেরভান্তিস-এর  উপন্যাস Don Quixote হিস্পানি থেকে ইংরেজি ভাষাতে অনুদিত হয়ে শুধু ইউরোপ আমেরিকা নয় বাংলাদেশের কবি জীবনানন্দ দাশকেও আলোড়িত ও প্রভাবিত করেছে।

উৎস ভাষা থেকে লক্ষ্য ভাষাতে পরিবর্তনে অনেক ক্ষেত্রেই যুগ, সময়, মনস্ততত্ব এবং সংস্কৃতিকে ধরে রাখা কঠিন হয় যদিও উৎস ভাষার মেজাজকে ধরে রাখার কথা সেই ষোল শতাব্দী থেকেই ফরাসি মানবতাবাদী এটিয়ান ডলেট বলেছেন। ঐ শতাব্দীর বিখ্যাত ইংরেজ অনুবাদক জর্জ চ্যাপম্যানও—যিনি হোমার-এর গ্রিক ভাষায় রচিত সাহিত্যকর্ম অনুবাদ করেছিলেন এবং যে অনুবাদ পড়ে বিমোহিত জন কীটস্ তার বিখ্যাত সনেট On First Looking Into Chapman’s Homer রচনা করেছিলেন—এক মত পোষণ করে বলেছেন অনুবাদকের অন্যতম কর্তব্য হলো উৎস ভাষার সাথে মিলিয়ে সঠিক শব্দ নির্বাচন করা এবং সেই শব্দগুলোকে সঠিক অনুক্রমে লক্ষ্য ভাষায় সাজানো যাতে মূল লেখার সুর ও মাত্রাকে ধরে রাখা যায়। এ বিষয়টি না জেনেই আমি দীর্ঘ আঠাশ বছর অনুবাদ করেছি আমার অনুভব থেকে। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য এই তথ্য ও তত্ত্ব জানার পরও আমাকে আমার স্বজ্ঞা বা intuition-এর উপর নির্ভর করেই অধিকাংশ অনুবাদকর্ম করতে হয়েছে।

অনেকেই ধারণা করেন এ থেকে মুক্তির একটি উপায় রূপান্তরে আশ্রয়ী হওয়া—কারণ রূপান্তরে উৎস ভাষাকে লক্ষ্য ভাষার সংস্কৃতিতে অনুকৃত করলে লক্ষ্য ভাষার পাঠকদের কাছে সহজে পৌঁছান যায়। যায় হয়তো কিন্তু যে ঝুঁকিটা থেকে যায় সেটা হলো উৎস লেখকের অভিপ্রায়টি অধিকাংশ ক্ষেত্রে তরলীকরণ হয়ে যায় এবং এমনকি অনেকক্ষেত্রে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়। এমন উদাহরণ বাংলাদেশের একাধিক রূপান্তরিত নাটকে চোখে পড়ে। আমি তাই রূপান্তরের চাইতে অনুবাদেরই বেশি পক্ষপাতী এবং এ বিষয়ে ১৯৭৫ সালেই আমার গ্যালিলিও নাটিকের অনুবাদ প্রকাশনার ভূমিকাতে লিখেওছিলাম। প্রসঙ্গত সম্প্রতি হস্তগত হওয়া একটি সাক্ষাৎকার পুস্তিকাতে টিম্বারলেক ভার্টেনবেকার-এর—যিনি টমাস মাইকেল কিনেলি রচিত Our Country’s Good উপন্যাসেরনাট্যরূপ দিয়েছেন এবং আমার অনূদিত ঐ নাটকটি ঢাকা থিয়েটার মঞ্চায়িত করেছে—একটি মতামত তুলে ধরতে চাই। তিনি বলছেন অনুবাদকের সবচাইতে বড় প্রচেষ্টা হলো উৎস ভাষায় ব্যবহার করা শব্দের সম-ওজনের শব্দ লক্ষ্য ভাষাতে ব্যবহার করা, এবং সেটা করতে গিয়ে কোনোক্রমেই আক্ষরিক অনুবাদের আশ্রয় নেওয়া যাবে না, যে প্রসঙ্গে অনুবাদ ও রূপান্তেরের প্রসঙ্গ উঠে আসে। টিম্বারলেক-এর মতে নাটকের রূপান্তর হলো নাটককে অন্য ভাষার দর্শকদের বোধশক্তির উপযোগী করা, আর অনুবাদ হলো এক ভাষা থেকে অন্য ভাষাতে মূলের আবহকে পরিবহণ করে পুনঃসৃষ্টি করা। রূপান্তর নিয়ে এই উপমহাদেশের বিখ্যাত প্রয়াত অভিনেতা নাট্যকার অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন রূপান্তর আসলে এক ভাষার সংস্কৃতকে অন্য ভাষার মানুষদের বোধগম্য করার জন্য একটি ছোট পরিসরে নামিয়ে আনা এবং অনেক ক্ষেত্রে অবমূল্যায়ন করা, এবং তার চূড়ান্ত পক্ষপাত  ছিল অনুবাদের পক্ষে যদিও তিনি একাধিক নাটক রূপান্তর করেছিলেন ভারতীয় দর্শকদের জন্য এবং বলেছিলেন আসলে কোনো না কোনো সময়ে বিশ্বের সব ভাল নাটকের একাধিক ভাষাতে অনুবাদ হওয়া বাঞ্ছনীয়। আমিও ব্যাক্তিগতভাবে মনে করি আধুনিক ডিজিটাল যুগে রূপান্তরের স্থান সঙ্কুচিত হয়ে এসেছে এবং তার প্রয়োজনও অনেকাংশে কমে গেছে।

গ. সংসৃষ্টক বা প্রায়োগিক অর্থ: সংসৃষ্টক বা প্রায়োগিক অর্থ বলতে আমি বোঝাতে চাই বাক্যে ব্যবহৃত শব্দ কী ধরনের প্রায়োগিক অর্থ সৃষ্টি করছে। এজন্য অনুবাদকের সর্বাধিক জরুরি কাজ হলো উৎস ভাষা এবং লক্ষ্য ভাষা উভয় ভাষাতেই সমান দক্ষ হওয়া এবং উভয় ভাষার সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস, পোশাকপরিচ্ছদ, আলাপচারিতা, উৎসব, আতিথেয়তা, মেলামেশা, আনন্দ-দুঃখ-রাগ-ভালবাসার প্রকাশভঙ্গী, অর্থাৎ semiotics বিষয়ে ওয়াকিবহাল থাকা। অবশ্য আজকাল এটি অনেক সহজ হয়ে গেছে তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির কারণে। তবু বলবো সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান হয়নি কারণ আমি আগেই বলেছি প্রতিটি কবিসাহিত্যিকের কিছু বিশেষার্থক প্রিয় শব্দ থাকে, আবার তাদের নতুন শব্দ উদ্ভাবনের প্রয়াসও থাকে, কারও কারও কিছু স্বভাব বৈশিষ্ট্যিক শৈলী থাকে এবং এসবই ঐ সংসৃষ্টকতা বা প্রায়োগিকতার অন্তর্গত। অনুবাদককে কোনোকিছু অনুবাদের আগেই এসব বিষয়ে সম্যক অবগত হতে হয়, পড়াশুনা করতে হয়। আমার নাট্যতত্ব পাঠের অন্যতম আবিষ্কার একটি চিত্রলেখা যেখানে দেখানো হয়েছে উৎস ভাষা থেকে লক্ষ্য ভাষাতে অনুবাদ করতে হলে অনুবাদককে প্রথমে মূল পাঠাংশকে পড়ে পুঙ্খনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করতে হবে তারপর স্থানান্তর করে লক্ষ্য ভাষাতে পুনবিন্যাস করতে হবে এবং সব শেষে মূলকে সরিয়ে রেখে পড়ে দেখতে হবে ভাষান্তরিত পাঠাংশ লক্ষ্য ভাষার উপযোগী হয়েছে কিনা। শুধু তাই নয়, নিশ্চিত হতে হবে মূলের অর্থোদ্ধার সঠিক হয়েছে কিনা। এটা করতে অনুবাদককে মূল পাঠাংশ এবং অনুদিত পাঠাংশ বারংবার পড়ে দেখতে হয়।

আর একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যেটি আমি উপরে ক্ষণিক উল্লেখ করেছি: উৎস ভাষার শব্দ-অনুক্রম লক্ষ্য ভাষাতে অক্ষুণ্ণ রাখা। এই বিষয়টি কবিতা এবং নাটকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শব্দের অনুক্রম বদলে যেতেই পারে বিশেষ করে চমস্কি-তত্ব যথার্থই বলেছে সব ভাষার উপর-কাঠামোতেই যত পার্থক্য। বাংলা ইংরেজির পার্থক্যটা বড়ই সংকটপূর্ণ। বাংলা বাক্যবিন্যাসের ব্যাকরণরীতি হলো কর্তা-বস্তু-ক্রিয়া, আর ইংরেজি ব্যাকরণরীতি কর্তা-ক্রিয়া-বস্তু। এছাড়াও ইংরেজি ব্যাকরণরীতিতে ক্রিয়া ছাড়া বাক্য শুদ্ধ হয় না, কিন্তু বাংলা বাক্য ক্রিয়া ছাড়াই দাঁড়াতে পারে এবং শুদ্ধ। ফলে ভাষান্তরে উভয় ক্ষেত্রেই শব্দের অনুক্রম বদলে যেতে বাধ্য এবং নাটকে এবং কবিতায় তার ফলশ্রুতিতে স্বরভঙ্গি, শ্বাসাঘাত, কণ্ঠস্বরের ওঠানামা বদলে যায়, এমনকি অনেক স্থানে অর্থও বদলে যায়। নাটক ও কবিতা অনুবাদকের জন্য বিষয়টি অবশ্যই চ্যালেঞ্জিং।

বাক্যের অন্তর্গত দুর্বোধ্যতার প্রাথমিক উৎস শব্দ, এবং যদিও নোয়াম চমস্কি ১৯৫৫ সালে তার Transformational Grammar তত্ত্বে বলছেন সব ভাষার গভীর-কাঠামোতে সাধারণত অমিল থাকে না (পরবর্তিতে অবশ্য উনি এর সংশোধনী বক্তব্যও দিয়েছেন, সম্ভবত ১৯৬০ সালের দিকে), অনুবাদকর্মে, বিশেষ করে নাটক এবং কবিতা অনুবাদে দেখা যায় ভাষা থেকে ভাষাতে বাক্যের অন্তর্গত অর্থে অনেক অমিল আছে এবং সেটির প্রধান কারণ ঐ semiotics। নাটক সংলাপ নির্ভর। ফলে ভাষান্তরিত সংলাপগুলো এমন হতে হবে যা শ্রোতা-দর্শক বুঝতে সক্ষম হয় কারণ নাটক শুধু দর্শনের চর্চা নয়, শ্রবণের চর্চাও বটে (শেক্সপিয়র তো নাটক শুনতে বলেছেন)—বিশেষ, আধুনিক ঝোঁক দেখা যাচ্ছে বর্ণনাধর্মী নাটকের দিকে যা দীর্ঘ-বাক্য আশ্রিত। নাট্যানুবাদকের সংলাপ অনুবাদে এমন ভাষা-সচেতনতা থাকা উচিত যাতে মূল নাটকের সাথে বিশ্বস্ত থেকেও অনূদিত ভাষা সংস্কৃতিতে তা স্পষ্ট বোধগম্য হয়। আমার দীর্ঘ নাট্যানুবাদের অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে নাটক এমন একটি শিল্পকর্ম যাতে জীবনের বৃহত্তম ইঙ্গিতকে সঙ্গবদ্ধ করা হয় নাটকের সংলাপে। একই সাথে অর্থবহ সঙ্ঘবদ্ধ বাক্যপরম্পরার মাধ্যমে অভিনীত নাটকের লব-কুশদের জীবনযাত্রা ও জীবনবোধকেও উন্মোচিত করা হয়। এসব কিছুর প্রত্যক্ষ উপলব্ধি ঘটাতে হলে সংলাপের গভীর-কাঠামোকে সঠিকভাবে ভাষান্তরিত করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।

অনূদিত নাটকে সংলাপের পরম্পরা রক্ষা ও সংযুক্তিতে স্বতঃস্ফূর্ততা সৃষ্টি করা বেশ জটিল কাজ। নাটকে সংলাপের আক্ষরিক অনুবাদ দুর্বোধ্যতার জন্ম দেয়—বিশেষ করে বাগধারা ও প্রচলিত প্রায়গিক বাক্যবিন্যাসের ক্ষেত্রে যেখানে তথাকথিত কুবচন, নিষিদ্ধ শব্দ ও আঞ্চলিক বিশিষ্টার্থক শব্দাবলীর মুক্ত ব্যবহার দেখা যায়, যেসব শব্দমালার প্রমিত ভাষায় প্রবেশ নিষিদ্ধ। অথচ এই শব্দমালা ও বাক্যবিন্যাসের স্থান সকল ভাষাগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা, জীবনবোধের গভীরে। নাটকের মেজাজ উপলব্ধি করে সংস্কারমুক্ত মনে অনুবাদ করাটাই হলো নাট্যানুবাদের পূর্বশর্ত।

সংলাপ প্রক্ষেপণ ও উচ্চারণের অস্বাচ্ছন্দ্যতা অভিনয়ে ব্যাঘাত ঘটায় যেটি অনুবাদকের একটি সঙ্কটাকীর্ণ সমস্যা। কঠিন শব্দ ব্যবহার যদিও এর উৎসমূলে, এটিই একমাত্র সমস্যা নয়। এর সাথে রয়েছে বাক্যবিন্যাসের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই অনুবাদককে উৎস ভাষার বাক্যবিন্যাসকে ভেঙ্গে পুনর্বিন্যাস করতে হয় যাকে অনুবাদতত্ত্বে বলা হয় decoding and recoding, যে বিষয়টি কমবেশি সকল অনুবাদকর্মের জন্যই প্রযোজ্য, তবে আমার অভিজ্ঞতা বলে এটি নাটক ও কবিতার জন্য বিশেষভাবে গণ্য।                                                              

আমি দীর্ঘদিন ধরে, মূলত, নাটক অনুবাদ করি। এ পর্যন্ত আমার নাট্যানুবাদের সংখ্যা তিরিশেরও অধিক, যদিও আমি একাধিক কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ এবং উপন্যাস অনুবাদ করেছি বাংলা এবং ইংরেজি উভয় ভাষাতেই। আমার অনুবাদ চর্চা বর্তমানে একটি নিজস্ব তত্ত্বের ওপর স্থাপিত যা আমার অনুবাদ অভিজ্ঞতা এবং নাট্যতত্ব পাঠ দানের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরে। তারই আলোকে আমি এই অংশে আমার ব্যক্তিগত নাট্যানুবাদতত্ব নিয়ে আলোচনা করতে চাই উপরের বক্তব্যের সাথে সাযুজ্য রেখে।

আমার চর্চা এবং অনুবাদতত্ত্বের শিক্ষা ও শিক্ষাদান আমাকে স্পষ্ট ধারণা দিয়েছে যে সেই শুরু থেকেই অনুবাদ তাত্ত্বিকরা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, যার ভেতর উল্লেখ্য হলেন বাইবেল অনুবাদক ওয়েক্লিফ, ফরাসি অনুবাদক ডলেট, ইংরেজ অনুবাদক চ্যাপম্যান ও ড্রাইডেন, জর্মন অনুবাদক গয়েটে এবং এমনকি আধুনিক যুগের হিস্পানি অনুবাদক অক্তাবিও পাস, যে আক্ষরিক অনুবাদ নয়, অর্থ অনুধাবন করে অনুবাদ করাই হলো সুঅনুবাদ। আমি নেজেও এই তত্ত্বে বিশ্বাসী হয়েছি আমার অনুবাদ অভিজ্ঞতা থেকে।

অনুবাদকর্মের প্রথম ধাপে অনেকের মতো আমারও ধারণা ছিল নাটক শুধু পড়ার জন্যই অনূদিত হয়। এই বিশ্বাসে প্রত্যয়িত হয়ে আমার প্রথম অনুবাদ কর্মে সম্পূর্ণ সচেতনভাবে ভাষাকে বাচনীয় করতে সচেষ্ট হইনি, দৃষ্টি দিয়েছি নাটকের বাণীর দিকে। কিন্তু তবু অবচেতনভাবে শব্দ ও বাক্যবিন্যাস, বাগধারা, সংস্কৃতি ও ভাষার ঐতিহ্য, সেই ভাষার জনগোষ্ঠীর খাদ্যাভ্যাস, পোশাকপরিচ্ছদ, আলাপচারিতা, উৎসব, আতিথেয়তা, মেলামেশা, আনন্দ-দুঃখ-রাগ-ভালবাসার প্রকাশভঙ্গী, তাদের ভৌগোলিক পরিবেশ, ইতিহাস এবং নাটকে বর্ণিত সময়কে ও মেজাজকে সঠিকভাবে নির্ণয় করতে আমি কম বিড়ম্বিত হইনি। এই বিড়ম্বনা থেকে পরিত্রাণ পেতে মনের কল্পিত মঞ্চে বারবার দৃশ্য প্রস্তুত করে সংলাপ আওড়াতে হয়েছে। তবু অনূদিত ভাষায় পরিপূর্ণভাবে কাঙ্ক্ষিত স্বতঃস্ফূর্ততা ধরা সম্ভব হয়েছে সেকথা কখনই নিশ্চিত করে বলতে পারব না। ঘটনা, সংলাপ, চরিত্রের অতিভাষিক অবস্থান এবং সর্বোপরি নাটকীয় সংঘাতকে বিশ্বাসযোগ্য ও স্বাভাবিক করতে অনেকটা অপেক্ষা করতে হয়েছে। যতক্ষণ না নাটক মঞ্চে এসেছে ততক্ষণ পর্যন্ত আমি বুঝতেই পারি না এসব উপাদান সঠিকভাবে উপস্থাপিত হয়েছে কিনা আর এসবই আমাকে শিখিয়েছে মঞ্চের মানুষেরা। বুঝেছি নাটকের ভাষার অনুবাদ সমগ্র নাটকের একটি সামান্য অংশমাত্র। অবশ্য স্বীকার করতেই হবে আমার এই শিক্ষা অনবচ্ছেদ্য আবর্তে সদা সচল, কারণ প্রতিটি নতুন অনূদিত নাটকের মঞ্চায়ন আমাকে করে চলেছে অভিজ্ঞ। প্রতিবারই এই বক্তব্যের সারমর্ম নতুনভাবে  উপলব্ধি করি যখন আমার অনূদিত নাটকের ভাষার কার্যকারিতা কিংবা অকার্যকারিতা অভিনয়ের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়। নাটকে ব্যবহৃত ভাষা আসলে শ্রবণ ও দর্শনের যে এক পরস্পর নির্ভরশীল মিথস্ক্রিয়া এ প্রত্যয় প্রতিটি নাট্যানুবাদকের অন্তরে ধরে রাখা একান্ত বাঞ্ছনীয়।

একাধারে মূল লেখক এবং পাঠক বা দর্শকের প্রতি বিশ্বস্ত থাকা, কিংবা তাদের প্রতারণা করা—এই দুই স্পর্শকাতর ক্রিয়ার মধ্যস্থানে অনুবাদকের যে অবস্থান তার অবমূল্যায়ন আরও দীর্ঘ দিন হবে—সে আশঙ্কা থেকে আমি মুক্ত নই, কারণ নিজ অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছি, অনুবাদকর্ম আসলেই অসাধ্যকে সাধ্য করার প্রক্রিয়া।

//জেডএস//

সম্পর্কিত

শারদীয় সংখ্যা ২০২০

শারদীয় সংখ্যা ২০২০

অনুবাদের কৈফিয়ত

অনুবাদের কৈফিয়ত

অনুবাদ সাহিত্যের কলাকৌশল

অনুবাদ সাহিত্যের কলাকৌশল

তর্জমা প্রসঙ্গে

তর্জমা প্রসঙ্গে

স্মৃতিতে দুর্গাপূজা

স্মৃতিতে দুর্গাপূজা

অধরা বিশ্বের প্রতিভূ

অধরা বিশ্বের প্রতিভূ

বিস্ময়মুগ্ধতা ও ডুবসাঁতার

বিস্ময়মুগ্ধতা ও ডুবসাঁতার

দোটানার বৃত্ত

দোটানার বৃত্ত

সর্বশেষ

পাপড়ি ও পরাগের ঝলক

পাপড়ি ও পরাগের ঝলক

আমার হৃদয়ে তার সোনালি স্বাক্ষর

আমার হৃদয়ে তার সোনালি স্বাক্ষর

মায়া তো মায়াই, যত দূরে যায়...

মায়া তো মায়াই, যত দূরে যায়...

তিস্তা জার্নাল । পর্ব ৬

তিস্তা জার্নাল । পর্ব ৬

দুটো চড়ুই পাখির গল্প

দুটো চড়ুই পাখির গল্প

থমকে আছি

থমকে আছি

সালেক খোকনের নতুন বই ‘অপরাজেয় একাত্তর’

সালেক খোকনের নতুন বই ‘অপরাজেয় একাত্তর’

আমরা এক ধরনের মানসিক হাসপাতালে বাস করি : মাসরুর আরেফিন

আমরা এক ধরনের মানসিক হাসপাতালে বাস করি : মাসরুর আরেফিন

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ


[email protected]
© 2021 Bangla Tribune
Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.