এলএসডি, যার রাসায়নিক নাম লাইসার্জিক অ্যাসিড ডাই-ইথ্যালামাইড এখন নতুন আতঙ্ক। ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশে এই মাদকের কথা শোনা গেলেও বাংলাদেশে নতুন করে এই মাদক এখন আলোচনায়। অনেক বছর আগে এই এলএসডির কথা শোনা গিয়েছিল, কিন্তু আবার নতুন করে ঝড় তুলেছে এই মাদক।হাফিজুর রহমান নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে এই ভয়াবহ মাদকের সন্ধান পায় পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ। হাফিজের বন্ধুদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কয়েকজনকে আটক করা হয়, যারা বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯০ অনুযায়ী, অ্যালকোহল ছাড়া অন্য কোনও মাদকদ্রব্যের চাষাবাদ, উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বহন, পরিবহন, আমদানি, রফতানি, সরবরাহ, কেনা, বিক্রি, ধারণ, সংরক্ষণ, গুদামজাতকরণ, প্রদর্শন, প্রয়োগ ও ব্যবহার করা যাবে না। এই আইন ভঙ্গকারীদের জন্য যাবজ্জীবন থেকে শুরু করে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। অথচ আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মাদকের অবাধ ব্যবসা চলছে। গাঁজা, ইয়াবার পাশাপাশি আসছে এলএলএসডি। পুলিশ বলছে, রাজধানীতে ১৫টি গ্রুপ রয়েছে, যারা এলএসডি বিক্রি করে আসছে। গ্রুপগুলো এক বছর ধরে এই এলএসডি বিক্রি ও সেবনের সঙ্গে জড়িত।
নিঃসঙ্গতা, হতাশা, একাকিত্বকে মাদকাসক্ত হওয়ার কারণ বলা হলেও শুধু এ জায়গা থেকে দেখলে আর চলছে না। অসংখ্য গোপন দুষ্টচক্র সক্রিয় হয়ে যুবসমাজের হাতে তুলে দিচ্ছে ড্রাগ। এই মাদকের নেশা শুধু ব্যক্তির সম্ভাবনাময় জীবনকেই ধ্বংস করে না, তা পরিবার, সমাজ তথা সমগ্র জাতিকেই গ্রাস করে নিচ্ছে। সাময়িক আনন্দ লাভের আশায় মানুষ, বিশেষ করে তরুণরা নেশায় আসক্ত হয়। কিন্তু সেই সর্বনাশা নেশাই ধীরে ধীরে তার জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। নেশাসক্ত ব্যক্তি নিজে নয়, তার পরিবারকেই আসলে ধীরে ধীরে মেরে ফেলে। নেশার জগতে প্রবেশ করা সহজ, কিন্তু সেখান থেকে বের হয়ে আসা দুঃসাধ্য।
আমরা বলবো এটি অপরাধ, এটি ষড়যন্ত্র। আন্তর্জাতিক মাফিয়া চক্রও এর সঙ্গে জড়িত। তরুণরাই যেহেতু দেশের ভবিষ্যৎ, তাই ষড়যন্ত্রকারীদের প্রথম লক্ষ্য যুবশক্তি। তাদের মাদকের জালে জড়িয়ে পঙ্গু ও অসাড় করে সমাজের মেরুদণ্ডকেই ভেঙে দিতে চাইছে স্বার্থান্বেষী চক্রান্তকারীরা। কিন্তু কেন পারছি না আমরা সেই জাল ছিন্ন করে আমাদের তারুণ্যকে সুপথে আনতে?
আন্তর্জাতিক পাচারকারীদের মাধ্যমে সারা পৃথিবীর যেকোনও প্রান্তে সহজলভ্য হয়ে উঠেছে মাদক। বাংলাদেশে মাদকাসক্তি এমন এক ভয়ংকর সমস্যা, যা স্থায়ী রূপ নিয়েছে। তরুণ-যুবকদের বড় একটা অংশ কেন এই আত্মঘাতী আসক্তির শিকার হলো তার কারণ অনুসন্ধান জরুরি। কিন্তু নিয়মিত মাদক সেবনের জন্য যে বিপুল অর্থের প্রয়োজন তা জোগাড়ের জন্য সেটা তারা পায় কোথায়? দরিদ্র বা মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলেমেয়েরা বাবা মা’কে বিরক্ত করে, গরিব ঘরের ছেলেরা চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই করতেও দ্বিধাবোধ করে না।
কিন্তু আমরা যদি একে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করি তাহলে এর সঙ্গে দুর্নীতির যোগসূত্র খুঁজে পাবো। যে ছেলেগুলো এখন পুলিশের তত্ত্বাবধানে আছে তারা ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান। এরাই মাদকের, বিশেষ করে এমন অপ্রচলিত মাদকের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত হয়। দু’-একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানও যে জড়িত হয় না, তা নয়। একটা কথা মানতেই হবে, দুর্নীতি এবং নীতিপঙ্গুতা যদি একটি সমাজে প্রকট হয়ে ওঠে তখন সামাজিক পরিসরটি দখল করে নেয় অপরাধীরা।
হাফিজের আত্মহত্যা বা মৃত্যু, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেদের এই গ্রেফতার এক ভয়াবহ নৈতিক বিপর্যয়কে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো। সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে এসব খেয়াল রাখা দরকার ছিল পরিবারের। কিন্তু এটাও তো সত্য যে, এরকম মোরাল পুলিশিং করে, গোয়েন্দাগিরি করে সবকিছুর সমাধান হয় না। একটা সমাজে, পরিবারে, রাজনীতি ও প্রশাসনের সব পরিসরে যদি অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ প্রবল বেগে ঢুকতে থাকে তখন তার প্রভাব পড়ে সব ক্ষেত্রে। দুর্নীতিতে সমাজের শক্তিধর বা ক্ষমতাবান মানুষেরা জড়িত। কোনও সরকারি বা বেসরকারি কাজ পেতে, নাগরিক সুবিধা পেতে, দ্রুত কাজ আদায় করতে, চাকরি পেতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ঘুষ লেনদেন বা দুর্নীতি ছাড়া কাজ হয় না এমন ধারণা কমবেশি সবার। অল্প বয়সী শিক্ষার্থীরাও নকল থেকে প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো দুর্নীতিতে নিজেদের জড়িয়ে ফেলছে। জড়িয়ে পড়ছে কিশোর গ্যাংয়ে, করছে খুনখারাবি, মাদকের ব্যবসা এবং যৌন সহিংসতা।
যারা আমরা কথায় কথায় মূল্যবোধ নিয়ে নসিহত করি, তারাই আবার খুশি হই সন্তানের বাবা মামা চাচাদের চাকরির বাইরের ঘুষের আয় থাকলে। মূলত দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থে প্রতিনিয়ত মাত্রাতিরিক্ত বৈভব আর স্ফুর্তির প্রদর্শনী চলছে সমাজে। এবং একে আমরা সামাজিক বৈধতাও দিয়েছি।
অবক্ষয়ের কথা আমরা জানি। একটি শিশুর প্রাথমিকভাবে নৈতিক ও মানবিক গুণাবলি তার পরিবারের মাধ্যমেই শুরু হয়। তার পরে তাকে শিক্ষা দেয় সামাজিক পরিবেশ এবং বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা। এখন পরিবারে, শিক্ষাঙ্গনে যদি সে দুর্নীতির অর্থ আর অনিয়মের ছোটাছুটি দেখে, তাহলে তার মগজে কী ঢুকে সেটাও ভাবা দরকার। আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও কোনও উপাচার্যের যেসব কাহিনি গণমাধ্যমে আসছে ,এরপর আর ছাত্রদের ভালো পথে চলার উপদেশ দেওয়া যায় না। আমাদের সমাজ, প্রশাসন, রাজনীতি যে পথে চলছে এরপর আর কাউকে নৈতিকতার ছবক দেওয়া চলে না।
অবক্ষয় যেভাবে আমাদের ঘিরে ধরেছে তাতে আমরা সন্তানদের মূল্যবোধের শিক্ষা দিতে পারবো না, এটাই স্বাভাবিক। ক্ষমতাবৃত্তে যারা বিচরণ করেন তারা জনগণের এই বিপন্নতার বোধকে থোড়াই পাত্তা দেন। কয়েক বছর আগে ঘটনা করে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হয়েছিল। কিন্তু এতে বড় কোনও ফল আসেনি। ইয়াবা আর অন্যান্য মাদক তো আছেই, এখন এলএসডি আর আইসের কথা শুনতে হচ্ছে।
মাদক একটি সামাজিক ব্যাধি। এর ভয়ংকর প্রতিক্রিয়ায় আমরা দিশেহারা। কিন্তু আমাদের ঘুরে দাঁড়াতেই হবে। প্রথম ও প্রধান হাতিয়ার জনসচেতনতা। সমাজের প্রতিটি মানুষকে বুঝতে হবে মাদক আসলে মৃত্যুর সমার্থক। পরিবারগুলোর বড় ভূমিকা আছে। পরিবারের মধ্যে সুস্থ স্বাভাবিক আনন্দদায়ক পরিবেশ বজায় রাখা একান্তভাবে জরুরি। পরিবারের মধ্যে বিশ্বাসের একটা বাতাবরণ তৈরি করতে হবে। নিজের সুখ, দুঃখ, ভালো লাগা– মন্দ লাগার অনুভূতি যেন একজন সবার সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারে। তাহলেই কাজ অনেকটা সহজ হবে। সেই সঙ্গে গতানুগতিক একঘেয়ে জীবন থেকে মুক্তির জন্য সুস্থ সাংস্কৃতিক বিনোদনমূলক পরিবেশও জরুরি।
আর বেশি জরুরি বাবাদের বেশি সচেতন হওয়া। সন্তান যখন বুঝতে পারে তার বাবার বিত্তবৈভব স্বাভাবিক পথে নয়, তখন তার ভেতর যে প্রতিক্রিয়া হয় সেটাই তাকে টেনে নিয়ে যায় নানা অপরাধের দিকে। এরমধ্যে মাদক, যৌন সহিংসতা অন্যতম।
সীমান্তপথে মাদক চোরাচালান ও দেশের ভেতরে মাদকদ্রব্যের কেনাবেচা অত্যন্ত কঠোর হাতে বন্ধ করতে হবে। এ ব্যাপারে বিজিবি, পুলিশ, মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের জবাবদিহি নিশ্চিত করা একান্ত জরুরি। কারণ, তাদের একাংশের সহযোগিতা ছাড়া এই মাত্রায় মাদকের ব্যবসা চলা সম্ভব নয়। প্রশাসনকে কঠোর হতেই হবে, কিন্তু মাদকবিরোধী অভিযান প্রমাণ করেছে অন্যায়কে শায়েস্তা করতে গিয়ে প্রতি-অন্যায় ঘটে গেলে সাফল্য আসে না।
লেখক: সাংবাদিক




