X
বৃহস্পতিবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০২২
২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

সুখ-দুঃখ

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
০৬ জুলাই ২০২২, ১৬:১৭আপডেট : ০৬ জুলাই ২০২২, ১৬:৩১

মানুষের দুঃখ অর্থের অভাবে যে পরিমাণ ঘটে, তার চেয়ে বেশি ঘটে শান্তির অভাবে। ব্যক্তিগত ও সামাজিক সম্পর্ক মানুষের নিকট সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকে কত অর্থ আছে তার চাইতে তার বেশি চাওয়া একটি উদ্বেগহীন জীবন। তাই দারিদ্র্য দূর করলেও যে দুঃখ কমবে সে নিশ্চয়তা নেই।

কথাগুলো উঠলো কারণ একটি রিপোর্ট। বিশ্বের সবচেয়ে বড় জরিপ প্রতিষ্ঠান গ্যালাপের ‘২০২২ গ্লোবাল ইমোশন্স রিপোর্ট’-এ বলা হলো বিশ্বের সপ্তম দুঃখী দেশ হলো বাংলাদেশ। প্রতিবেদনে রাগ, দুঃখ ও মানসিক চাপকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। গ্যালাপের জরিপে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশের এক হাজার লোকের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। সেখানে তাদের রাগ, ক্ষোভ, দুঃখ, মানসিক চাপ, শারীরিক কষ্ট ইত্যাদি আছে কিনা, তা জিজ্ঞাসা করা হয়। এতে দেখা গেছে, প্রতি ১০ জনে ৩ জনের বেশি লোক বলেছেন, তাদের শারীরিক যন্ত্রণা আছে। চার জনের মধ্যে একজন বলেছেন, তারা নিজেদের দুঃখী মনে করেন। জরিপে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের ২৩ শতাংশ পুরো জীবনযাপন ও সমাজ ব্যবস্থা নিয়ে ক্ষুব্ধ।

মানুষের আকাঙ্ক্ষা-তালিকায় অগ্রাধিকার পাবে কী কী, সে আন্দাজ করতে আমরা অধিকাংশই ভুল করি। সরকার জিডিপি আর অবকাঠামো উন্নয়নের কথা বড় করে ভাবে, দারিদ্র্য দূরীকরণ, কর্মসংস্থান, শিক্ষাপ্রসার বা স্বাস্থ্যসেবা প্রসারের চেষ্টা করে। কিন্তু মানুষ অধিক গুরুত্ব দেয় হয়তো মাদকাসক্তি থেকে মুক্তি পাওয়াকে বা নানা প্রকার নিগ্রহ থেকে পরিত্রাণ পাওয়াকে।

দুঃখী দেশের তালিকায় আমাদের এমন একটা উঁচু অবস্থান প্রমাণ করে জিডিপির সঙ্গে মানুষের জীবনে উন্নয়নের সম্পর্ক নেই। দেশের জিডিপি বাড়লেই আসলে মাথাপিছু জিডিপি বাড়ে না। জিডিপি দিয়ে দেশের মধ্যে কলকারখানায়, চাষের জমিতে, ব্যবসায় মোট কতখানি উৎপাদন হচ্ছে, তা আঁচ করা যেতে পারে বটে। কিন্তু মানুষের জীবনে কী উন্নতি হলো, তার জীবনযাত্রায় কতখানি স্বাচ্ছন্দ্য এলো, সে তার ছেলেমেয়েকে ভালো স্কুলে পাঠাতে পারল কিনা বা অসুখ-বিসুখে ভালো ডাক্তার পেলো কিনা, সেটা জানা যায় না। এখানেই হয়তো সুখের সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দূরত্ব বা দুঃখের সঙ্গে সম্পর্ক। জিডিপি বাড়লে সকলের রোজগার বাড়বে, এমন বাধ্যবাধকতা নেই। এমনটা হতেই পারে, কেবল গুটিকতক মানুষের আয় বাড়লো। বস্তুত তা-ই হয়েছে। 

শিক্ষাঙ্গনে নানা অপ্রীতিকর ঘটনা, নারীর প্রতি সহিংসতা বাড়তে থাকা বা সাম্প্রদায়িক শক্তির আস্ফালন, সংঘাতময় রাজনীতি, যানজট, অনাচার, অবিচার, বেকারত্ব ইত্যাদির প্রভাবে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক স্তরে দুশ্চিন্তা এতই বেড়ে যাচ্ছে যে মানসিক শান্তি তলিয়ে যাচ্ছে। আর এ কারণেই মানুষ অসুখী হয়ে পড়ছে। যদি পরিবারে স্নেহ প্রীতি পারস্পরিক শ্রদ্ধা থাকে, সমাজজীবনে থাকে সমঝদার বন্ধু ও শুভেচ্ছাসম্পন্ন আত্মীয়, তাহলে দরিদ্র মানুষও মহাসুখে হাস্যমুখে নিদ্রা যেতে পারে।

মানুষের কাছে সম্পদ হলো তার অনুদ্বিগ্ন হৃদয়, বড় বাড়ি বা স্থাপনা নয়। এ কথাটি নতুন নয়। অতৃপ্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষী মানুষ সুখী হতে পারে না। কিন্তু সাধারণ মানুষ আক্ষরিক অর্থেই দুঃখী হয় সম্পদ না থাকা থেকে নয়, বরং ভয়ংকর উদ্বেগের কারণে। দু’বছরের করোনায় নিম্নবিত্ত মানুষদের ক্ষতি হয়েছে অনেক বেশি। বহু পরিবার ঋণে জর্জরিত হয়েছে, অনেকে গৃহহারা হয়েছে, কর্মহীনতা বা সামান্য বেতনে আংশিক সময়ের কাজ পরিবারে এবং সমাজে নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে এসেছে।  

এমন অবস্থায় যদি শিক্ষকের গলায় জুতার মালা পরে, যদি শিক্ষককে হত্যা করা হয়, সমাজের ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীগত অনাচার বাড়ে তাহলে মানুষের জীবনে থাকে কী? আমাদের রাজনীতির সংস্কৃতিটাই এমন যে রাজনৈতিক নেতারা সাধারণ মানুষের সমস্যার প্রতি যথেষ্ট সংবেদনশীল থাকেন না।

প্রায় প্রতিটি জনপদে সমাজবিরোধীদের আধিপত্য বেড়েছে। ফলে মানুষে মানুষে যে সুন্দর সম্পর্ক ছিল তা আজ বিদ্বেষ আর বিভাজনের পরিপূর্ণ। বাস্তবে সম্পর্ক-স্পৃহাই মানুষের সবচেয়ে বেশি চাওয়া। সম্পদ বা অর্থ আয়ত্ত করা অপেক্ষা মানুষের নিকট গুরুত্বপূর্ণ তার প্রতিবেশীর সঙ্গে সুসম্পর্ক। তার চাওয়া সন্তান যেন শিক্ষাঙ্গনে গিয়ে ভালো শিক্ষা পায়, মেয়েটি যেন নিরাপদে ঘরে ফিরে।

মানুষে-মানুষে সম্পর্ক  আর্থিক সামর্থ্যের দ্বারা নির্ধারিত হয় না। কিন্তু সমাজে সেটাই ঘটছে এখন। এবং দুঃখের অনেক কারণের মধ্যে এটিও একটি। মুক্ত বাজারের হাত ধরে আপেক্ষিক দারিদ্র্য কমানো গেছে গত কয়েক দশকে। উচ্চবিত্তের আকাশছোঁয়া আকাঙ্ক্ষা পূরণে রাষ্ট্রের জোগানও হচ্ছে পর্যাপ্ত। ধনীদের এখানে সম্পদের পাহাড় তো বিদেশে পর্বত। এখানে সুখ না পেলে বাইরে গিয়ে তা পাওয়ার চেষ্টা। কিন্তু সমান্তরালে সাধারণ যে মধ্যবিত্ত মানুষ, তাদের স্বাচ্ছন্দ্যের সূর্য অস্তমিত। আর যারা এরও বাইরে, সর্বকালেই প্রান্তিক, তাদের হালহকিকত তো বলা বাহুল্য। তাদের কাছে প্রবৃদ্ধি, উন্নয়ন, সমৃদ্ধি কী রকম অন্য ভাষার শব্দ মনে হয় এখন। সত্যি বলতে কী, ক্ষুধাক্লিষ্ট, আত্মপ্রত্যয়ের অভাবে নুইয়ে পড়া দেশবাসীর বড় অংশকে দুঃখ থেকে মুক্ত করার প্রচেষ্টা কী হবে সেটা ভাবনায় আসা দরকার।

লেখক: সাংবাদিক

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
পরিবার কল্যাণ সহকারী পদে ‘ভুল তথ্য দিয়েও’ উত্তীর্ণ, নিয়োগ বাতিলের দাবি
পরিবার কল্যাণ সহকারী পদে ‘ভুল তথ্য দিয়েও’ উত্তীর্ণ, নিয়োগ বাতিলের দাবি
মার্চে ফিফা প্রীতি ম্যাচ খেলবে বাংলাদেশ 
মার্চে ফিফা প্রীতি ম্যাচ খেলবে বাংলাদেশ 
৮ ডিসেম্বর যেভাবে হানাদার মুক্ত হয় কুমিল্লা
৮ ডিসেম্বর যেভাবে হানাদার মুক্ত হয় কুমিল্লা
ইকুরিয়ার নিয়ে এলো ‘ইন্সটা পে’
ইকুরিয়ার নিয়ে এলো ‘ইন্সটা পে’
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ