ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে বাংলাদেশে। যারা এর চর্চা করে তারা দুর্গাপূজার সময় দেখিয়েছে, এবার পঞ্চগড়ে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের ওপর হামলা করেও দেখিয়েছে। ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা কাকে বলে সেটা তারা বুঝিয়ে দিতে পারছে বারবার।
পঞ্চগড়ে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের জলসাকে কেন্দ্র করে গত কয়েক দিনে যা ঘটেছে, তা শুধু বেদনাদায়ক বা নিন্দনীয় নয়, উদ্বেগজনকও। কোনও সম্প্রদায়ের একটি ধর্মীয় আয়োজনকে কেন্দ্র করে দুজন তরুণের প্রাণহানি, প্রায় দুইশ’ বাড়িঘর ও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাকে এখন হয়তো স্বাভাবিক বলেই মনে করা হবে। বাংলাদেশে যে শুধুই ধর্মকে কেন্দ্র করে অশান্তির ঘটনা বেড়েছে, তা-ই নয়; সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ, বিধিনিষেধ আরোপ ও ধর্মকে কেন্দ্র করে সামাজিক অস্থিরতা ঘটানোর অধিকার প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। যেমন সরকার শেষ পর্যন্ত এই জলসা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।
এ পর্যন্ত ১০টি মামলা দায়ের হয়েছে এবং ১৩০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে মঙ্গলবার পর্যন্ত জানা গেছে। কিন্তু এগুলো আসলে কিছুই না। কারণ, শেষ পর্যন্ত এসব মামলা ও গ্রেফতারে আসল অপরাধীদের ধরাছোঁয়া যায় না।
তবে এ দেশের সংখ্যালঘুরা বেঁচেছিলেন কবে সেটা বড় প্রশ্ন। বেড়েছে ঘৃণাজনিত অপরাধের ঘটনা, সহিংসতা, সাম্প্রদায়িক উগ্রতা, ধর্মভিত্তিক সন্ত্রাস। বেড়েছে ধর্মাচরণে বাধা দেওয়ার ঘটনা। তারই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে পোশাক না পরায় নানাভাবে নারীদের হেনস্তা করার ঘটনাও।
বাংলাদেশে যারা রাজনৈতিক ইসলাম চর্চা করে তারা আহমদিয়াদের মুসলমান হিসেবে স্বীকার করে না। এটি ধর্মীয় বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়। এ নিয়ে বিতর্ক নিশ্চয়ই আছে এবং থাকতে পারে। কিন্তু কোনও সম্প্রদায়কে জলসা করতে না দেওয়া কিংবা বাড়িঘরে হামলা চালানোর মতো অপরাধ করে যখন সফল হওয়া যায় তখন সমাজে ধর্মীয় বিভেদের ছবিটা আরও স্পষ্ট হয়।
হামলাকারীরা যে দলেরই হোক না কেন সরকার তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে – এটা হলো স্বাভাবিক চাওয়া। কিন্তু তদন্তের আগেই যদি অপরাধী চিহ্নিত করা হয় রাজনৈতিক জায়গা থেকে, তাহলে অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাবে, যেমন আগের সব ঘটনায় থেকেছে।
প্রশাসনিক ব্যর্থতা অবশ্যই খুঁজে দেখতে হবে। কিন্তু যে রাজনৈতিক ব্যর্থতায় সহিংস সাম্প্রদায়িক শক্তির এই বাড়বাড়ন্ত সেটা রুখবার রাজনীতি নেই দেশে। ষাটের দশক থেকে দেশের প্রগতিশীল বাম রাজনীতি শক্তি যতখানি সংগঠিতভাবে মানুষকে সচেতন ও প্রগতিমুখী করার কাজ করেছিল, সেই শক্তিতে বেশ ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। এমনকি তখন সাধারণ রাজনৈতিক দলগুলোও ছিল অনেক উদার ও অসাম্প্রদায়িক। এখন তাদের রাজনীতি হলো ধর্মীয় কার্ড ব্যবহার করা এবং সহিংস মৌলবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে আপস করে চলা। সেই দুর্বলতারই সুযোগ নিচ্ছে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, যাদের মূল দর্শন সহিংসতা ও বিভেদ।
যারা সচেতন, যারা দেশকে নিয়ে ভাবেন, যারা দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত, যারা ক্ষমতা কাঠামোর ভেতরে বসে হালুয়া রুটির ভাগবাটোয়ারায় লিপ্ত নন, তারা এই সত্যটা বুঝতে পারছেন। আর পারছেন বলেই বিপন্নবোধ করছেন। তারা বুঝতে পারছেন, যে শক্তিতে আমরা ১৯৭১-এ ঐক্যের বন্ধন গড়েছিলাম সেই শক্তি আলগা হতে শুরু করেছে এবং সেটা হচ্ছে রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে। এখানেই আমাদের সমূহ বিপদ।
তাদের নির্দেশে বিজ্ঞানভিত্তিক পাঠ্যবই বদলে যায়, তারা যখন যা মন চায় করতে পারে। এরা মাহফিলে, ওয়াজে, সামাজিক মাধ্যমে অশিক্ষা কুশিক্ষা ছড়াচ্ছে দাবানলের মতো। মানুষের ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা সাম্প্রদায়িক হিংসাকে জাগানোর কাজ করছে এই রাজনৈতিক ইসলাম, যার সঙ্গী হয়েছে একদা যারা উদার ছিলেন তারা। নিজেদের স্বার্থেই জঘন্য কুরুচিকর ভাষায় চলে এদের প্রচার। কে কত বেশি জঘন্য ভাষা ব্যবহার করতে পারে, কে কতটা উত্তেজনা ছড়াতে পারে, কতটা সাম্প্রদায়িকভাবে তাতিয়ে দিতে পারে সাধারণ মানুষকে, তারই যেন প্রতিযোগিতা চলছে। অসহিষ্ণুতা তাদের রাজনীতির পুঁজি। গণতন্ত্রের দেশে মানুষ কি এটাই চায়? নিশ্চয়ই না। অবশ্য সাধারণ মানুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছা কোথাও প্রতিফলিতও হচ্ছে না।
যারা অন্য ধর্মের চর্চায় বাধা দেয়, খুনখারাবি করে, জ্বালাও পোড়াও করে, তারা শুধু অসহিষ্ণু নয়, তারা বর্বর, ধর্মান্ধ খুনি, অপরাধী। একটা লড়াই চলছে সমাজে, প্রকাশ্য লড়াই। এ লড়াই ধর্মনিরপেক্ষতা এবং মৌলবাদের মধ্যে শুধু নয়, লড়াইটা বিজ্ঞানমনস্কতা আর ধর্মান্ধতার মধ্যে, যুক্তিবাদিতা আর কুসংস্কারের মধ্যে, জ্ঞান আর অজ্ঞানতার মধ্যে, সচেতনতা আর অচেতনতার মধ্যে, উদারতা আর পঙ্কিলতার মধ্যে।
সমাজে অশিক্ষা, জড়তা আর মূর্খতা চলবে কিনা সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে। শিক্ষা আর সচেতনতার পাশাপাশি ধর্মান্ধ রাজনীতিকে মোকাবিলা করার নীতি না থাকলে সমাজটাকে অন্ধকারেই ফেলে রাখবো আমরা। পরিস্থিতি না বদলালে পঞ্চগড় বা কুমিল্লার মতো একটা করে ঘটনা ঘটবে, আর আমরা ভাববো এ আর নতুন কী?
লেখক: সাংবাদিক




