পাকিস্তান: মানুষ মারে গণতন্ত্রও মরে

মোস্তফা হোসেইন
২০ মে ২০২৩, ১৫:৪৯আপডেট : ২০ মে ২০২৩, ১৫:৪৯

পাকিস্তানে কি আরেকটি শতভাগ সামরিক সরকার আসছে? চলমান সংকট নিরসনের সম্ভাবনা কতটুকু? অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত দেশটি কি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে সহসা? দেশটির কপালে যে উর্দির ঢাকনা পড়ছে, তা থেকে মুক্তি পাওয়ার কি কোনও সম্ভাবনা নেই?  রাজনৈতিক সহিংসতার শেষ হবে কখন?

এমন আশঙ্কা সবসময়ই কমবেশি থাকে দেশটিতে। কিন্তু সম্প্রতি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান গ্রেফতার হওয়ার পর যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তাতে আশঙ্কাটা জোরালো হয়ে পড়েছে আবার। আসলে কী হতে যাচ্ছে সেখানে?

আমেরিকা রাশিয়া দ্বন্দ্ব থেকে শুরু করে আরও কিছু ঘটনার জেরে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে গদি ছাড়তে হলো কিছু দিন আগে। অভিযোগের হিসাব করা কঠিন। ইতোমধ্যে তার বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০০-এর বেশি। ক্ষমতা হারানো ইমরান খান সেই থেকে সামরিক কর্তাদের এক হাত নিতে কার্পণ্য করলেন না। প্রতিটি সমাবেশে, বক্তৃতায় তিনি সামরিক হস্তক্ষেপের প্রতিবাদ করেই যাচ্ছিলেন। ক্ষমতা হারানোর সঙ্গে সঙ্গে দেশটির সাধারণ নির্বাচনের দাবিও তিনি করে আসছিলেন। সামরিক কর্তারা এর পাল্টা কী ব্যবস্থা নিতে পারে সেটা ইমরান খানের অজানা ছিল না। তিনি আগাম বলেও দিয়েছিলেন, সামরিক বাহিনী সমর্থক সরকার তাকে জেলে ঢুকিয়ে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করবে। অবশ্য এরই মধ্যে অর্থনৈতিক কারণে সে দেশের প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন স্থগিতও করা হয়েছে। বাকি আছে জাতীয় পরিষদের নির্বাচন। দুটি নির্বাচন একসঙ্গে অনুষ্ঠানের বিষয়ে পাকিস্তানের প্রায় সব রাজনৈতিক দল একমত হলেও কবে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে সেই সিদ্ধান্ত হয়নি। ঘটনাসমূহ বিশ্লেষণ করলে সহজেই বোঝা যায়, সরকার জাতীয় পরিষদের নির্বাচনও স্থগিত করতে পারে।

অন্যদিকে ইমরান খানকে প্রকাশ্যে গুলি করার পর কর্মীদের মধ্যে ধারণা জন্মায় তাদের নেতাকে জেলখানায় নেওয়া হলে তিনি আরও বেশি অনিরাপত্তায় পড়বেন। এমনকি জেলখানায় ঢুকিয়ে তাকে সরকার হত্যাও করতে পারে। লক্ষণীয়, যে ইমরান খান আজকে সেনা কর্মকর্তাদের গোষ্ঠী উদ্ধার করছেন, তিনিও কিন্তু তাদের সমর্থনেই ক্ষমতায় এসেছিলেন এবং তিনি সরকার পরিচালনাও করেছেন তাদের প্রতিভূ হিসেবে। আজকে তাদের কারণে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর উপলব্ধি করতে পেরেছেন। তিনি আগেই জানতেন, পাকিস্তানে সামরিক বাহিনীর অপছন্দের কারও পক্ষে ক্ষমতায় থাকা কিংবা আসা সম্ভব নয়। কিন্তু তিনি এটাও জানতেন যে সামরিক বাহিনীর মদদে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে, সেই সামরিক বাহিনী তাকে আর সমর্থন করছে না। যে কারণে তিনি ক্ষমতা হারানোর পর থেকেই দেশব্যাপী আন্দোলন গড়ে তোলেন। লক্ষণীয়ভাবে সেই আন্দোলনে জনসম্পৃক্ততা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ঠিক ওই মুহূর্তে তাকে গ্রেফতার করে জেলে ঢুকিয়ে আসলে একটা ইঙ্গিতই দেওয়া হয়েছে যে তিনি বা তার দলকে আর সহজে চলতে দেওয়া হবে না।

সবকিছু বুঝেই তিনি ব্যাপক আন্দোলনের পথ বেছে নেন। দু’দিনের আন্দোলনে তার দলের কর্মীরা মোটামুটি গোটা পাকিস্তানে আলোড়ন তৈরি করতে সক্ষম হয়। পুলিশও বসে নেই। সহস্রাধিক মানুষ আহত হয়ে গেছে ইতোমধ্যে। একইসময় ৫ জন মানুষ খুন হয়েছে এই আন্দোলনে। ইতোমধ্যে পৃথিবীর অনেক দেশে অবস্থানকারী পাকিস্তানিরা বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রকাশ করতে শুরু করেছে। পরিস্থিতি বিশ্লেষণকালে ইমরান খানের মুখপাত্র রাউফ হাসান আতঙ্কজনক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। বলেছেন, এমনিতেই চরম রাজনৈতিক সংকট ও অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত দেশটি। এরমধ্যে ইমরান খানের গ্রেফতার হওয়ায় দেশে চূড়ান্ত অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে। মোট কথা পাকিস্তানের গন্তব্য যে কোনদিকে এই মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পাকিস্তানের পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন জানিয়েছে, পাকিস্তানকে অত্যন্ত ঠান্ডামাথায় সমস্যা সমাধানের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। সেখানে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে নাজুক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, পাকিস্তানকেই তা সামাল দিতে হবে।

যে অর্থনৈতিক দুরবস্থার কথা বলে, যে দুর্নীতির কথা বলে তাকে পদচ্যুত করা হয়েছে, পাকিস্তান কি সেই সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে? এমন প্রশ্নের জবাব যে নেতিবাচক তা বলার অপেক্ষা রাখে না। গত এক দশকের মধ্যে পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। আইএমএফ থেকে আপৎকালীন তহবিল সংগ্রহের জন্য ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার ঋণ নেওয়ার পরও তাদের অর্থনৈতিক দুরবস্থা মোটেও সন্তোষজনক নয়।

প্রধানমন্ত্রী শেহজাদ শরিফকে অর্থনৈতিক সংকট কাটানোর চেষ্টা করতে হচ্ছে, এরমধ্যে সন্ত্রাসী ও জঙ্গি তৎপরতা দেশটির রন্ধ্রে রন্ধ্রে ভিত শক্তিশালী করতে সক্ষম হয়েছে। অভাবনীয়ভাবে পাকিস্তানকে রীতিমতো গ্রাস করে রেখেছে জঙ্গিবাদ। ২০২৩ সালের প্রথম চার মাসে ৪৩৬টি সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে। এতেই প্রমাণ হয় জঙ্গিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই যেন পাকিস্তানের একটি গোষ্ঠীর অন্যতম লক্ষ্য। এই জঙ্গিরা হতাহতের পর পরই আবার হতাহতের সংখ্যা উল্লেখ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা প্রচার করে আতঙ্কও ছড়িয়ে দিচ্ছে।

তারপর আবার গত বছর প্রলয়ঙ্করী বন্যায় পাকিস্তানের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটিয়েছে। প্রকৃতিও যেন তাদের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে। বন্যার ক্ষয়ক্ষতি পূরণ করার চেষ্টাকালেই শুরু হয়েছে প্রচণ্ড খরা। তারপর অকাল বৃষ্টিও তাদের পেয়ে বসেছে।

এমন পরিস্থিতিতে সরকার যে মুহূর্তে মানুষ ও প্রকৃতিসৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবিলা করতে যাচ্ছিল, তখনই ইমরান খান লাখ লাখ কর্মীদের নিয়ে কঠোর আন্দোলনে নামেন।

অনেকে মনে করছেন, আসলে শেহজাদ শরিফের সামনে আর কোনও পথও খোলা ছিলও না। অন্যদিকে পাকিস্তানের রাজনীতির গতি-প্রকৃতিও অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। শেহজাদ শরিফ কি বলতে পারবেন, ইমরান খানের মতো পরিণতি তার জন্যও অপেক্ষা করছে না? আর এটাই তো পাকিস্তানের চিরকালীন রূপ। তবু গণতন্ত্রের স্বপ্ন দেখে পাকিস্তানের কিছু মানুষ। যদিও দেশটির ইতিহাস বড়ই নিষ্ঠুর, মানুষ মারে মানুষ মরে কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কার হয় না ওদের দেশে। গণতন্ত্র ওদের খাতায়ই লেখা থাকে, তারা গণতন্ত্রের মুখ দেখে না। কখনও দেখবে এমন আলামতও কি দেখা যায়?

/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
যেখানে সকালে বারান্দায় এলেই দেখা মেলে জোড়া রংধনুর
যেখানে সকালে বারান্দায় এলেই দেখা মেলে জোড়া রংধনুর
সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের আড়ালে কী
সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের আড়ালে কী
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
সর্বশেষসর্বাধিক