আহ্ ডলার

প্রণব মজুমদার
২১ আগস্ট ২০২৩, ১৬:৩৩আপডেট : ২১ আগস্ট ২০২৩, ১৬:৩৩

বিশ্ব অর্থনীতিতে আলোচিত মুদ্রার নাম মার্কিন ডলার। এর আধিপত্যে বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি টালমাটাল। ডলারের প্রভাবে অভ্যন্তরীণ পণ্য বাজারেও মূল্যস্ফীতিতে সাধারণ ভোক্তারা উদ্বিগ্ন! এ অবস্থা বহু বছর ধরে। বাংলাদেশে প্রধান রফতানি পণ্য পাট ও পাটজাতের সোনালি সুদিনের পর যখন তার স্থলে তৈরি পোশাক স্থান করে নিলো প্রতাপের সঙ্গে, তখন থেকেই বৈদেশিক লেনদেনে মার্কিন ডলারের ব্যাপক আধিপত্য আমাদের দেশে। রফতানিকারকদের সুবিধা দেওয়ার নামে টাকার অবমূল্যায়ন বারবার অব্যাহত থেকেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভে টান পড়তে দেখেছি আমরা! দেশে রফতানির চেয়ে আমদানি বেশি হওয়ায় এর নেতিবাচক প্রভাব অভ্যন্তরীণ বাজারেও পর্যবেক্ষণ করছি। বিশেষ করে করোনার সংকটকালে মার্কিন ডলার দিয়ে অতি মূল্যে পণ্য আমদানির ফলে স্থানীয় বাজারে বেশি দামে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনায় ভোক্তাদের নাভিশ্বাস দেখেছি।

জুলাই মাসে টাকার বিপরীতে ডলারের মান এক লাফে ২.৮৫ টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৮.৮৫ টাকা। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে, ডলারের বিপরীতে টাকার ইতিহাসে এটি সবচেয়ে বড় দরপতন।

৩ জুলাই অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকারস বাংলাদেশ বা এবিবি এবং বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলার অ্যাসোসিয়েশন বা বাফেদা এক বৈঠকের পর যৌথভাবে ডলারের দাম সমন্বয়ের এই ঘোষণা দেওয়া হয়।

এতে বলা হয়, আন্তব্যাংক লেনদেনের ক্ষেত্রে ডলার ১০৮.৮৫ টাকা করে কেনাবেচা করা হবে। একই দামে কেনা হবে রেমিট্যান্সও।

রফতানির ক্ষেত্রে এক টাকা কমে ১০৭.৫০ টাকা এবং আমদানির ক্ষেত্রে ১০৯ টাকা করে কেনাবেচা করা হবে।

গত এক বছর যাবৎ ডলারের বিপরীতে টাকার দর ধারাবাহিকভাবে কমছেই। নানা পদক্ষেপ নিয়েও এই দরপতন ঠেকানো যাচ্ছে না।

গত বছরের পহেলা জুন ১ মার্কিন ডলার বিক্রি করা হয়েছিল ৮৯ টাকা। আর ২০২৩ সালের ৪ জুলাই ডলারের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৮.৮৫ পয়সা। সে হিসেবে এক বছরের ব্যবধানে ডলার প্রতি দাম বেড়েছে ১৯.৮৫ টাকা। আগস্ট মাসে সরকারি ব্যাংকে মার্কিন ডলার ১০৯.৫০ টাকায় বিক্রি হলেও খোলা বাজারে তা ১১৪ টাকা।

এতদিন যাবৎ বাংলাদেশে রফতানি, রেমিট্যান্স এবং আমদানির ক্ষেত্রে আলাদা আলাদা ডলার রেট ছিল।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের শর্ত দিয়েছিল, সব ক্ষেত্রে যাতে ডলারের একক দর থাকে। এছাড়া ডলারের বিপরীতে টাকার মান কীভাবে নির্ধারিত হবে সেটি যাতে বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু তা হয়নি!

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বাজারের ওপর ছেড়ে দিলে টাকার অবমূল্যায়ন কি হতেই থাকবে?

দেশে দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোয় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বা মজুত ও আন্তর্জাতিক লেনদেনে যুগ যুগ ধরে মার্কিন ডলারের আধিপত্য দেখা গেছে। কিন্তু মার্কিন মুদ্রাটির সেই জৌলুস খোয়া যেতে বসছে। রাজনৈতিক রেষারেষি, ডলারের মূল্যবৃদ্ধিসহ নানা কারণে আন্তর্জাতিক লেনদেনে অনেক দেশ এখন নিজেদের কিংবা বিকল্প মুদ্রা ব্যবহার করছে। আবার এসব মুদ্রা বৈদেশিক মুদ্রার মজুত হিসেবেও রাখা হচ্ছে। বৈশ্বিক লেনদেন ও বৈদেশিক মজুত সংরক্ষণে বিকল্প মুদ্রাগুলোর ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় মার্কিন ডলার কোণঠাসা হয়ে পড়ছে, যেটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘ডি-ডলারাইজেশন’। এরই মধ্যে ব্রিকস জোট ডলারের বিকল্প হিসেবে নতুন একটি বৈশ্বিক মুদ্রা চালুর কথা ভাবছে। আর সম্ভাব্য সেই মুদ্রার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে আরও ২৪টি দেশ।

ইয়াহু ফাইন্যান্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও ডলারের বাড়তি দরের কারণে বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রার ভাণ্ডারে ডলারের হিস্যা কমে ৪৭ শতাংশে নেমে এসেছে; আগের বছর অর্থাৎ ২০২১ সালে যা ছিল ৫৫ শতাংশ।

রিজার্ভে ও লেনদেনে ডলারের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া মুদ্রাগুলোর মধ্যে রয়েছে ইউরোপের ইউরো, রাশিয়ার রুবল, চীনা ইউয়ান, ভারতীয় রুপি ইত্যাদি। এরই মধ্যে ব্রিকস জোট বিশ্বব্যাপী বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বা মজুত সংরক্ষণে মার্কিন ডলারের যুগের আধিপত্য কমাতে মাঠে নেমেছে। ব্রিকস হলো বিশ্বের পাঁচটি উন্নয়নশীল দেশের জোট। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা মানে BRICS । পাঁচটি দেশ মিলে গঠিত অর্থনৈতিক জোট ব্রিকস আগে সাউথ আফ্রিকা ছিল না। তখন জোটটির নাম ছিল ব্রিক। ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা অর্থনৈতিক এ জোটে যুক্ত হয়।  

আগস্ট মাসেই বাংলাদেশ আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংস্থা ব্রিকসের  সদস্য পদ লাভ করতে পারে বলে অভিমত দিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেন। সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসার এক বৈঠকের পর সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ের সময় এ তথ্য দেন তিনি।

তিনি বলেন, ব্রিকস ব্যাংক সম্প্রতি বাংলাদেশকে অতিথি হিসাবে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। ব্যাংকে আমাদের সদস্য করেছে। আগামীতে তারা ব্রিকসে বাংলাদেশকে সদস্য করবে, আগস্ট মাসে ওদের সম্মেলন আছে। প্রধানমন্ত্রী সেখানে অংশ নেবেন বলে আশা করা যাচ্ছে।

উন্নয়নশীল অথবা সদ্য শিল্পোন্নত দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেশ ঊর্ধ্বমুখী। সেই সঙ্গে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ঘটনাবলির ওপর তাদের উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে। তাই এই জোটকে বেশ প্রভাবশালী বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা।

স্বাধীন বাংলাদেশের শুরু থেকেই মার্কিন ডলার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বেশ শক্তিশালী। আমদানি-নির্ভর দেশে মার্কিন ডলারের মাধ্যমে রফতানিকারক দেশগুলোর মূল্য পরিশোধ করতে গিয়ে আমাদের ওপর বেশ চাপ সৃষ্টি হয়। বৈদেশিক মুদ্রা পরিশোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভে এর প্রভাব পড়ে। বৈশ্বিক সংকটে বিভিন্ন দেশেও মূল্যস্ফীতি ঘটেছে। দেশের খাদ্যসহ বেশ কিছু পণ্য অতিরিক্ত দামে মার্কিন ডলারে পরিশোধ করতে গিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে হিমশিম খেতে হচ্ছে। কারণ, মার্কিন ডলারের দাম বেড়ে যাওয়া এবং সংকট। তাছাড়া রফতানিকারকদের সুবিধা দেওয়া। প্রতি মার্কিন ডলার দেশি মূল্যে বেড়ে তিন অঙ্কের সংখ্যায় (ডিজিট) দাঁড়িয়েছে। সরকারের যুক্তি হলো রফতানিকারকদের প্রেষণা ও উৎসাহ দান। কিন্তু প্রশ্ন হলো রফতানিকারক সবাই কি সত্যিকারের দেশপ্রেমিক? প্রণোদনার অর্থও কি দেশের অভ্যন্তরে থাকে? বিদেশি ব্যাংকে তো বাংলাদেশি ধনী শ্রেণির জনগণের অর্থ এমনি এমনি বৃদ্ধি পায় না? তাছাড়া সেকেন্ড হোমের ধারণা কি দেশপ্রেম? ব্যাংক ঋণপত্রের মাধ্যমে রফতানিকারকদের গর্হিত নানা কর্মকাণ্ডের কথা নাই বা বললাম! মার্কিন ডলারের চাপ সইতে পারছে না বাংলাদেশ ব্যাংক। ডলার সাশ্রয়ে দেশে সেপ্টেম্বর থেকে টাকা-রুপির ডেবিট কার্ড চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এ কার্ড দিয়ে দেশের ভেতরে টাকা দিয়ে কেনাকাটাসহ বিভিন্ন বিল পরিশোধ করা যাবে এবং পাশাপাশি ভারত ভ্রমণের সময় রুপিতে খরচ করার সুযোগ পাবেন ব্যবহারকারীরা। মার্কিন ডলারের স্থলে ৬০ শতাংশ মূল্য পরিশোধ রুপিতে শুরু হয়েছে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশি মুদ্রা টাকায়ও লেনদেন হবে শিগগির।

যে ২৪টি দেশ ব্রিকসের নেতৃত্বে নতুন রিজার্ভ মুদ্রার প্রবর্তন চাইছে তারা ইতোমধ্যে এই জোটেও যোগ দেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ব্রিকস জোটে দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রদূত অনিল সুকলল একটি প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে বলেন, ইতোমধ্যে ১৩টি দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে যে তারা এই জোটে যোগ দিতে আগ্রহী। ব্রিকস জোটে যোগ দিতে আগ্রহী উল্লেখযোগ্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব, ইরান, আর্জেন্টিনা, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), আলজেরিয়া, মিসর, বাহরাইন ও ইন্দোনেশিয়া।

রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বার্তা সংস্থা স্পুটনিকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্রিকস জোট এখন নতুন একটি বৈশ্বিক মুদ্রা প্রবর্তনের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, যা মার্কিন ডলারকে ছাড়িয়ে যাবে।

বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে ব্রিকসের সদস্য ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা মার্কিন ডলারে বৈদেশিক মজুত সংরক্ষণ থেকে দূরে সরে আসছে এবং দ্রুতগতিতে সোনার মজুত গড়ে তুলছে।

চলতি মাসের শেষ দিকে দক্ষিণ আফ্রিকায় পরবর্তী ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। তাতে নতুন অনেক দেশকে এই জোটের সদস্য করা এবং নতুন বৈশ্বিক মুদ্রার চালুর বিষয়ে বড় সিদ্ধান্ত আসতে পারে। বিশ্ব বাণিজ্যে একাধিক মুদ্রার লেনদেন ব্যাপক হারে শুরু হলে নির্দিষ্ট একটি মুদ্রার আধিপত্য থাকবে না তা নিশ্চিত। তাই বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের দিকেই তাকিয়ে আছে।

লেখক: কথাসাহিত্যিক; অর্থকাগজ সম্পাদক

[email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
দিল্লীতে আগুনে ৮ বাংলাদেশি আহত, গুরুতর অবস্থা তিন জনের
দিল্লীতে আগুনে ৮ বাংলাদেশি আহত, গুরুতর অবস্থা তিন জনের
ফুল দিয়ে ড. খলিলুর রহমানকে বরণ
ফুল দিয়ে ড. খলিলুর রহমানকে বরণ
প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে বন্ধ কলকারখানা চালু ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সভা
প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে বন্ধ কলকারখানা চালু ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সভা
ত্রিমুখী তদন্তের ‍মুখে বেবিচকের প্রকৌশলী শরিফুল
ত্রিমুখী তদন্তের ‍মুখে বেবিচকের প্রকৌশলী শরিফুল
সর্বশেষসর্বাধিক