একটা বাংলা পত্রিকায় দেখলাম ডেঙ্গু সংক্রমণ নিয়ে বিশদ তথ্য, রচনা, সাক্ষাৎকার ও মতামত নিয়ে চার পাতার একটা জ্যাকেট ছাপা হয়েছে। দু’তিনটা বিজ্ঞাপনও আছে। মশার কয়েল ও রেপেল্যান্ট কোম্পানিরা বিজ্ঞাপন দিয়েছে। এই জ্যাকেটটা দেখে খুব ভালো লেগেছে। মনে হয়েছে ওই পত্রিকাটা একটু ভিন্নভাবে চিন্তা করেছে। আর সবাই যা করছে তার বাইরে গিয়ে চিন্তা করছে।
তবে যেই ভয়টা পাচ্ছিলাম তাই-ই হলো। কয়েক দিন পরই আরেকটা পত্রিকা জ্যাকেট না হলেও ডেঙ্গু নিয়ে দুই পাতার একটা ক্রোড়পত্র প্রকাশ করলো। আমরা ধরে নিচ্ছি যে এই পত্রিকাটা ওই পত্রিকায় ডেঙ্গু নিয়ে জ্যাকেট দেখে তাদের ক্রোড়পত্রটা ছাপার কথা ভেবেছে। খুব ভালো হয়নি, তবে দেখে ভালো লেগেছে। মনে প্রশ্ন জেগেছে– এই পত্রিকার মনে এই বিষয় নিয়ে চিন্তাটা ওই পত্রিকার আগে এলো না কেন?
ওই পত্রিকার জ্যাকেট দেখার পরই এই চিন্তাটা মাথায় আসতে হলো কেন?
আমাদের পত্রিকাগুলোতে বেশ কয়েক বছর ধরে জ্যাকেট-সংস্কৃতি চলছে। কোনও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোকপাত করতে মূল পত্রিকাকে চার পাতায় মুড়ে একটা জ্যাকেট হয়। এর সঙ্গে বিজ্ঞাপনও জড়িত থাকে। মূল লক্ষ্যই এখানে বিজ্ঞাপন ‘আহরণ’। যেই বিষয়ে জ্যাকেট হবে সেই সংক্রান্ত ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের কাছে বিজ্ঞাপন চাওয়া হয়। যারা দিতে পারেন তারা দেন, যারা পারেন না, তারা দেন না। যারা বিজ্ঞাপন দিতে পারেন তাদের খবরাখবর ও সাক্ষাৎকার ছাপা হয়; যারা পারেন না তাদের কথা কম ছাপা হয়।
এই প্রবণতা নিয়ে মন খারাপ করার কারণ দেখি না। গণমাধ্যম এবং ব্যবসা একে-অপরের সঙ্গে জড়িত। একজনকে ছাড়া আরেকজন এগোতে পারে না। মন খারাপ হয় তখনই যখন দেখা যায় একটা পত্রিকা কোনও একটা আইডিয়া উদ্ভাবন করে সেটা নিয়ে জ্যাকেট বা সাপ্লিমেন্ট প্রকাশ করেছে এবং তার পরপরই তাদের দেখে আরও অনেক পত্রিকা একই কাজ শুরু করে।
যারা পরে শুরু করছে, তাদের মনেও এই ভাবনাই কাজ করে যে প্রথমে যেই পত্রিকা আইডিয়াটা নিয়ে কাজ করেছে এবং বিজ্ঞাপন পেয়েছে, পরে করলেও তেমন বিজ্ঞাপনই পাওয়া যাবে। কোনও একটা পত্রিকা ‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ’ বিষয়ে ক্রোড়পত্র প্রকাশ করলে দেখা যায় আরও কয়েকটা পত্রিকা এই একই বিষয় নিয়ে কাজ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
এমন অনেক বিষয় নিয়ে কথা বলা যায়, যা আমাদের প্রায়ই চোখে পড়ে। বাংলাদেশে একজন কোনও নতুন আইডিয়া চিন্তা করে ব্যবসা শুরু করলে বাকি সবাই তাকে দেখে ঝাঁপিয়ে পড়ে তা আমরা জানি। কিন্তু যারা প্রথমে শুরু করেছিলেন তাদের মতো সবাই যে ব্যবসা করতে পারবেন তার নিশ্চয়তা আসলে নেই। এই একই তত্ত্ব সংবাদমাধ্যমের জন্যও প্রযোজ্য। কেউ একটা নতুন কনটেন্ট আবিষ্কার করে তা বিক্রি করে সার্থক হতে পারলে যে বাকি সবাই সার্থক হবেন তা মনে করার কারণ দেখি না।
বিজ্ঞাপন সংবাদপত্রের জন্যে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পত্রিকার গুরুত্ব ও প্রচার সংখ্যা বিবেচনা করেই বিজ্ঞাপনদাতারা বিনিয়োগ করেন। এমনও দেখা গেছে যে কোনও একটা পত্রিকার প্রচার সংখ্যা খুব বেশি নয়, কিন্তু জনবান্ধব, ব্যবসাবান্ধব সাংবাদিকতা ও কনটেন্টের কারণে সমাজে সম্মানজনক একটা অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে। এমন পত্রিকায় বিজ্ঞাপনদাতারা বিনিয়োগ করেন তাদের ব্র্যান্ডের মুখ উজ্জ্বল করার জন্যে। আর যেসব পত্রিকার প্রচার সংখ্যা অনেক বেশি, সেখানে বিনিয়োগ করা হয় আপামর জনসাধারণের কাছে পণ্যের খবর পৌঁছে দেওয়ার জন্যে।
আমাদের গণমাধ্যমে এখন এখন দুই রকম ধারা– একটা সাংবাদিকতা এবং আরেকটা কনটেন্ট তৈরি। সাংবাদিকতা হচ্ছে তথ্য প্রদান ও উদঘাটন এবং কনটেন্ট হচ্ছে বিনোদন। এই ধারা বিশ্বজুড়েই চলছে। আমাদের ধারণা, ‘কনটেন্ট’ ভবিষ্যতে আরও বেশি প্রাধান্য পাবে। মানুষ সাংবাদিকতার চেয়ে বিনোদনে বেশি আগ্রহী হবে। তবে কোন তথ্য, কোন কনটেন্ট আমরা মানুষকে পড়াবো, দেখাবো বা শোনাবো সেই বিবেচনার ওপরই নির্ভর করছে বিজ্ঞাপন।
সামাজিক মাধ্যম ইতোমধ্যে বিজ্ঞাপনের বাজারে একটা বড় পরিবর্তন এনেছে, যার সঙ্গে পুরোনো মাধ্যমগুলো কেমন করে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকবে তা নিয়ে অনেক চিন্তাভাবনা চলছে, তবে আরও বেশি গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
সব খবরের কাগজেই কি বিজ্ঞাপনদাতারা বিজ্ঞাপন দেবেন? তা হয়তো নয়। তবে কোন কাগজে দেবেন? বিগত সময়ে পত্রিকাগুলোর বিজ্ঞাপনগ্রাহী বিজনেস ম্যানেজাররা যেভাবে বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করেছেন, তারা এখনও ঠিক তেমন করেই তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। পুরোনো ব্যাকরণ। বিজ্ঞাপন ম্যানেজারদের মধ্যে তাদের পত্রিকার সংবাদ এবং কনটেন্ট নিয়ে যে বিশদ জানা নেই তা বোঝা যায়। পত্রিকার কনটেন্ট-স্রষ্টারা তাদের সঙ্গে আলাপ করেন কিনা তা বোঝা যায় না। হয়তো শুধু বলেন– ‘এক্স খাত নিয়ে একটা সাপ্লিমেন্ট হবে; যাও বিজ্ঞাপন নিয়ে এসো’। তারা এলে বিজ্ঞাপনদাতারা অনেক রকম প্রশ্ন করেন কিন্তু তেমন গ্রহণযোগ্য উত্তর খুঁজে পান না। তারা বিজ্ঞাপনদাতাদের প্রতিষ্ঠানের খবর ছাপেন, সেই সম্পর্ক বজায় রাখতে মাঝে মাঝে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়।
ক’দিন আগে পর্যটন দিবস ছিল। প্রায় সব পত্রিকায়ই এই বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তবে প্রতিবেদনগুলো জীবনমুখী ছিল না। শুধুই বলা হয়েছে দেশে কী নেই, কেন নেই, কী অপর্যাপ্ত ইত্যাদি। এসব সাধারণ পাঠক জানেন। ভালো হতো যদি সাধারণ মানুষের জন্যে কিছু করা যেত। যেমন, কোথায় যাবেন, কীভাবে যাবেন, কত খরচ হবে ইত্যাদি। আমাদের আগ্রহ আরও অনেক বাড়তো।
দুই-একদিন আগে বিশ্ব হার্ট দিবসে একটা সংবাদপত্রের হার্টের স্বাস্থ্য নিয়ে একটা জ্যাকেট বেশ ভালো লেগেছে। খুব বেশি বিজ্ঞাপন ছিল না, তবে কনটেন্ট এতই আকর্ষণীয় ছিল, হার্টের রোগী না হয়েও যে কারও পড়তে ইচ্ছে হবে।
মিডিয়া ব্যবসাটাই হচ্ছে আইডিয়ার ব্যবসা। আইডিয়াই বিজ্ঞাপনদাতা ও বিজ্ঞাপনকে আমন্ত্রণ জানাবে। বিজ্ঞাপনদাতাদের চোখে পড়া এবং গণমানুষের আস্থা অর্জন করাই হচ্ছে বিজ্ঞাপন থেকে আয়ের মূলমন্ত্র। সব সংবাদপত্রে যদি একটা করে ছোট্ট বিভাগ থাকে, যারা অবিরাম কনটেন্ট নিয়েই গবেষণা করছেন, তাহলে পরিস্থিতি অন্য রকম হতে পারে। কুড়ি বছর আগে যেমন করে বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করেছি এখন যদি তেমন করেই কাজ করি তাহলে এই প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে আমরা পিছিয়ে পড়বো।
প্রযুক্তি এখন প্রতি সেকেন্ডে লাফিয়ে লাফিয়ে চলছে, এবং প্রযুক্তির মাঝেই শত শত আইডিয়া আছে, যা নিয়ে দারুণ কনটেন্ট তৈরি করা যায়, যা দিয়ে বিজ্ঞাপনদাতাদের নজর কাড়া সম্ভব।
লেখক: গল্পকার ও যোগাযোগ পেশাজীবী
*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।




