ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন স্বল্প আয় ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেগুলোর জন্য ২০১৫ সালে স্পেশাল ইনসেনটিভ অ্যারেঞ্জমেন্ট ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট শীর্ষক একটি অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা চালু করে, যা জিএসপি প্লাস নামে পরিচিত।
জিএসপি প্লাসের অধীনে ইউরোপের বাজারে ট্যারিফ লাইনের ৬৬ শতাংশ শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে উন্নয়নশীল দেশের। এ জন্য অবশ্য শিশু শ্রম, বাধ্যতামূলক শ্রম, বন ধ্বংস, পরিবেশ দূষণ, ইকোসিস্টেমের ক্ষতি, পণ্য সরবরাহ খাতে সুশাসন এবং মানবাধিকারের মতো কমপ্লায়েন্সসহ প্রায়
৩২টি শর্ত পূরণ করতে হয়।
উল্লেখ্য, এভরিথিংস বাট আর্মস-এর আওতায় অস্ত্র ও গোলাবারুদ ছাড়া সব পণ্য ইউরোপের বাজারে রফতানির ক্ষেত্রে নির্ধারিত ১২ শতাংশ শুল্ক সুবিধা দিতে হয় না। বর্তমানে বিশ্বের ৪৭টি দেশ এই শুল্ক ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার সুবিধা ভোগ করছে। বাংলাদেশ এ সুবিধা থেকে বেশ লাভবান হচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হওয়ার পর অর্থাৎ ২০২৯ সালের পর বাংলাদেশ আর ইবিএ সুবিধা পাবে না। জিএসপি’র আওতায় চলে আসবে। যেহেতু বাংলাদেশ এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন করবে সেহেতু বাংলাদেশকে জিএসপি প্লাসের আওতায় বাণিজ্য সুবিধা গ্রহণের জন্য আবেদন করতে হবে এবং ৩২টি শর্ত পূরণ করতে হবে। এ জন্য বাংলাদেশের এখনই প্রয়োজন সুস্পষ্ট কর্মকৌশল। বলা হয়, ইবিএ-এর আওতায় সর্বোচ্চ সুবিধাভোগী হলো বাংলাদেশ। এ সুবিধা নিয়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক উন্নয়ন ঘটিয়েছে। বাংলাদেশের রফতানি মূলত তৈরি পোশাক খাতনির্ভর। ২০২২ সালে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে মোট রফতানির প্রায় ৯০ ভাগ হয়েছে বাংলাদেশ থেকে, এ সময় ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ২২ হাজার ৬৭২ মিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের পণ্য বাংলাদেশ থেকে আমদানি করেছে। বাংলাদেশের এসব রফতানি সবই ছিল ইবিএ-এর আওতায়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি বাণিজ্যে খুবই পরিচিত জেনারেলাইজড স্কিম অব প্রিফারেন্স (জিএসপি)। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার শর্ত শিথিল করে এ স্কিমের আওতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে বিশেষ ট্যারিফ সুবিধা পায়। এর আগে এ সুবিধা জেনারেল এগ্রিমেন্ট অব ট্যারিফ অ্যান্ড ট্রেড বা গ্যাট নামে পরিচিত ছিল। এ সুবিধা এলডিসিভুক্ত দেশের জন্য প্রযোজ্য। বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হয়েছে। ২০২৭ সালে বাংলাদেশ জিএসপি সুবিধা পাবার যোগ্য থাকবে না। তাছাড়া মার্কিন জিএসপি সুবিধার স্কিমের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর জন্য ২৫ বছর মেয়াদি এ স্কিম চালু করেছিল ১৯৭৬ সালের ১ জানুয়ারি। এ মুহূর্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চাইলেও জিএসপি সুবিধা বাংলাদেশকে দিতে পারবে না।
বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্পের যাত্রা শুরু আশির দশকে। নব্বইয়ের দশকে প্রথম বাধা আছে শিশু শ্রমের নামে। এ ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে বাংলাদেশকে অনেক কাজ করতে হয়েছে। বাংলাদেশ দক্ষতা ও যোগ্যতা দিয়ে সে পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়। পরবর্তীতে তাজরীন ফ্যাশনে আগুন, শ্রম অধিকার এবং রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর ২০১৩ সালের জুনে বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা স্থগিত করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জুড়িয়ে দেয় ১৬ দফা অ্যাকশন প্ল্যান। জিএসপি বলে সারা বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করার আপ্রাণ চেষ্টা চালানো হয়েছে, এখনও চলছে। অথচ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জিএসপি স্কিমের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২০ সালে। নতুন করে এখনও কোনও স্কিম ঘোষণা করেনি, নতুন কর্মসূচি নিয়ে মার্কিন সিনেটে আলোচনা চলছে।
বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি তৈরি পোশাক রফতানি করে থাকে। বিশ্বের চাহিদার ৭.৩৮ ভাগ তৈরি পোশাক রফতানি করে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। আর ৩১.৬৪ ভাগ রফতানি করে চীন প্রথম অবস্থানে। দ্বিতীয় অবস্থান নিয়ে বাংলাদেশকে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হয় ভিয়েতনামের সঙ্গে, ৫.৯৬ ভাগ রফতানি করে তাদের অবস্থান তৃতীয়। চতুর্থ অবস্থানে তুরস্ক ও ভারত। সে সময় চীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রফতানি করতো ডিউটি ও কোটা-ফ্রি সুবিধায়, আর বাংলাদেশ রফতানি করতো ১৫-২০ ভাগ হারে ডিউটি প্রদান করে।
তারপরও বাংলাদেশ প্রতিযোগিতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে টিকে আছে ভালোভাবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগের সরকারের আমলে অবশ্য চীনের সে বাণিজ্য সুবিধা বাতিল করা হয়। এখন জানা দরকার, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে কোন কোন পণ্যে রফতানিতে জিএসপি সুবিধা প্রদান করতো, যা তারা স্থগিত করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১২০টি পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে জিএসপি সুবিধা প্রদান করতো, ৯৭ ভাগ পণ্যের ওপর মার্কিন বাণিজ্য সুবিধা বা জিএসপি সুবিধা থাকলেও এর মধ্যে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ছিল না বা নেই। বাংলাদেশের মাত্র কয়েকটি পণ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি করে জিএসপি সুবিধা পেতো, পণ্যগুলো হলো- টোব্যাকো জাতীয় পণ্য, সিরামিক পণ্য (টেবিলওয়্যার), প্লাস্টিক পণ্য, খেলাধুলার সামগ্রী, আয় হতো মাত্র ১০ মিলিয়ন টাকা। বাংলাদেশের রফতানি আয় যেখানে ২০২২ সালে ৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, সেখানে এ টাকা কোনও বিষয় না। এ পরিমাণ রফতানিতে জিএসপি সুবিধা না পেয়ে বাংলাদেশের তেমন কোনও আর্থিক ক্ষতি হয়নি, বড় ক্ষতি হয়েছে ইমেজ সংকট নিয়ে। সেই জিএসপি স্থগিত নিয়ে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য অপপ্রচার করার চেষ্টা করা হয়েছে অনেক।
জিএসপি ফিরে পেতে পশ্চিমাদের ১৬ দফা অ্যাকশন প্ল্যান বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা হতো প্রতি মাসেই। প্রতিটি দফা বাংলাদেশ আন্তরিকতার সঙ্গে এটি বাস্তবায়নের আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। বিশেষ করে শ্রম অধিকার, শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ, শ্রম আইন সংশোধন বিষয়ে অগ্রগতির কথা মেনে নিলেও বলা হতো, আরও উন্নতি করার সুযোগ আছে, এমন ডিপ্লোমেটিক ভাষা ব্যবহার করে দিনে পর দিন বিষয়টিকে ঝুলিয়ে রাখা হয়। এরইমধ্যে মার্কিন জিএসপি স্কিমের মেয়াদ শেষ হয় ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর, আর শুরু হয়েছিল ১৯৭৬ সালের ১ জানুয়ারি। এখন বিশ্বের কোনও দেশ এই জিএসপি স্কিমের আওতায় বাণিজ্য সুবিধা পাচ্ছে না। তারপরও আমরা মার্কিন জিএসপি স্কিমের সুবিধা স্থগিতের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছি। এখন বলা হচ্ছে, আবারও যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এমন স্কিম চালু করে, তখন বাংলাদেশের বিষয় বিবেচনা করা হবে। যদি জিএসপি প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়েই থাকে, তাহলে এত পানি ঘোলা করার কারণ বা প্রয়োজন কী ছিল, সে প্রশ্ন কেউ তোলেন না বা তোলার সাহস পান না। জিএসপি এখন বাংলাদেশের জন্য একটি রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। জিএসপি’র মেয়াদ শেষ হওয়ার সাড়ে ৩ বছর পার হলেও আমরা সেই জিএসপি সুবিধা চালুর জন্য তদবির করেই যাচ্ছি।
এবারও জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগদানকালে প্রধান উপদেষ্টা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় জিএসপি ফিরে পাবার এজেন্ডা রাখা হয়েছে।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার হংকং মিনিস্টারিয়াল বৈঠকে স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে (এলডিসিভুক্ত) উন্নত দেশগুলো ৯৭ শতাংশ পণ্যে শুল্ক ও কোটামুক্ত রফতানি সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেনি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনেক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ চুক্তি স্বাক্ষর করে। টিগফা বৈঠকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জোরালো দাবি জানানো হতো সে দেশ থেকে পোশাক তৈরির জন্য তুলা আমদানি করতে। বিভিন্ন জটিলতার কারণে আমেরিকা থেকে নৌপথে তুলা আসতে যে সময় লাগে তাতে তুলার গুণগত মান ঠিক থাকে না, সে কারণে বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি করে উৎসাহী হতো না। বাংলাদেশের তুলা প্রয়োজন প্রায় ৮০ লাখ বেল, এর ৯৯ ভাগই আমদানি করতে হয়। তারপরও বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে মোট চাহিদার ৯ ভাগ আমদানি করলেও এখন ১৪ ভাগ তুলা আমদানি করছে। সঙ্গত কারণেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সেই তুলা দিয়ে তৈরি পোশাক রফতানি করে বাণিজ্য সুবিধা পেতেই পারে।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সচিবালয়, ঢাকা।
*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।




