বছরে একবার অন্তত একজন হিজড়ার সঙ্গে আমার কথা হয়। বিশেষ করে মিরপুরে আসবার পর থেকে এমনই দেখছি। কিন্তু প্রতিবারই দেখছি আমাদের আলাপে কী যেন একটা সমস্যা হচ্ছে! বলাবাহুল্য, বাসায় হিজড়া একজনের আগমনের হেতু মূলত বাৎসরিক হিসাবে একটা টাকা তুলতে আসার ভেতরেই সীমিত। দৈনন্দিন পরিসরে এরচেয়ে বেশি যোগাযোগ আমার এখনও হয়ে ওঠেনি, যদিও আমার হাউসমেটকে দেখি এই ক্ষেত্রে আমার থেকে এগিয়ে থাকতে। আমাদের এলাকায় যিনি আসেন তিনি বারবার বলেন যে বছরে এই একবারই এই চাঁদাটা তারা তোলেন এবং এক্ষেত্রে এলাকা ভাগ করা আছে।
এক এলাকার লোক আরেক এলাকায় চাঁদা তুলতে যায়না। তো, কত টাকা নেওয়া হবে সেটা নিয়ে একটা তর্ক প্রতিবারই হয়। আমাকে দেখামাত্রই এবং কথা বলার পর এই অংকটা বাড়তে থাকে বলে বাসার কারও কারও ধারণা। কিন্তু সেটা মূল বিষয় নয়, অন্ততপক্ষে এই লেখায়। প্রসঙ্গটা অন্যত্র।
মিরপুরে আসবার পর থেকে লক্ষ্য করছি, যেদিন বাসায় নির্দিষ্ট একজন টাকা তুলতে আসেন,বাসার বিভিন্ন তলার লোকজনের মধ্যে একটা হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে যায়।কেউ দ্রুত দরজা বন্ধ করতে যায়। কেউ জানালা দিয়ে উঁকি মারে।বাসার শিশুসহ কাজের লোকেরাই এমন করে বলে আমার অনুমান। কেউ আর সামনে আসতে চায়না। যেন একটা খুব ভয়ের ব্যাপার ঘটে গেছে। বিষয়টা আমার ভাল না লাগাতে আমি একদিন দরজা খুলে বাহিরে দাঁড়িয়ে চাঁদা তুলতে আসা একজনের সাথে আনেকক্ষণ কথা বললাম। বিল্ডিংয়ের সবাইকে শোনানোর জন্য বললাম, এরকম দৌড়াদৌড়ি করবার কী আছে! প্রয়োজনের চেয়ে একটু উচ্চস্বরেই কথাগুলো বললাম। উদ্দেশ্য ছিল বিল্ডিংয়ের সবাইকে অন্তত আমার কথাগুলো শোনানো। এক পর্যায়ে আরও বললাম, আমরাতো সবাই মানুষ!
এই সব বলাবলিতে কতটুকু কী হলো জানিনা। তবে আমি বলতে থাকলাম। কিন্ত পরে আরেকদিন আরেকজন হিজড়ার সাথে কথা বলতে যেয়ে আমি এও বলি যে (সেদিনও একই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, বিভিন্ন ফ্লোরের লোকজনের অহেতুক ছোটাছোটি শুনেই আমি বের হয়ে আসি), আপনারও খুব জোরে কথা বলে,তালি দিয়ে বা বকঝকা করে ভয় দেখানোর দরকার ছিলনা। প্রাসঙ্গিক ভেবে আমিতো এটাও বলে ফেলললাম যে এখনতো সরকার আপনাদের স্বীকৃতি দিয়েছে (এভাবে ”আপনাদের” না বলে যদি বলতে পারতাম আমরাতো এখন স্বীকৃতি পেয়েছি, তাহলে ভালো হতো; পরে ভেবে দেখেছি। এই ছোট ছোট বিষয়গুলো আসলে ছোট না)।
তো,এই জায়গা থেকেই আমার ভাবনাটার শুরু হলো। স্বীকৃতির কথাটা বলে কি আমি একটা নৈতিক চাপ প্রয়োগ করলাম? আমার দৃষ্টি এড়ালোনা যে আমার কথায় চাঁদা তুলতে আসা মানুষটা একটু হলেও দমে গেল। একটু অপ্রস্তুত হলো যেন। কী করণীয় বুঝলোনা যেন!
আমাদের এই অঞ্চলসহ দক্ষিণ এশিয়ায় সাধারণভাবে, যে জনসমষ্টিকে একাডেমিক পরিসরে ট্রান্সজেন্ডার বলা হচ্ছে আজকাল, তারা হিজড়া নামে পরিচিত। ইদানিং এই হিজড়া জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভূক্ত করতেই তৃতীয় লিঙ্গ শব্দটিকে একটি বর্গ (ক্যাটাগরি) হিসাবে ব্যবহারের চল শুরু হয়েছে বিভিন্ন পাবলিক পরিসরে। আমাদের অঞ্চলে হিজড়াদের একটি দীর্ঘদিনের জীবিকার উপায় হলো ‘টাকা তোলা’। এই টাকা তোলার কাজটা যেমন বাজারঘাটে করা চলে, তেমনি শহরের আবাসিক এলাকায়ও করা হয়। বাড়িতে নবজাতকের আগমন হিজড়াদের উৎফুল্ল্ করে, গান নাচের মধ্য দিয়ে তারা কিছু আয় করে। একবার বাজার করতে যেয়ে দেখেছিলাম এক ছোট সবজি দোকানি একজন হিজড়াকে দশ টাকা দিল এবং সবার সামনেই একটা চুমুও খেল ঠোঁটেঠোঁট লাগিয়ে। দেশের ভেতর এরকম খোলাখুলি চুমু খাবার দৃশ্য সেবারই প্রথম।
ইদানিং পরিস্থিতি বদলেছে। রাস্তায় বিশেষ করে ট্রাফিক সিগনালে হিজড়াদেরকে টাকা চাইতে দেখা যায় বলে খবর বেরিয়েছে। রাস্তাঘাটে অনেক বেশি সংখ্যক হিজড়াদের দেখা যায়। এরকম আগে আমরা দেখিনি।
সাধারণভাবে আমরা ধরেই নেই যে রাষ্ট্রের দিক থেকে যখন কোন স্বীকৃতি আসে সেটা নিশ্চয়ই কোন একটি প্রান্তিক অবস্থাকে ভালোর দিকেই নিয়ে যায় (১৯৭১ এর পর বাংলদেশের রাষ্ট্রের দিক থেকে সেরকম একটি বহুল আলোচিত স্বীকৃতি হচ্ছে বীরাঙ্গনা। কিন্তু সেই স্বীকৃতি বীরাঙ্গনাদের কি দিতে পেরেছে সেটা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গেছে!) সেরকমটাই বলা হয়েছিল হিজড়াদের ক্ষেত্রে। বলা হয়েছিল, এই স্বীকৃতি হিজড়াদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আবাসনের অধিকারকে সংরক্ষণ করবে এবং নাগরিক হিসাবে তার প্রন্তিকতাকে রোধ করবে। পাসপোর্টে সহ অন্যান্য সরকারী দলিলে হিজড়া শব্দটির ব্যবহার থাকবে ইত্যাদি।
কিন্তু এসব বলাবলির তিন বছর হয়ে গেলেও তেমন কোন উদ্যোগ কিন্তু এখনও চোখে পড়ছেনা আমাদের। এরকম একটি পরিস্থিতিতে হিজড়াদের করণীয় কী? ভাবছিলাম এটাকেই কি স্বীকৃতির শয়তানি (কানিং অব রিকগনিশান) বলা যায় কিনা, নৃবিজ্ঞানী এলিজাবেথ পোভেনেলি যেমন বলেছিলেন অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের ক্ষেত্রে? এই শয়তানির ফেরে কি আমরাও পড়ে গেলাম না? শয়তানীটা এখানেই যে তোমার কাছ থেকে সব কেড়ে, শুষে নিঃস্ব করে তারপর স্বীকৃতি প্রদান। এরকম স্বীকৃতি একটা অসম্ভব পরিস্থিতি তৈরি করে যার সঙ্গে বাস্তবের আর কোনও যোগাযোগ থাকেনা বলে মত দিয়েছিলেন পোভেনেলি।
বাংলাদেশে হিজড়াদের টাকা তোলার এই চর্চাটি বহু দিন ধরেই চলছে। এই কাজে হিজড়ারা এক ধরনের ভিক্টিমহুডকে পুঁজি করে চলে। যেমন সম্প্রতি আমাকে একজন কোনও একটা অনুষ্ঠানের জন্য টাকা তুলতে এসে বলেছিলেন: ‘হিজড়া হয়ে জন্মেছি। আরেকটু বেশি করে যেন টাকা দেন।’ তবে এটা সাধারণ মনে হয়নি আমার কাছে। বরং হিজড়ারা সমাজের হেটারোনরমেটিভ মধ্যবিত্তের (হেটারোনরমেটিভিটি একটি বিশ্বাস যেখানে মনে করা হয় দুনিয়াতে শুধু নারী আর পুরুষ, এই দুটি লিঙ্গই আছে, থাকবে এবং এটাই প্রাকৃতিক/ স্বাভাবিক!) জন্য নানা অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করেই টাকা তোলে। যেমন অস্বস্তি হেটারোনরমেটিভ মধ্যবিত্ত দেখায়, সেটাই ফিরিয়ে দেয় আর কি! এই কাজটির জন্য হিজড়াদের একটা বিশেষ ধরনের আচরণের চর্চা শিখতে হয় (আমার এক শিক্ষার্থীর গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে কীভাবে বিশেষ তত্ত্বাবধায়নে এই আচরণ আয়ত্বে আনতে হয় হিজড়াদের)।
এখন স্বীকৃতির পরও কি সেই একই কাজ হিজড়ারা করে যাবে? প্রশ্নটা প্রথম আমার মাথায় আসে কয়েক বছর আগে সাটুরিয়ার ফেরিঘাটে যেবার একজন হিজড়া কোনও বিশেষ ভঙ্গিমা না করেই আমাকে স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, ‘আমি একজন হিজড়া আমাকে সাহায্য করুন’। কথাটা আমার কানে নতুন লেগেছিল। বলাবাহুল্য, এটা স্বীকৃতি পাবার পরের ঘটনা। মনে হচ্ছিল স্বীকৃতির পর তিনি নতুন করে টাকা চাওয়ার বিষয়টি নিয়ে ভাবছেন।
স্বীকৃতির বিস্তারিত দিকগুলোর দিকে না গিয়েও বলা যায়, এর একটা অর্থ তাত্ত্বিকভাবে হিজড়া পরিচয়ের ভিন্নতাকে স্বীকার করে নেয়া। এর আরও অর্থ সরকারী বিভিন্ন বরাদ্দ ও সুবিধায় হিজড়াদের অগ্রাধিকার দেয়া ইত্যাদি (যেমন সম্প্রতি দেশে পুলিশের চাকুরিতে হিজড়াদের অন্তর্ভূক্ত করবার খবর শুনেছি; একজন হিজড়া ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচিত হয়েছেন। এগুলো ভাল খবর)। কিন্তু রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি হিজড়াদের দীর্ঘদিনের জীবিকা সংক্রান্ত চর্চাসমূহ নিয়ে কি বলে তা কিন্তু এখনও স্পষ্ট না। এ বিষয়ে কি কোনও আলোচনার চেষ্টা সরকারের দিক থেকে হয়েছে কি? বিষয়টি ভেবে দেখবার মত। পাবলিক পরিসরের নানা আলোচনা থেকে মনে হচ্ছে বাংলাদেশে অন্তত এরকম বিষয়গুলোতে সরকার কেবল স্বীকৃতি জাতীয় কাজ কর্মে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে যা হিজড়া সমাজে ইতিবাচক কোনও পরিবর্তন আনবেনা। বরং এই সংজ্ঞা ননাবিধ নৈতিক চাপ তৈরি করবে। হিজড়াদের মধ্যে যারা খুব প্রান্তিক জীবন যাপন করে, যারা ঢাকার বাহিরে বিভিন্ন এলাকায় থাকেন, তারা কিন্তু নিশ্চিত নন স্বীকৃতি তাদের কী দিয়েছে।একারণেই স্বীকৃতির রাজনীতি নিয়ে কিছু প্রশ্ন মনেতো জাগতেই পারে।
লেখক: শিক্ষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়



