ভেঙে পড়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। অরক্ষিত হয়ে পড়েছে ক্যাম্পাস। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংরক্ষিত সীমানার ভেতরেই ঘটছে একের পর এক চুরি, ছিনতাই, অপহরণের মতো ঘটনা। এসব ঘটনায় উদ্বিগ্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। নিয়মিত বিরতিতে ঘটে যাওয়া এসব ঘটনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নির্লিপ্ত ভূমিকাকেই দায়ী করছেন তারা।
দেশজুড়ে সাম্প্রতিক সময়ে স্পর্শকাতর হত্যাকাণ্ড ঘটছে। এই অবস্থায় বর্তমানের নাজুক নিরাপত্তা ব্যবস্থা দিয়ে নূন্যতম প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব নয় বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বললে তারা জানান, ক্যাম্পাস অরক্ষিত হয়ে ওঠার অন্যতম কারণ প্রবেশদ্বারগুলোতে শিথিল নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
আরও পড়তে পারেন:মন্ত্রীর অপেক্ষায় দেড় ঘণ্টা রোদে পুড়লো ৩শ’ স্কুলছাত্রী
বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের অংশ দিয়ে প্রবেশের জন্য ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক সংলগ্ন চারটি প্রবেশদ্বার রয়েছে। উত্তরাংশে সাভার সেনানিবাস সংলগ্ন প্রবেশদ্বার রয়েছে একটি। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের পশ্চিম দিকে পেছনের অংশ দিয়ে প্রবেশের জন্য তিনটি পথ রয়েছে। এছাড়া, অন্তত চারটি চোরাই পথ রয়েছে।
গত এক মাসের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, সামনের অংশের প্রবেশদ্বারগুলোর মধ্যে প্রধান ফটক, প্রান্তিক ফটক ও মীর মোশাররফ হোসেন হল ফটকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কিছুটা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে। তবে বহিরাগত মোটরসাইকেল প্রবেশের ক্ষেত্রে তেমন কোনও নজরদারি চোখে পড়েনি।
আর সাভার সেনানিবাস সংলগ্ন সেনওয়ালিয়া ফটক ও বিশমাইল ফটকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঢিলেঢালা অবস্থায় রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে বাইরের কোনও গাড়ি প্রবেশের ক্ষেত্রে এন্ট্রি করার নিয়ম থাকলেও অনেক সময় তা মানা হয় না। কিছুদিন আগে প্রক্টরের কাছে বিশমাইল ফটকে আনসার সদস্যদের দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ করেন এক ব্যক্তি। তাদের বিরুদ্ধে আরও কয়েকটি অভিযোগ থাকায় সাত আনসারকে বদলি করা হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আনসার ক্যাম্পে অসন্তোষও সৃষ্টি হয়।
বিশমাইল এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেক সময় পার্শ্ববর্তী এলাকার বাসিন্দারা দূরত্ব কমানোর জন্য নিরাপত্তাকর্মীকে ক্যাম্পাসে প্রবেশের কথা বলে সেনওয়ালিয়া ফটক ব্যবহার করে পানধোয়া এলাকায় যান। অপরাধীরাও এই সুযোগ কাজে লাগায়। তারা এই ফটক বন্ধ করার দাবি জানান।
তবে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে পেছনের অংশের প্রবেশপথগুলো। এসব পথে নিরাপত্তা চৌকি তো দূরের কথা, সীমানা প্রাচীর অসম্পূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এসব পথে নেই কোনও নিরাপত্তাকর্মী। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বেড়েছে বহিরাগত অপরাধীদের উৎপাত। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটিয়ে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যাচ্ছে অপরাধীরা।
আরও পড়তে পারেন:‘আব্বু তুমি চোখ বন্ধ করো না’
সর্বশেষ গত ১৯ জুন দুপুরে প্রকাশ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী ক্লাবের সামনে থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সাবেক ছাত্রীকে অপহরণ করে দুর্বৃত্তরা। অপহরণে ব্যবহৃত মাইক্রোবাসটি বিশমাইল ফটক দিয়ে বের হয়ে যায়। সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন, মাইক্রোবাসটি পেছনের অংশের পানধোয়া পথ দিয়ে প্রবেশ করেছিল।
এর দুই সপ্তাহ আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মচারীর স্কুল পড়ুয়া মেয়েকে বিশমাইল এলাকা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে এক দুর্বৃত্ত। মেয়েটির চিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে আসলে পালিয়ে যায় সে।
কয়েক মাস আগে বিশমাইল এলাকায় বাসায় পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে স্কুলফেরত ছাত্রী ও তার মাকে মাইক্রোবাসে উঠানোর চেষ্টা করে অপরিচিত দুই যুবক। পরে পেছন থেকে আরেকটি গাড়ি আসলে বিশমাইল ফটক ব্যবহার করে দ্রুতগতিতে ক্যাম্পাস ত্যাগ করে মাইক্রোবাসটি। এছাড়া চুরি, ছিনতাই, বহিরাগতদের বেপরোয়া গতির মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস দ্বারা সংঘটিত দুর্ঘটনা এখন ক্যাম্পাসে নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে বহিরাগত গাড়ি ও ব্যক্তিদের ক্যাম্পাসে যাতায়াত নিয়ন্ত্রণের দাবি জানিয়ে আসছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে। প্রক্টরিয়াল বডিও একই অনুরোধ করে আসছিল।
এবিষয়ে ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ গোলাম রব্বানী বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা দরকার তা নেই। এমন নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখে মনে হচ্ছে আদৌ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলতে কিছু নেই। আমরা কেউই নিরাপদ নই।’
জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী আজিজ আহমেদ আশিক বলেন,‘দেশে সাম্প্রতিক সময়ে উগ্রপন্থীদের হামলায় এমনিতেই আমরা উদ্বিগ্ন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রের ওপর হামলা হয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিন্ন মতাদর্শী ও প্রগতিশীলদের সহাবস্থান রয়েছে। তাই এখানে হামলার বিষয়টি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এখানে দ্রুত নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা উচিৎ।’
ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন জাবি সংসদ।
আরও পড়তে পারেন: ইইউ'তে সদস্যপদ বাঁচাতে জরুরি বৈঠক আহ্বান স্কটল্যান্ডের
এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার আবু বকর সিদ্দিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পেছনের অংশের ফটক ব্যবহার করেন পার্শ্ববর্তী এলাকার বাসিন্দারা। সেখানে প্রায় এক লাখ লোকের বাস। সবগুলো ফটক বন্ধ করা সম্ভব না। তবে শিগগিরিই কয়েকটি ফটক বন্ধ করে দেওয়া হবে।’
/এনএস/এমএসএম /








