এমপি লিটনকে হত্যার আগে নিজের বিশ্বস্ত চার কর্মচারীকে নিজ বাড়ির পাশাপাশি ভুট্টা রাখার জন্য ভাড়া করা গোডাউনেও অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ দিতেন কর্নেল (অব.) ডা. আবদুল কাদের খাঁন। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ আসনের সাবেক এই সংসদ সদস্য তার প্রতিপক্ষ মনজুরুল ইসলাম লিটনকে হত্যার জন্য গত এক বছর ধরে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে এসব তথ্য জানিয়েছেন ডা. আবদুল কাদের খাঁনের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) শামছুজ্জোহা।
আজ রবিবার (৫ মার্চ) বিকাল ৩টার দিকে গাইবান্ধা অতিরিক্ত জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে এই স্বীকারোক্তি দেন শামছুজ্জোহা। বিকাল সোয়া ৪টা পর্যন্ত আদালতের বিচারক মইনুল হাসান ইউসুব তার জবানবন্দি রেকর্ড করেন। পরে তাকে জেলা কারাগারে পাঠানো হয়। এদিন ভোরবেলা তাকে গ্রেফতার করা হয়।
স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে শামছুজ্জোহা আরও জানান, ওই গোডাউনেই হত্যা মিশনে অংশ নেওয়া চার কিলার ও প্রথম ভাড়া করা কিলার সুবল চন্দ্রকে নিয়ে বৈঠক করতেন কাদের খাঁন। এসব প্রশিক্ষণ ও বৈঠক সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন সুন্দরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত দফতর সম্পাদক চন্দন কুমার সরকার। আর চন্দন কুমার ও কাদের খাঁনের মধ্যে যোগসূত্র হিসেবে কাজ করতেন শামছুজ্জোহা।
জবানবন্দিতে শামছুজ্জোহা বলেন, ‘২০১২ সালে এমপি লিটন চন্দন কুমারকে দিয়ে কাদের খাঁনের বিরুদ্ধে প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ করেন দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কাদের খাঁনের বিরুদ্ধে সুন্দরগঞ্জ থানায় চারটি মামলা করে দুদক। ওই সময়ে চন্দন কুমারের সঙ্গে কাদের খাঁনের পরিচয় করে দেই আমি। পরে আমার মাধ্যমেই অর্থের বিনিময়ে কাদের খাঁনের সঙ্গে চন্দন কুমারের সমঝোতা হয়। এক পর্যায়ে চন্দন কুমারই লিটনের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে কাদের খাঁনকে মামলা থেকে অব্যহতি পেয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। এভাবে আমার মাধ্যমে কাদের খাঁনের সঙ্গে চন্দনের সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে।
শামছুজ্জোহা আরও বলেন, ‘এক বছর ধরে কাদের খাঁন এমপি লিটনকে হত্যার পরিকল্পনা করে আসছিলেন। এর মধ্যে কয়েকবার লিটনকে হত্যার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন কাদের খাঁন। সর্বশেষ হত্যায় অংশ নেওয়া চার কিলার মেহেদী, হান্নান, রানা ও শাহীনকে তার নিজ বাড়িতে প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করেন। এছাড়া তাদেরকে নলডাঙ্গা বাজারের গোডাউন ঘরে অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিতেন কাদের খাঁন। কাদের খাঁন ভুট্টা সংরক্ষণের জন্য আমার মাধ্যমে গোডাউন ঘরটি ভাড়া নিয়েছিলেন। গোডাউনে কাদের খাঁন তাদের অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ দিতেন। সেখানে কাদের খাঁনের প্রথম ভাড়া করা কিলার চন্দন কুমারের ভগ্নিপতি সুবল চন্দ্রও উপস্থিত থাকতেন। প্রশিক্ষণ শেষে গোডাউন ঘরেই রাখা হতো অবৈধ অস্ত্র। এছাড়া গোডাউনে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি কাদের খাঁন ও চন্দন কুমার চার কিলারদের নিয়ে বৈঠক করতেন। তাছাড়া এমপি লিটন বিরোধী লোকজনকে নিয়ে প্রায়ই আলোচনা ও পরামর্শ করাও হতো গোডাউনে।’
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এ সার্কেল) মো. রবিউল ইসলাম বলেন, ‘এমপি লিটন হত্যাকাণ্ডে শামছুজ্জোহার জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। গোডাউনে অস্ত্র প্রশিক্ষণ, অস্ত্র রাখার কথা সবই জানতেন শামছুজ্জোহা। হত্যা মিশন বাস্তবায়নের পর চন্দনকে বিকাশের মাধ্যমেও টাকা দেয় শামছুজ্জোহা। এছাড়া হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে শামছুজ্জোহা মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করতেন কাদের খাঁন ও চন্দনের সঙ্গে। তাছাড়া গত ১ জানুয়ারি শামছুজ্জোহা কাদের খাঁনের বগুড়ার বাসায় গিয়ে যোগাযোগ রাখেন। জবানবন্দি শেষে শামছুজ্জোহাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।’ এমপি লিটন হত্যায় জড়িত আরও কয়েকজনকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে। তাদেরকেও শিগরির আটক করা হবে বলে জানান তিনি।
এর আগে, ববিবার ভোরে সাদুল্যাপুর উপজেলার নলডাঙ্গা বাজার এলাকা থেকে শামছুজ্জোহাকে আটক করে পুলিশ। কাদের খাঁন ও চার কিলারের দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে শামছুজ্জোহার এমপি লিটন হত্যায় জড়িত থাকার বিষয়টি উঠে আসে। এরপর গত সাত দিন ধরে পুলিশ তাকে নজরদারিতে রাখে।
শামছুজ্জোহা সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ধোপাডাঙ্গা ইউনিয়নের কিশামত হলদিয়া গ্রামের আবদুল জোব্বারের ছেলে। তার সাদুল্যাপুর উপজেলার নলডাঙ্গা বাজারে একটি রড-সিমেন্টের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে। ২০০৮ সালে সংসদ নির্বাচনে মহাজোটের প্রার্থী (এরশাদ) মনোনীত সাবেক এমপি (অব) কর্নেল ডা. আবদুল কাদের খাঁনের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) ছিলেন শামছুজ্জোহা।
উল্লেখ্য, ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ৬টার দিকে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বামনডাঙ্গা ইউনিয়নে শাহবাজ (মাস্টারপাড়া) এলাকায় নিজ বাড়িতে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন এমপি মনজুরুল ইসলাম লিটন। এ ঘটনায় লিটনের বোন বাদী হয়ে সুন্দরগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।
/টিআর/টিএন/
এ সংক্রান্ত আগের খবর: ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিচ্ছেন ডা. কাদেরের পিএস শামছুজ্জোহা








