গত বছর কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় দেশের সবচেয়ে বড় ঈদের জামাতকে লক্ষ্য করে রক্তাক্ত হামলা চালিয়েছিল জঙ্গিরা। একদিকে জঙ্গি আর পুলিশের রণাঙ্গন, অন্যদিকে ঈদের জামাত। গতবছর এভাবেই আতঙ্ক ও উদ্বেগে কেটেছিল ঈদুল ফিতরের দিনটি। রক্তাক্ত হয়েছিল শোলাকিয়া। তাই এবার এখানকার ঈদ জামাতকে ঘিরে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। এবার ১৯০তম ঈদুল ফিতরের জামাত অনুষ্ঠিত হবে শোলাকিয়ায়। প্রতিবছরের মতো এবারও জামাত শুরু হবে সকাল ১০টায়। জামাতে ইমামতি করবেন ইসলাহুল মুসলিমিন পরিষদের চেয়ারম্যান মাওলানা ফরিদউদ্দিন মাসউদ। ভয়কে জয় করে এবারও শোলাকিয়ায় লাখো মানুষের ঢল নামবে বলে আশা করছে স্থানীয়রা।
বছর ঘুরে আবার এসেছে ঈদুল ফিতর। সেই দুঃসহ ক্ষত ভুলে এবারও দেশের সবচেয়ে বড় ঈদের জামাত আয়োজনের তোড়জোড় চলছে ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ময়দানে। ঈদগাহ পরিচালনা কমিটির নেতৃত্বে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও পৌরসভা শোলাকিয়ার জামাতকে সফল করতে দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছে। জামাতের প্রস্তুতি ও নিরাপত্তার বিষয়গুলো দেখতে জেলা প্রশাসকসহ র্যাব-পুলিশ ও বিজিবির কর্মকর্তারা পরিদর্শন করেছেন শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠ। দফায় দফায় বৈঠকে বসছেন তারা।
এরই মধ্যে মাঠে দাগ কাটা, বালু ফেলা, দেয়ালে রং করাসহ শোলাকিয়া ময়দানকে জামাতের উপযোগী করার কাজ শেষ হয়েছে। মুসল্লিদের চলাফেরা নির্বিঘ্ন করতে কিশোরগঞ্জ পৌরসভা নির্মাণ করেছে কয়েকটি নতুন রাস্তা ও একটি সেতু। সংস্কার করা হয়েছে ওজুখানা এবং টয়লেট। চলছে শহরের শোভাবর্ধনের কাজও। প্রস্তুত রাখা হেয়েছে বহুসংখ্যক স্বেচ্ছাসেবক ও কয়েকটি মেডিক্যাল টিম। দূর-দূরান্তের মুসল্লিদের যাতায়াতের জন্য ‘শোলাকিয়া স্পেশাল’ নামে দুটি বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থাও করেছে রেল কর্তৃপক্ষ।
স্থানীয় মুসল্লিরা জানান, বছরের পর বছর এ মাঠে নামাজ পড়ে আসছি। গত বছর যারা ইসলামের নামে নারকীয় হামলা করেছিল, তারা আসলে ইসলামের শত্রু। এ মাঠে নিরাপত্তা বরাবরই সুন্দর ও সুশৃংখল। আমরা স্থানীয় মুসল্লিরা এবারও এ মাঠেই ঈদের নামাজ আদায় করবো। সকল ভয়কে উপেক্ষা করে কিশোরগঞ্জসহ দেশের সকল জায়গার মুসল্লিদের এবারের ঈদের জামাতে শরিক হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।
শোলাকিয়া ঈদগাহ মসজিদের ইমাম আব্দুস সালাম গোলাপ বলেন, ‘সারা পৃথিবীতে মক্কা মদিনার পরে সর্ববৃহৎ ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয় শোলাকিয়া ময়দানে। এলাকাবাসী, দেশবাসীসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মুসল্লিরা এ মাঠে নামাজ আদায় করতে আসেন। এ মাঠে লাখ লাখ মুসল্লি এক সঙ্গে নামাজ আদায় করেন। আশা করবো, এবারও এ মাঠে সর্ববৃহৎ ঈদুল ফিতরের জামাত অনুষ্ঠিত হবে। ’
কিশোরগঞ্জ পৌরসভা মেয়র মো. পারভেজ মিয়া বলেন, ‘১৯০ তম ঈদুল ফিতরের জামাত সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে পৌরসভার পক্ষ থেকে সকল প্রকার উন্নয়নমূলক কাজ এগিয়ে চলছে। ইতোমধ্যে বাঁশের সাঁকো ভেঙে নতুন ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া ঈদগাহ মাঠের সকল মাটির রাস্তা পাকা করা হয়েছে এবং আশেপাশের সকল রাস্তার মেরামত চলছে। আশা করছি, ঈদ জামাতের আগেই শতভাগ কাজ সম্পন্ন হবে।’
অন্যদিকে, শোলাকিয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গত এক মাস ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছে পুলিশ, র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। জেলা পুলিশ সুপার মো. আনোয়ার হোসেন খান বলেন, ‘পাঁচ প্লাটুন বিজিবি, বিপুল সংখ্যক পুলিশ, র্যাব. আনসার সদস্যের সমন্বয়ে নিশ্চিদ্র ও কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের পাশাপাশি মাঠে সাদা পোশাকে নজরদারী করবেন বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। এছাড়াও শহরসহ মাঠের প্রবেশ পথগুলোতে থাকছে সিসি ক্যামেরা ও ওয়াচ টাওয়ার। নামাজ শুরুর আগে পুরো মাঠ তল্লাশি করা হবে মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে। ’
পুলিশ সুপার আরও বলেন, ‘শোলাকিয়া মাঠ ও শহরের যত অলিগলি আছে, সবখানে বসানো হবে নিরাপত্তা চৌকি। মাঠে প্রবেশ করতে প্রত্যেক মুসল্লিকে পাঁচ থেকে দশবার তল্লাশি করা হবে। ঈদগাহের আশে পাশে প্রতিদিন প্রতিটি বাড়িতে তল্লাশি চলছে। নতুন কোনও ভাড়াটিয়াকে বাড়ি ভাড়া না দেওয়ার জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়েছে। এবার নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার মধ্যেই মুসল্লিরা নামাজ আদায় করবেন।’
জেলা প্রশাসক ও ঈদগাহ পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. আজিমুদ্দিন বিশ্বাস বলেন, ‘এ বছর ঐতিহাসিক শোলাকিয়ায় ১৯০ তম ঈদুল ফিতরের জামাত অনুষ্ঠিত হবে। ঈদ জামাত সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করার লক্ষ্যে ইতোমধ্যে যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। আমাদের প্রস্তুতির দু’টি দিক- একটি হচ্ছে, মাঠকে জামাতের উপযোগী করার জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং উন্নয়ন সাধন করা। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে,সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। গত বছর শোলাকিয়া মাঠের কাছে পুলিশ চেকপোস্টে জঙ্গিদের হামলাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে এ বছর নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে সব দিক থেকে ঢেলে সাজানো হয়েছে। ’
শোলাকিয়া মাঠের রেওয়াজ অনুযায়ী, জামাত শুরুর আগে শর্টগানের ছয়টি ফাঁকা গুলি ছোড়া হবে। এরমধ্যে জামাত শুরুর পাঁচ মিনিট আগে তিনটি, তিন মিনিট আগে দুটি এবং এক মিনিট আগে একটি গুলি ছুড়ে নামাজের জন্য মুসল্লিদের সংকেত দেওয়া হবে।
জনশ্রুতি আছে, ১৮২৮ সালে এই মাঠে ঈদের জামাতে সোয়া লাখ মুসল্লি এক সঙ্গে নামাজ আদায় করেছিলেন। সেই থেকে এ মাঠের নাম হয় ‘সোয়া লাখিয়া’। যা এখন শোলাকিয়া নামেই পরিচিত।
/এপিএইচ/টিএন/








