এক চিঠির জবাবে হুংকার, পরের চিঠি পেয়ে আত্মসমর্পণ

বিশ্বজিৎ দেব, জামালপুর
০৪ ডিসেম্বর ২০১৭, ০৭:০৬আপডেট : ০৫ ডিসেম্বর ২০১৭, ১৮:৪৮

কামালপুর শহীদ স্মৃতিসৌধ (ছবি- প্রতিনিধি)

প্রাণ নিয়ে ফেরার আশঙ্কা ছিল, তবু দায়িত্বটা নিয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধা বশির আহমেদ। আর সে দুঃসাহসিক দায়িত্বটা হলো, আত্মসমর্পণের আহ্বান জানানো চিঠি নিয়ে শত্রুশিবিরে যাওয়া। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সে দায়িত্ব পালন করলেন বশির আহমেদ। তবে ৪ ডিসেম্বর সকালে বশির আহমেদের কাছ থেকে সে চিঠি পেয়ে হুংকার দিয়ে উঠেন পাক-সেনাদের কমান্ডার আহসান মালিক। তার নির্দেশে বশির আহমেদকে নির্যাতন শুরু করে পাকবাহিনী।

এর মধ্যে একই চিঠি নিয়ে শত্রুশিবিরে হাজির হন মুক্তিযোদ্ধা সঞ্জু। মুক্তি ও মিত্রবাহিনীর চতুর্মুখী আক্রমণে অবরুদ্ধ পাকিস্তানি বাহিনী তখন কোণঠাসা। ভেতরে ভেতরে তাদের মনোবল গেছে ভেঙে। তাই ওই দিন রাতেই মাথা হেঁট করে সাদা পতাকা হাতে চৌকি থেকে বের হয়ে আত্মসমর্পণ করেন পাকিস্তানি বাহিনীর ক্যাপ্টেন আহসান মালিক ও তার বাহিনী।

জামালপুরের মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ৪ ডিসেম্বর এ জেলার বকশীগঞ্জ উপজেলার ধানুয়া ইউনিয়নের কামালপুর মুক্ত হলেও সেখানে যুদ্ধটা চলেছে অনেক দিন ধরে।

মুক্তিযোদ্ধারা জানান, ১৯৭১ সালে ১১নং সেক্টরের অধীনে ছিল জামালপুর। এ সেক্টরের দায়িত্বে ছিলেন কর্নেল আবু তাহের বীর উত্তম। ১১নং সেক্টরের সদর দফতর ছিল ভারতের মহেন্দ্রগঞ্জে, যা বকশীগঞ্জের ধানুয়া ইউনিয়নের কামালপুর থেকে দেড় কি.মি. দূরে। আবার কামালপুরেই ছিল পাক-সেনাদের একটি শক্তিশালী ঘাঁটি। এদিকে, কামালপুরের যোগাযোগটা বিস্তৃত ছিল বকশীগঞ্জ-শেরপুর-জামালপুর-টাঙ্গাইল হয়ে ঢাকা পর্যন্ত।

জুন মাসে মুক্তিবাহিনী সিদ্ধান্ত নেয়, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কামালপুর বিওপি যে কোনও মূল্যে দখলে নিতে হবে। এজন্য ১১নং সেক্টরকে আটটি সাব-সেক্টরে ভাগ করা হয়। সাব-সেক্টরগুলো হলো– মহেন্দ্রগঞ্জ, মানকারচর, পুরাকাশিয়া, ডালু, বাগমারা, শিববাড়ী, রংড়া ও মহেশখোলা। একইসঙ্গে মুক্তিবাহিনী সিদ্ধান্ত নেয়, পাক বাহিনীর কামালপুরে যাওয়ার সম্ভাব্য সব পথ বন্ধ করে দেওয়ার। এজন্য মুক্তিবাহিনী মহেন্দ্রগঞ্জ সীমান্তে একটি শক্তিশালী ঘাঁটিও স্থাপন করে।

বকশীগঞ্জ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের কার্যালয় সূত্র জানায়, ১১নং সেক্টরে নিয়মিত বাহিনীর ৩ হাজার ও গণ-বাহিনীর ১৯ হাজারসহ মোট মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন ২২ হাজার। ১২ মে থেকে ২৮ নভেম্বর পর্যন্ত কামালপুর রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনীর ১০টি সম্মুখযুদ্ধ হয়। এসব যুদ্ধে ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দীনসহ মোট ১৯৪ জন মুক্তিযোদ্ধা শাহাদত বরণ করেন, পা হারান সেক্টর কমান্ডার আবু তাহের বীর উত্তম, আহত হন তৎকালীন ক্যাপ্টেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও লেফটেন্যান্ট মো. আবদুল মান্নানসহ অনেকে। এ সময় নিহত হন ৪৯৭ জন পাকিস্তানি সেনা।

নভেম্বর মাস থেকে এখানে যুদ্ধের চেহারা বদলে যায়। তখন ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটি ব্রিগেড যুক্ত হয় মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে। ১৩ নভেম্বর পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী কামালপুর শত্রুশিবিরে আক্রমণ চালায়। ১৪ নভেম্বর পাক-সেনাদের একটি মর্টারের আঘাতে কর্নেল আবু তাহের মারাত্মকভাবে আহত হন। এতে সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব দেওয়া হয় উইং-কমান্ডার হামিদুল্লাহ খানকে। ২৪ নভেম্বর থেকে কামালপুর শত্রুশিবির অবরুদ্ধ করে রাখেন মুক্তি ও মিত্রবাহিনীর যোদ্ধারা।

৪ ডিসেম্বর যৌথ-কমান্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আত্মসমর্পণের আহ্বান জানানো চিঠি নিয়ে শত্রুশিবিরে যান বকশীগঞ্জের বৈষনব্ব পাড়ার মুক্তিযোদ্ধা বশির আহমেদ। পাক-বাহিনী বশির আহমেদকে নির্যাতন শুরু করলে আরও একটি চিঠি নিয়ে শত্রুশিবিরে উপস্থিত হন মুক্তিযোদ্ধা সঞ্জু। দুই চিঠিতেই লেখা ছিল, বাঁচতে চাইলে আত্মসমর্পণ করো, নইলে মৃত্যু অবধারিত।

বশির আহমেদ চিঠি নিয়ে উপস্থিত হলে হুংকার দিয়ে উঠেন আহসান মালিক। কিন্তু এরপর সঞ্জু চিঠি নিয়ে হাজির হলে ভয় পেয়ে যান কোণঠাসা পাকিস্তানি কমান্ডার।

দীর্ঘদিন অবরুদ্ধ থাকার কারণে ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়েছিল পাকিস্তানি বাহিনী। লড়াই চালিয়ে যাওয়ার শক্তিও অবশিষ্ট ছিল না তাদের। তাই ৪ ডিসেম্বর রাতে যৌথবাহিনীর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেন আহসান মালিক ও তার বাহিনী।

 

/এমএ/
সম্পর্কিত
বিশ্বের সর্বোচ্চ শিখরে ফের উড়লো বাংলাদেশের পতাকা
অযত্ন-অবহেলায় সর্ববৃহৎ গণহত্যার স্থান, ৫৪ বছরেও হয়নি স্মৃতিসৌধ
নানা আয়োজনে রাজধানীবাসীর বিজয় উদযাপন
সর্বশেষ খবর
সৌদি থেকে ফিরেছেন ২৫৩৭৭ হাজি, মৃত্যু বেড়ে ৪৫
সৌদি থেকে ফিরেছেন ২৫৩৭৭ হাজি, মৃত্যু বেড়ে ৪৫
পশ্চিমবঙ্গে যেকারণে তৃণমূলের ‘অপ্রত্যাশিত রক্ষাকর্তা’ খোদ বিজেপি
কী, কেন, কীভাবেপশ্চিমবঙ্গে যেকারণে তৃণমূলের ‘অপ্রত্যাশিত রক্ষাকর্তা’ খোদ বিজেপি
বিশ্বকাপে স্টেডিয়ামে নেওয়া যাবে না পানির বোতল
বিশ্বকাপে স্টেডিয়ামে নেওয়া যাবে না পানির বোতল
সীমান্তে কঠোর বিজিবি, ১০ পুশ-ইন চেষ্টা প্রতিহত
সীমান্তে কঠোর বিজিবি, ১০ পুশ-ইন চেষ্টা প্রতিহত
সর্বাধিক পঠিত
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম