খুলনায় অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো। একাত্তরের একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালীন হামলা, হত্যাযজ্ঞসহ হানাদার বাহিনীর রোষানলে পড়া এই স্থানগুলো শনাক্ত করা হলেও তার বেশিরভাগই যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি। যেগুলো সংরক্ষণ করা হয়েছে, সেগুলোও রয়েছে অরক্ষিত অবস্থায়। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত স্থানগুলোর এমন বেহাল দশায় উদ্বেগ ও হতাশা জানিয়েছে সচেতন মহল।
মহেশ্বরপাশা নারায়ণ মজুমদারের বাড়ি
খুলনা মহানগরীর মহেশ্বরপাশা পুলিশ ফাঁড়ির অদূরে ছিল নারায়ণ মজুমদারের বাড়ি। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে নারায়ণ মজুমদার ভারতে পালিয়ে গেলে তার বাড়িটি লুটপাট হয়। এরপর হানাদার বাহিনী এ বাড়িতে ক্যাস্প করে। এ ক্যাম্পে বাঙালিদের ওপর নির্যাতন চালানো হতো। ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে এখানকার কালী মন্দিরে পুরোহিত সতিশ চক্রবর্তীসহ ছয় জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। হত্যা করা হয় দৌলতপুর মহাসিন স্কুলের শিক্ষক শেখ মুহাম্মাদ হানিফের তিন সন্তানকে। কাঠের তৈরি তৎকালীন এ বাড়িটি বর্তমানে পাকা ভবন। বাড়িটি কৃষি অধিদফতরের দায়িত্বে থাকলেও সংরক্ষণের কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
খুলনার বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ম্যাসাস-এর নির্বাহী পরিচালক শামিমা সুলতানা শিলু জানান, যুদ্ধের সময় তিনি কিশোরী। হানিফ স্যারের তিন ছেলেকে হত্যার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন তিনি। ওই হত্যার ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘ঘটনার দিন বিকালে বারান্দায় বসে খেলছিলাম। হঠাৎ তিনটা ছেলেকে হানাদার বাহিনীর সদস্যরা লাথি মেরে রাস্তায় ফেলে দেয়। পেছনে হাত বাঁধা একটি ছেলেকে পাশের ড্রেনে ফেলে দেয়। কষ্ট করে সে উঠে দাঁড়ায়। এ অবস্থায় কোমর বেঁধে তাকে টানতে টানতে বাড়ির ভেতরে নিয়ে যায়। দু’দিন পর ঝড়-বৃষ্টির সন্ধ্যায় তিনটি গুলির শব্দ শোনা যায়। পরে তিনটি ছেলের লাশ দেখা যায়। জানা যায়, ওই তিন জন ছিলেন দৌলতপুর মহাসিন স্কুলের শিক্ষক শেখ মুহাম্মাদ হানিফ স্যারের সন্তান রওনাকুল ইসলাম বাবর, জাকির ও তপন কুমার দাশ।’
বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন ও বীর মহিবুল্লাহর সমাধি
রূপসা নদীর পূর্বপাশে বীরশ্রেষ্ঠ মো. রহুল আমিন ও বীর মহিবুল্লাহর সমাধি। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানিদের হাত থেকে দেশকে স্বাধীন করতে রূপসার খুলনা শিপইয়ার্ডের সামনে জীবন দেন এই দুই মুক্তিকামী সেনা। তাদের সমাধিসৌধের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে নারিকেল গাছ, ফুল ও কুল গাছ আছে। মুক্তিযুদ্ধের সাক্ষী হিসেবে একটি খেজুর গাছও রয়েছে। দেড় একর জমির ওপর তৈরি হয়েছে সমাধিসৌধটি। এর সংরক্ষণের দায়িত্ব নৌবাহিনীর। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে সমাধিটি দেখতে আসেন দর্শনার্থীরা। তবে স্থানীয়দের অভিমত, একজন বীরশ্রেষ্ঠের নামে তৈরি একটি সমাধিসৌধ আরও দর্শনীয় হওয়া উচিত।
গল্লামারী রেডিও সেন্টার ও বধ্যভূমি
মহানগরীর গল্লামারী বধ্যভূমি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই অবস্থিত। এখানেই ছিল রেডিও পাকিস্তানের খুলনা শাখা। একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধাসহ সাধারণ মানুষকে এখানে নিয়ে এসে নির্বিচারে হত্যা করা হয়। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরনো দোতলা প্রশাসনিক ভবনটি তখন ছিল একতলা। এই ভবন থেকে বেতার কার্যক্রম সম্প্রচার করা হতো। ভবনের অবস্থান ও আশপাশ নির্জন হওয়ায় এখানে গড়ে তোলা হয় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর টর্চার সেল। নির্যাতনের জন্য ভবনের পেছনের একটি দোচালা ঘর ও সামনের চত্বর ব্যবহার করা হতো। গল্লামারী বধ্যভূমিতে হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়াদের মধ্যে দাকোপের সুখজান বিবির স্বামী মাহাতাব বিশ্বাসকে ১০ আগস্ট রাজাকাররা ধরে আনে। ১১ আগস্ট দা দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে। বধ্যভূমিতে নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়েছিল নারী মুক্তিযোদ্ধা শান্তিলতা সাহাকে।
মুক্তিযোদ্ধা শেখ মহাসিন আলি বলেন, ‘গল্লামারী বধ্যভূমিতে যে হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে, তার প্রত্যক্ষদর্শী পাওয়া যাবে না। কারণ ওখান থেকে কেউ ফিরে আসেননি। তবে যুদ্ধের পর ওই জায়গায় গিয়েই দেখা যায় হানাদার বাহিনীর নৃশংসতা। দেয়ালে দেয়ালে রক্তে লেখা ছিল আকুতি। যুদ্ধপরবর্তী সময়ে এখান থেকে পাঁচ ট্রাক মাথার খুলি উদ্ধার করা হয়।’
ওই সময়ের বেতার খুলনা শাখার ভবনটি এখন ব্যাংক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সবাই ভবনটিকে পুরাতন ব্যাংক ভবন হিসেবেই জানে। নিচ তলায় অগ্রণী ব্যাংক, দ্বিতীয় তলায় আধুনিক ভাষা শিক্ষার ক্লাস নেওয়া হয়। সিনিয়র ব্যাংক কর্মকর্তা দেবাশীষ কুমার মণ্ডল বলেন, ‘ভবনটি আলাদাভাবে সংরক্ষণ করা হলে নতুন প্রজন্ম ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারত।’
ফরেস্ট ঘাট ও হেলিপ্যাড
যুদ্ধের শুরুতে মুক্তিকামী বাঙালিদের ওপর নির্যাতনের জন্য মহানগরীর হেলিপ্যাড ও ফরেস্ট ঘাটকে বেছে নেয় হানাদার বাহিনী। দিনে হেলিপ্যাডে নির্যাতন করে রাতে ফরেস্ট ঘাটে নিয়ে গুলি ও জবাই করে হত্যা করা হতো। হত্যার পর লাশ ভাসিয়ে দিত নদীতে। এখানে নিহত মুক্তিকামী শহীদদের জন্য নির্মিত হয়েছে একটি স্মৃতিস্তম্ভ।
মুক্তিযোদ্ধা ও গবেষক মো. আবু জাফর জানান, ফরেস্ট ঘাট ছিল জজ কোর্টের পেছনে। রাতের আঁধারে নির্যাতনের শিকার বাঙালিদের করুণ আর্তনাদ সহ্য করতে না পেরে জজ সাহেব হার্ট অ্যাটাকে মারা যান। তিনি বলেন, ‘ফরেস্ট ঘাটে প্রতিদিন হত্যাযজ্ঞ চলত। হেলিপ্যাড ছিল হানাদারদের নির্যাতন কেন্দ্র। এত বড় ঘটনার পরও স্থান দু’টি রয়েছে অযত্ন ও অবহেলায়। সংরক্ষণের কোনও ব্যবস্থা নেই।’
চৌরঙ্গী মোড় ও হামিদা মঞ্জিল
পাকিস্তানি বাহিনী খুলনা শহরে প্রবেশ করতে গেলে প্রথমে বাধা পায় ফুলতলা চৌরঙ্গীর মোড়ে। এরপর রেলগেট সংলগ্ন হামিদা মঞ্জিলের সামনে ওঁৎ পেতে থেকে পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর হামলা করেন দৌলতপুর পুলিশ ফাঁড়ির হাবিলদার মো. ইসমাইলসহ পাঁচ জন। এই স্থানটিও সংরক্ষণের জন্য তেমন কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
নয়াবাটির মুন্সিবাড়ি
খালিশপুরে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধ আন্দোলন ও পরিকল্পনা করা হতো নয়াবাটির মুন্সিবাড়ি থেকে। নেতৃত্বে ছিলেন খালিশপুর থানা শাখার তৎকালীন সভাপতি মুন্সি সিদ্দিকুর রহমান। এলাকাজুড়ে ছিল বিহারীদের বাস। যুদ্ধ শুরু হলে সব পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো এই মুন্সিবাড়ি থেকে। সঙ্গত কারণেই বাড়ির প্রধান সিদ্দিকুর রহমান বিহারীদের চক্ষুশুল হয়ে ওঠেন। কৌশল হিসেবে ৭ এপ্রিল সকালে বিহারীরা মুন্সিবাড়ি যায় এবং একটি সমঝোতা বৈঠক করে। এলাকায় শান্তিশৃঙ্খলা বজায় ও সহাবস্থানের লক্ষ্যে তারা পরস্পরকে সহযোগিতা করবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়ে বৈঠকের সমাপ্তি টানে।
এরপরই দৃশ্যপট পাল্টে যায়। হঠাৎ করেই মুন্সিবাড়ির দিকে পাকিস্তানি গাড়ি আসে। মুন্সি সিদ্দিকুর রহমান বাড়ি থেকে সরে যান। এরপর আরও তিনটি গাড়ি এসে বাড়িটিকে ঘিরে ফেলে। মুন্সি সিদ্দিকুরকে না পেয়ে বাড়ির ১৩ জন পুরুষকে বাংকারের ওপর দাঁড় করিয়ে গুলি করে। এমন গুরুত্বপূর্ণ স্থানটিও পড়ে রয়েছে অবহেলায়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে খুলনার জেলা প্রশাসক আমিনুল আহসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত সব স্থান জেলা প্রশাসনের অধীন নয়। কিছু কিছু স্থান স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার অধীন। জেলা প্রশাসনের অধীন স্থানগুলো সংরক্ষণের জন্য উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বাকি স্থানগুলোর সংরক্ষণের জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে আমরা অনুরোধ করব।’
আরও পড়ুন-
মার্চে ময়মনসিংহ: পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়ে ওড়ানো হয় বাংলাদেশের পতাকা







