কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধ বিহার ও বসতিতে হামলার সাত বছর পূর্ণ হলো আজ। হামলার ক্ষত শুকিয়ে রামুতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ফিরে আসলেও বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে। অপরাধীদের বেশিরভাগ আইনের আওতায় না আসায় শঙ্কা কাটছে না স্থানীয় বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতা ও সাধারণ মানুষের।
২০১২ সালের ২৯ ও ৩০ সেপ্টেম্বর রামুতে উত্তম বড়ুয়া নামের এক বৌদ্ধ যুবকের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে রাতের অন্ধকারে হামলা চালানো হয়। রামুতে ১২টি বৌদ্ধ বিহার, ৩০টি বসতঘর এবং উখিয়া ও টেকনাফের ৭টি বৌদ্ধ বিহার ও ১১টি বসতঘরে হামলা ও অগ্নি সংযোগ করে। এসময় দুষ্কৃতিকারীরা হামলা ও লুটপাট চালানো হয় আরও ৬টি বৌদ্ধ বিহার ও শতাধিক বসতঘরে। ঘটনার পরপরই সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত বিহার ও ঘরবাড়ি পুণনির্মাণ করে দিয়েছে সরকার।
ওই সহিংস ঘটনায় রামু, উখিয়া ও টেকনাফে এজাহারভুক্ত ৩৭৫ জনসহ ১৫ হাজার ১৮২ জনকে অভিযুক্ত করে ১৯টি মামলা দায়ের করা হয়। পরবর্তীতে এসব মামলায় ৯৪৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় পুলিশ। এর মধ্যে অভিযোগপত্রে রামুর ৮টি মামলায় অভিযুক্ত করা হয় ৪৫৮ জনকে। অপর ১০টি মামলারও চার্জশিটে অভিযুক্ত করা হয় ৪৮৭জনকে। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের একজন বাদী হয়ে দায়েরকৃত একমাত্র মামলাটি খারিজ হয়ে যায়। তবে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতারা বলছেন, সব মামলায় পুলিশ বাদী হওয়ায় এসব মামলার বিষয়ে কিছুই জানেন না তারা।
রামু উপজেলা বৌদ্ধ যুব পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক বিপুল বড়ুয়া জানান, ‘সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টায় ক্ষতিগ্রস্ত বিহারগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। এখন রামুর সব ধর্মের মানুষের মাঝে সম্প্রীতি ফিরে এসেছে। কিন্তু হামলার পর পুলিশের দায়ের করা মামলাগুলোতে অনেক নিরীহ ব্যক্তিকে জড়িয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। আমাদের আশঙ্কা, হয়রানির শিকার হওয়া এসব মানুষ হয়তো ভবিষ্যতে ক্ষুব্ধ হয়ে যে কোনও ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনায় ঘটিয়ে ফেলতে পারে। আমরা চাই নিরাপরাধ কোনও মানুষকেই যেন মামলায় হয়রানি করা না হয়।’
কক্সবাজার বৌদ্ধ সুরক্ষা পরিষদের সভাপতি প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু বলেন, ‘দীর্ঘ ৭টি বছরের ব্যবধানে প্রত্যক্ষদর্শীদের মধ্যে, মামলার সাক্ষীদের মধ্যে সাক্ষ্য দেওয়ার যে আগ্রহ ছিল, দীর্ঘসূত্রিতার কারণে কিন্তু তা ভাটা পড়েছে। অনেকে অনেক সমীকরণ আঁকছে। নিরাপত্তার কথা ভাবছে, লাভ-ক্ষতির কথা ভাবছে। এতে করে তারা অনেকটা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। বিশেষ করে ঘটনার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তদন্ত প্রতিবেদন হয়েছে, জুডিশিয়াল তদন্ত হয়েছে, বিচার বিভাগীয় তদন্ত হয়েছে। সব তদন্ত প্রতিবেদনে যাদের নাম এসেছে এদের বেশিরভাগ আসামি কিন্তু এখন প্রকাশ্যে ঘুরছে। এদের কেউ শাস্তির আওতায় আসেনি। স্বভাবতই তাদের দেখে ক্ষতিগ্রস্তরা কিন্তু হতাশ হয়ে পড়েছে।’
কক্সবাজার জেলা দায়রা জজ আদালতের পিপি অ্যাডভোকেট মমতাজ উদ্দিন আহম্মদ বলেন, ‘বৌদ্ধ মন্দির ও বসতিতে হামলার ঘটনায় সর্বমোট ১৯টি মামলা দায়ের করা হয়। তার মধ্যে বাদীর সম্মতিতে ১টি মামলা নিষ্পত্তি হয়ে যায়। অন্য ১৮টি মামলার মধ্যে ১৪টি মামলা আদালতে বিচারের জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে। বিচারের জন্য প্রস্তুত রয়েছে বাকি ৪টি মামলা। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লোকজন সাক্ষ্য না দেওয়ার কারণে বিচারকাজ বিলম্বিত হচ্ছে।’
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ইকবাল হোসেন বলেন, ‘২০১২ সালে রামুতে বৌদ্ধ মন্দিরকে কেন্দ্র করে যে সহিংস ঘটনাগুলো ঘটেছিল এতে ১৯টি মামলা হয়। এতে এজাহারভুক্ত প্রায় ৪শ’ জনসহ অজ্ঞাতনামা দেড় হাজার মানুষ আসামি ছিল। বর্তমানে প্রত্যেকটি মামলা চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। ওই মামলাগুলো এখন আদালতে বিচারধীন রয়েছে। তবে আদালত যদি মনে করে সাক্ষীদের নোটিশের মাধ্যমে আদালতে নিয়ে আসার, সে ব্যাপারে পুলিশ সহযোগিতা করবে।’
এদিকে ২৯ সেপ্টেম্বর রামু সহিংসতার ৭ বছর উপলক্ষে রামুতে বৌদ্ধ যুব পরিষদ এর উদ্যোগে দিনব্যাপী কর্মসূচি পালন করা হবে বলে জানা গেছে। কর্মসূচির মধ্যে বিকালে শ্রীকুল গ্রামের লাল চিং-সাদা চিং মৈত্রী বিহার কমপ্লেক্সে অনুষ্ঠিত হবে স্মৃতিচারণ, হাজার প্রদীপ প্রজ্জ্বালন। এছাড়া বিভিন্ন বিহারে পালন করা হবে ধর্মীয় কর্মসূচি।
আরও পড়ুন- রামু সহিংসতার সেই উত্তম বড়ুয়া কোথায়!








