চেক ডিজঅনার মামলায় নামের মিল থাকায় ভুল ব্যক্তিকে আসামি হিসেবে সাজা দিয়ে প্রায় চার মাস কারাভোগের ঘটনায় শেষ পর্যন্ত ভুক্তভোগীর কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে ৩০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিয়েছে বাদীপক্ষ। ক্ষতিপূরণ পাওয়ার পর ভুক্তভোগী তার করা অভিযোগ প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।
বুধবার (২৩ জুলাই) ঢাকার চতুর্থ যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক তানিয়া সুলতানা লিপির আদালতে আপস-মীমাংসার নথি দাখিল করা হলে আদালত তা গ্রহণ করেন।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট আদালতে বেঞ্চ সহকারী মিয়া ইব্রাহিম খলিল অপু ও
ভুক্তভোগী মামুন মিয়ার আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাদেকুল ইসলাম ভূঁইয়া জাদু।
আদালতে আপস-মীমাংসার সময় ভুক্তভোগী মামুন মিয়া, তার আইনজীবী ও বিশ্বাস পোল্ট্রি অ্যান্ড ফিস ফিডস লিমিটেডের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
ভুক্তভোগী মামুন মিয়া বলেন, “আমি প্রায় চার মাস কারাগারে ছিলাম। মুক্তির পর তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করি। পরে তারা আমার কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে ক্ষতিপূরণ দিয়েছে। তাই আমি আমার সব অভিযোগ প্রত্যাহার করে নিয়েছি।”
অ্যাডভোকেট সাদেকুল ইসলাম ভূঁইয়া জাদু বলেন, “বিশ্বাস পোল্ট্রি অ্যান্ড ফিস ফিডস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ভুক্তভোগীর কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছেন এবং ক্ষতিপূরণ দিয়েছেন। তারা ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আর ঘটবে না বলে আশ্বাস দিয়েছেন। সেই পরিপ্রেক্ষিতে আমরা অভিযোগ প্রত্যাহার করেছি।”
অন্যদিকে, বিশ্বাস পোল্ট্রি অ্যান্ড ফিস ফিডস লিমিটেডের প্রতিনিধি মাকসুদুল হক ওয়ালিদ বলেন, “আমাদের কয়েকজন কর্মকর্তার ভুলের কারণে এ অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং সাময়িকভাবে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। আদালতের পরামর্শে আমরা একটি সমঝোতায় পৌঁছেছি।”
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ১৮ জুন ‘মেসার্স পড়ন্ত বেলা পোল্ট্রি ফিড’-এর মালিক পরিচয়ে মামুন মিয়া প্রাইম ব্যাংকের ৩২ লাখ টাকার একটি চেক দেন। পরদিন ১৯ জুন চেকটি ‘অপর্যাপ্ত তহবিল’ উল্লেখ করে ডিজঅনার হয়। পরে ১১ জুলাই আইনগত নোটিশ পাঠানো হয়।
এরপর বিশ্বাস পোল্ট্রি অ্যান্ড ফিস ফিডস লিমিটেডের রিকভারি ম্যানেজার মোহাম্মদ ওয়াছিকুল আজাদ সরকার ২০১৯ সালের ২৫ আগস্ট নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১-এর ১৩৮ ধারায় মামলা করেন।
২০২১ সালের ১৪ ডিসেম্বর আদালত অভিযোগ গঠন করেন। ওই সময় আসামিকে পলাতক দেখানো হয়। বিচার চলাকালে রাষ্ট্রপক্ষ একজন সাক্ষী ও প্রয়োজনীয় দালিলিক প্রমাণ উপস্থাপন করে। পরে ২০২৩ সালের ১৩ মার্চ পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে মজিবুর রহমান মামলার বাদী হিসেবে দায়িত্ব নেন।
দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০২৫ সালের ২৯ জুন ঢাকার চতুর্থ যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ আদালত রায়ে আসামিকে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং ৩২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেন। রায়ে উল্লেখ করা হয়, আসামি পলাতক থাকায় সাক্ষীদের জেরা সম্ভব হয়নি এবং রাষ্ট্রপক্ষের উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।
পরে ২০২৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি গ্রেফতারি পরোয়ানার ভিত্তিতে মামুন মিয়াকে গ্রেফতার করা হয়। তবে গ্রেফতারের পর তিনি দাবি করেন, তিনি প্রকৃত আসামি নন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাব বা চেকের সঙ্গে তার কোনও সম্পৃক্ততা নেই। এ দাবির পর আদালত নরসিংদীর শিবপুর মডেল থানাকে তদন্তের নির্দেশ দেন।
তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান আদালতে দাখিল করা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, কারাগারে থাকা মামুন মিয়া এই মামলার প্রকৃত আসামি নন; কেবল নামের মিল থাকায় তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।
তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর আদালত গত ১৯ মে মামুন মিয়াকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেন। পরদিন ২০ মে বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে তিনি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার, কেরানীগঞ্জ থেকে মুক্তি পান।
মুক্তির পর অন্যায়ভাবে কারাভোগের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণ ও শাস্তি চেয়ে আদালতে অভিযোগ করেন মামুন মিয়া। সেই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতেই বাদীপক্ষ তার কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে ৩০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ প্রদান করে এবং শেষ পর্যন্ত উভয় পক্ষের মধ্যে আপস-মীমাংসার মাধ্যমে বিরোধের নিষ্পত্তি হয়।









