বগুড়া-৪: পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে বিএনপি, ছিনিয়ে নিতে চায় আ.লীগ

বগুড়া প্রতিনিধি
০২ নভেম্বর ২০১৮, ১৪:০৭আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০১৮, ১৪:০৭

বগুড়া-৪: পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে বিএনপি, ছিনিয়ে নিতে চায় আ.লীগ

 

কাহালু ও নন্দীগ্রাম উপজেলা নিয়ে বগুড়া-৪ আসন গঠিত। আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি থেকে প্রার্থীর ছড়াছড়ি এই আসনে। সম্ভাব্য প্রার্থীরা পোস্টারিং, লিফলেট বিতরণ ও গণসংযোগ করে তাদের প্রার্থীতা জানান দিচ্ছেন। গত নির্বাচনে মহাজোটের শরিক জাসদকে (ইনু) ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল আসনটি। বিএনপি ভোট বর্জন করায় জাতীয় পার্টির প্রার্থীকে হারিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন জাসদের প্রার্থী। ১৯৯১ সালের নির্বাচন ও উপ-নির্বাচনসহ পরপর ৫ বারের বিজয়ী বিএনপি নির্বাচনে না আসায় হাতছাড়া হয়ে যাওয়া আসনটি ফিরে পেতে মরিয়া হয়ে পড়েছে। এদিকে নির্বাচনের মাধ্যমে আসনটি নিজেদের করে নিতে চাইছে আওয়ামী লীগ।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ এবার কোনোভাবেই আসনটি জাসদকে ছেড়ে দিতে রাজি নয়। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মতো বড় দুটি সংগঠন থেকে এবার নতুন মুখ আসার সম্ভবনা রয়েছে। নন্দীগ্রামের তুলনায় কাহালু উপজেলায় প্রায় ৩০ হাজার ভোট বেশি হলেও গত ৬৪ বছরে এখান থেকে আওয়ামী লীগের কোনও প্রার্থী দেওয়া হয়নি। তাই এবার এ উপজেলা থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী দেওয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে। তবে জামায়াত-শিবির অধ্যুষিত এ আসনে জামায়াতের কেউ নির্বাচন করলে অন্য দলের জন্য সেটা মাথা ব্যথার কারণ হতে পারে। তবে ২০১৩ ও ২০১৫ সালে সরকারবিরোধী আন্দোলনে তাদের সহিংসতা ও নাশকতা আজও  মানুষের মনে ত্রাস সৃষ্টি করে। এটি তাদের ভোট ব্যাংকে নেতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

সরেজমিনে দেখা যায়, একাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দুটি উপজেলার নির্বাচনি প্রচারণা জমজমাট হয়েছে। বিভিন্ন দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা হাইকমান্ডের দৃষ্টি আকর্ষণে দলীয় প্রধানদের ছবির পাশাপাশি নিজেদের ছবি সম্বলিত ডিজিটাল ব্যানার, পোস্টার ও ফেস্টুন লাগিয়েছেন। হোটেল-রেঁস্তোরা, হাট-বাজারসহ সর্বত্রই আগামী নির্বাচন নিয়ে আলোচনা চলছে। প্রার্থীরা সবধরনের সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অতিথি হচ্ছেন। সাধ্যমতো সাহায্য-সহযোগিতা করছেন। শুধু প্রার্থীরা নয়; তাদের আত্মীয়-স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষিরাও প্রচারণা চালাচ্ছেন।

এ আসনে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীরা হলেন- কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য ও বগুড়া জেলা সভাপতি আলহাজ্ব মমতাজ উদ্দিন, কাহালু উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি কামাল উদ্দিন কবিরাজ, অপর সহ-সভাপতি সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট হেলালুর রহমান, নন্দীগ্রাম উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইউনুস আলী ও জেলা যুবলীগের সাবেক সহ-সভাপতি রেজাউল আশরাফ জিন্নাহ।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, আলহাজ্ব মমতাজ উদ্দিন বগুড়া সদরের বাসিন্দা হলেও তিনি এবার বগুড়া-৪ আসনের শক্ত প্রার্থী। তিনি দীর্ঘদিন ধরে এ আসনের দুটি উপজেলার মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। নিয়মিত গণসংযোগ ও নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তার দাবি, এ আসনে বিএনপির অবস্থান যাই হোক না কেন গত কয়েক বছরে এখানে আওয়ামী লীগও নিজের অবস্থান সংহত করেছে। তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা আর নৌকার গ্রহণযোগ্যতায় তিনি এবার আওয়ামী লীগের প্রার্থী। তার বিশ্বাস নেত্রী শেখ হাসিনা তাকে মনোনয়ন দেবেন এবং তিনি বিপুল ভোটে বিজয়ী হবেন।

এ আসন থেকে আওয়ামী লীগের আরেকজন প্রার্থী কামাল উদ্দিন কবিরাজ। তিনি জানান, ১৯৭৫-এ সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর কাহালুতে আওয়ামী লীগের হাল ধরেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারীদের সংঘবদ্ধ ও সংগঠনকে সুসংগঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘এ আসনের কাহালু উপজেলায় প্রায় ৩০ হাজার ভোট বেশি হলেও ১৯৫৪ সালের পর গত ৬৪ বছরে এখান থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী দেওয়া হয়নি। গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করে অন্য এলাকা ও সংগঠনের প্রার্থী দেওয়া হয়। তাই এবার অন্য এলাকার কাউকে প্রার্থী করা হলে দল ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতির চেয়ারম্যান হওয়ায় বছরে ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা ঋণ দিয়েছি। ১৩১টি গ্রাম সমিতি আছে। তাই আমার প্রচুর সমর্থক আছেন। দল মনোনয়ন দিলে নিশ্চিত নির্বাচিত হবো।’

কাহালু উপজেলা আওয়ামী লীগের অপর সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট হেলালুর রহমান জানান, তিনি দীর্ঘদিন ধরে জনসংযোগ করছেন। নেতাকর্মীদের সুখে-দুঃখে পাশে আছেন। তাদের মামলায় আইনি সহায়তা দিয়ে আসছেন। মহাজোটের এমপি জাসদ নেতা এলাকার উন্নয়নে কোনও কাজ করেননি। তাকে মনোনয়ন দেওয়ায় আওয়ামী লীগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দল তাকে (হেলালুর) মূল্যায়ন করে টিকিট দিলে তিনি নিশ্চিত বিজয়ী হবেন।

অপরদিকে ইউনুস আলী ও রেজাউল আশরাফ জিন্নাহও আগামী নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেতে এলাকায় কাজ করে যাচ্ছেন।

বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা হলেন- সাবেক সংসদ সদস্য ডা. জিয়াউল হক মোল্লা, সাবেক এমপি জেলা বিএনপির উপদেষ্টা মোস্তফা আলী মুকুল, জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট রাফি পান্না, জেলার ধর্ম বিষয়ক ও ওলামা দলের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা ফজলে রাব্বী তোহা, জিয়া শিশু কিশোর সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতা মোশাররফ হোসেন ও নন্দীগ্রাম পৌর বিএনপির সভাপতি আহসান বিপ্লব রহিম।

সাবেক এমপি মোস্তফা আলী মুকুল জানান, ২০০৮ সালে এমপি হওয়ার পর এলাকার উন্নয়নে অনেক কাজ করেছেন। দীর্ঘদিন এলাকায় গণসংযোগ করছেন। নেতাকর্মীদের বিপদে সবসময় রয়েছেন। তার দাবি, ম্যাডাম খালেদা জিয়ার নির্দেশে মাঠে রয়েছেন। তার বিশ্বাস এবারও তাকে টিকিট দেওয়া হবে আর তিনি বিপুল ভোটে নির্বাচিত হবেন।

এই আসনে বিএনপির টিকিটে ৩ বার নির্বাচিত এমপি ডা. জিয়াউল হক মোল্লা জানান, তিনি এলাকার মানুষের সঙ্গে আছেন। দলীয় মনোয়ন চাইবেন। আর মনোনয়ন পেলে আবারও বিপুল ভোটে এমপি হবেন।

জেলা বিএনপির ধর্মবিষয়ক সম্পাদক মাওলানা ফজলে রাব্বী তোহা জানান, ১৯৯০ সালে ছাত্রদলের রাজনীতির মাধ্যমে বিএনপিতে আসেন। বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন ও সংগঠনকে সুসংগঠিত করার চেষ্টা করেছেন। দলের ক্রান্তিকালে ছিলেন ও থাকবেন। আন্দোলন করতে গিয়ে হামলা-মামলা ও জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন। দল মূল্যায়ন করে টিকিট দিলে শতভাগ বিজয়ী হবেন।

মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘হাইকমান্ডের সবুজ সংকেত পেয়ে দীর্ঘ প্রায় ৯ বছর ধরে এলাকায় কাজ করছি। প্রতিটি সভা-সমাবেশ ও সামাজিক অনুষ্ঠানে থাকছি। তৃণমূলে দলীয় কর্মসূচি পালন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও দরিদ্র-এতিম জনগণকে সাধ্যমত সাহায্য-সহযোগিতা করছি। প্রায় আড়াইশ’ নেতাকর্মীর মামলা পরিচালনার পাশাপাশি তাদের পরিবারকেও সহযোগিতা করি।’ তাকে মনোনয়ন দিলে তিনি বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবেন বলেও জানান তিনি।

এ আসনে জাসদে জাসদের তেমন অবস্থান না থাকলেও ২০১৪ সালের নির্বাচনে জেলা জাসদের সভাপতি একেএম রেজাউল করিম তানসেন জাতীয় পার্টির প্রার্থীকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তানসেন বলেন, ‘গত কয়েক বছরে এলাকার উন্নয়ন অনেক কাজ করেছি। নিজের আখের গোছানো বা মহাজোট প্রধান আওয়ামী লীগের কোনও ক্ষতি করিনি।’ তিনি আশা করেন, আগামী নির্বাচনে তাকে মহাজোটের প্রার্থী করা হবে এবং তিনিও নিশ্চিত বিজয়ী হবেন।

জাতীয় পার্টির সম্ভাব্য প্রার্থীরা হলেন- জেলা কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য যুব সংহতির সভাপতি শাহীন মোস্তফা কামাল ফারুক ও জাপা কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য আবদুস সালাম বাবু। জাপার কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য ও জেলা যুব সংহতির সভাপতি শাহীন মোস্তফা কামাল ফারুক জানান, তিনি দীর্ঘদিন ধরে এ আসনে গণসংযোগ করছেন। দলকে সুসংগঠিত করার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। আসনের দুটি উপজেলায় দলীয় সভা-সমাবেশে অংশ নিচ্ছেন ও ভোটারদের কাছে ভোট চাইছেন। ফারুকের বিশ্বাস দলীয় চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ তার কর্মকাণ্ডে সন্তুষ্ট হয়ে তাকে মহাজোট থেকে এবারের প্রার্থী করবেন। যদি কোনও কারণে মহাজোট থেকে প্রার্থীতা পাওয়া না যায় সেক্ষেত্রে দলের সিদ্ধান্ত মেনে নেবেন বলেও জানান তিনি।

এদিকে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হলেও ধানের শীষ বা অন্য কোনও প্রতীকে এ আসনে নির্বাচন করতে চান জেলা জামায়াতের নায়েবে আমীর ও কাহালু উপজেলা চেয়ারম্যান তায়েব আলী। তায়েব সমর্থকদের বিশ্বাস, তিনি প্রার্থী হলে তার বিজয়ী হবার সম্ভবনা শতভাগ।

প্রসঙ্গত, বগুড়া-৪ আসনে মোট ভোটার তিন লাখ ৮ হাজার ৬৪৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ এক লাখ ৫২ হাজার ৪৭৫ জন ও নারী এক লাখ ৫৬ হাজার ১৬৯ জন। কাহালু উপজেলায় মোট এক লাখ ৬৯ হাজার ২৩৪ জন ভোটার। এর মধ্যে পুরুষ ৮৩ হাজার ৮৩৫ জন এবং নারী ৮৫ হাজার ৩৯৯ জন। নন্দীগ্রাম উপজেলায় মোট ভোটার এক লাখ ৩৯ হাজার ৪১০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৬৮ হাজার ৬৪০ জন ও নারী ৭০ হাজার ৭৭০ জন। কাহালু উপজেলায় ৯টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা এবং নন্দীগ্রামে ৫টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা আছে। এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালে বগুড়া-৪ আসনে বিএনপির টিকিটে এমপি হন আজিজুল হক মোল্লা। তার মৃত্যর পর উপ-নির্বাচনে তার ছেলে ডা. জিয়াউল হক মোল্লা এমপি হয়েছেন। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে ডা. জিয়াউল হক মোল্লা এমপি হন। তিনি বিএনপির সংস্কারপন্থী হওয়ায় ২০০৮ সালের নির্বাচনে মোস্তফা আলী মুকুল নির্বাচিত হন। তবে হাইকমান্ড তাকে ক্ষমা করায় তার প্রার্থীতা ফিরে পাওয়ার প্রবল সম্ভবনা রয়েছে বলেও স্থানীয় নেতাকর্মীরা মনে করছেন। 

 

/এএইচ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
প্রতিনিধি পরিষদের ইরান যুদ্ধ-বিরোধী ভোটের প্রতিক্রিয়ায় মুখ খুললেন ট্রাম্প
প্রতিনিধি পরিষদের ইরান যুদ্ধ-বিরোধী ভোটের প্রতিক্রিয়ায় মুখ খুললেন ট্রাম্প
জনগণের আস্থা অর্জনে কাজ করছে জাতীয় সংসদ: স্পিকার
জনগণের আস্থা অর্জনে কাজ করছে জাতীয় সংসদ: স্পিকার
এই অর্জন বাংলাদেশের শক্তিশালী কূটনৈতিক অবস্থানকে তুলে ধরে: খলিলুর রহমান  
এই অর্জন বাংলাদেশের শক্তিশালী কূটনৈতিক অবস্থানকে তুলে ধরে: খলিলুর রহমান  
‘মুখ খোলো মমতা, জানতে চায় জনতা’ স্লোগানে ইনকিলাব মঞ্চের মশাল মিছিল
‘মুখ খোলো মমতা, জানতে চায় জনতা’ স্লোগানে ইনকিলাব মঞ্চের মশাল মিছিল
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী