লালমনিরহাট শহরের সাপটানা এলাকায় গৃহবধূকে যৌতুকের টাকার জন্য স্বামী অমানুষিক নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। জানা গেছে,খুরশিদা আক্তার ইভা (২৩) নামে ওই গৃহবধূকে নির্যাতনের সময় স্বামী হাছান আল হাবিব নিউটন (২৮) ফোনে ইভার আর্তচিৎকার তার ভাইকে শোনায়।
নির্যাতনের সময় ইভার ভাইকে করা ফোন কলের অডিও রেকর্ডে শোনা যায়, নিউটন ইভার ভাইকে বলছে, ‘মারের শব্দ শোন। তোরা আসবি তোরাও মার খাবি। গণহারে মার খাবি।’ তখন ইভার ভাই নম্রভাবে জানতে চান– ‘কী হয়েছে, বলো তো?’ জবাবে নিউটন বলে, ‘মারের শব্দ শুনবি? দেখ, কেমন লাগে মারের শব্দ।’ এর পরই প্রচণ্ড আঘাতের কারণে ইভার আর্তচিৎকার শোনা যায়।
এই ঘটনায় গত ৩১ মে লালমনিরহাট সদর থানায় নিউটনসহ তিনজনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেছেন ইভার ভাই মো. হাবিবুর রহমান।
মামলার বিবরণে জানা যায়, গত ৩০ মে সকাল ১১টার দিকে নিউটন দুই বোনের পরামর্শে দুই লাখ টাকা যৌতুকের জন্য ইভাকে স্পর্শকাতর স্থানসহ শারীরিকভাবে মারাত্মক নির্যাতন করে। স্বামী ও দুই ননদের অমানুষিক নির্যাতনে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় ইভা গত ৩০ মে থেকে লালমনিরহাট সদর ১০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ইভা রংপুরের পীরগাছার গুয়াবাড়ী এলাকার মৃত ইউসুফ আলীর মেয়ে। লালমনিরহাট পৌর শহরের সাপটানা এলাকার আবদুস সাত্তারের একমাত্র ছেলে নিউটনের সঙ্গে ২০১৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর তার বিয়ে হয়।
হাসপাতালের বেডে শুয়ে ইভা স্বামীর নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রংপুর বেগম রোকেয়া কলেজ থেকে বাংলা বিষয়ে অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে গত ২৭ মে বাবার বাড়ি থেকে স্বামীর বাড়ি লালমনিরহাটে যাই। ৩০ মে হঠাৎ আমার স্বামী তার দুই বোনের সঙ্গে পরামর্শ করে আমার ওপর নির্যাতন শুরু করে। একপর্যায়ে আমি নিজেকে বাঁচাতে শিশুসন্তান হাসিন আল জাবিরকে (১৪ মাস) নিয়ে বাড়ির বাইরে আসলে স্থানীয়রা আমার সাহায্যে এগিয়ে আসেন। এ সময় নিউটন স্থানীয় লোকজনকে গালিগালাজ করে আমাকে চুলের মুঠি ধরে বাড়ির ভেতরে নিয়ে গিয়ে গলা চেপে ধরে এবং মারধর করে। একপর্যায়ে আমার চিৎকার শোনানোর জন্য আমার ভাইয়ের ফোনে কল দিয়ে নির্যাতন চালায়। ওই দিন বিকালে আমার ভাই এবং লালমনিরহাট থানা পুলিশ আমাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে।’
ইভা আরও বলেন, ‘এর আগে ২০১৬ সালের ২ ডিসেম্বর যৌতুকের টাকার জন্য নির্যাতনের একপর্যায়ে নিউটন আমার কোমরে লাথি মারে। তখন আমি চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলাম। কোমরে লাথি মারার দুই দিন পর ৪ ডিসেম্বর আমার প্রথম সন্তানটি গর্ভপাত হয়ে যায়। সে সময় লালমনিরহাট সদর হাসপাতালে আমাকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল। যদি কখনও ভালো হয়, এই ভেবে বিয়ের পর থেকে অনেক নির্যাতন সহ্য করে সংসার করে আসছি। কিন্তু সন্তানের মুখ দেখার পরও সে আমাকে নির্যাতন করেই চলেছে। এখন ভাবছি, তার সঙ্গে সংসার আর করা যাবে কিনা? কারণ, সে আমাকে মেরেও ফেলতে পারে!’
নির্যাতনের একটি মোবাইল ফোন কল রেকর্ড সরবরাহ করে মামলার বাদী হাবিবুর রহমান বলেন, ‘হাছান আল হাবিবসহ তিনজনের নামে লালমনিরহাট সদর থানায় একটি মামলা করেছি। আমার বোনের চিকিৎসা চলছে। আমরা আদালতের মাধ্যমে এই নির্যাতনের বিচার চাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিয়ের সময় বোনের সুখের জন্য তিন লাখ টাকা দিয়েছি। আরও দুই লাখ টাকার জন্য বিভিন্ন সময় আমার বোনকে নির্যাতন করে আসছিল তারা। গত ৩০ মে ইভার ওপর ভয়াবহ নির্যাতন করা হয়। এ কারণে মামলা করেছি।’
লালমনিরহাট সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহফুজ আলম বলেন, ‘ইভা নামের ওই গৃহবধূকে অমানুষিকভাবে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়েছে। এই ঘটনায় মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। আসামি গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।’
লালমনিরহাট সদর ১০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা. আমিনুর রহমান বলেন, ‘গুরুতর আহত খুরশিদা আক্তারের স্পেশাল চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তার শরীরে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তাছাড়া বেদম মারপিটের কারণে শরীরের বিভিন্ন স্থানে রক্তজমাট লাগার কারণে কালো দাগ পড়েছে। এসবের জন্য তার দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে।’








